১৮৬৬ সালে আসামে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হল। এর তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেল, ‘বঙ্গ’ বিশাল একটি প্রদেশ। একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার অধীনে তা সামাল দেওয়া দুষ্কর। এছাড়া পূর্ব-বাংলা এবং আসাম অঞ্চল অন্যান্য এলাকা থেকে তুলনামূলক দুর্গম। ফলে প্রদেশটিকে ছোট করার পরিকল্পনা আসতে থাকে।
মূলত, নবাবি আমল থেকেই বিহার (ঝাড়খণ্ড তখন বিহারের অংশ) ও উড়িষ্যার সমন্বয়ে বাংলা বিশাল একটি প্রদেশে রূপ নিয়েছিল। আসামকে (সেভেন সিস্টার্সের প্রায় সিংহভাগ এলাকা) তো বাংলা থেকে আলাদা ভাবাই হত না। কিন্তু এক লক্ষ ৮৯ হাজার বর্গ মাইলের এই পুরো এলাকা শাসন করতেন একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর। ১৯০৩ নাগাদ যার জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৭ কোটি ৮৫ লক্ষে। ফলে পূর্ব বাংলা, আসাম প্রভৃতি এলাকায় শাসন পরিচালনা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। নানান কারণে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাজধানী কলকাতা ও এর আশেপাশের জেলা। আর বাকি এলাকাগুলো কলকাতার উপনিবেশ।
কলকাতায় বসে আরাম আয়েশ ও সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় মত্ত থাকা জমিদারদের জোরপূর্বক অতিরিক্ত খাজনা ও অত্যাচারে জনজীবন অতিষ্ঠ। এসব এলাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসায়-বাণিজ্য ছিল অবহেলিত। এসব প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি দুর্ভিক্ষ, প্রতিরক্ষা ও ভাষাগত সমস্যাবলির কারণে নতুন করে সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি ইংরেজ সরকারকে ভাবতে হয়। বিশেষ করে আসামের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এক্ষেত্রে অনেক বেশি অবদান রাখে।
অবশ্য এর আগেই ১৮৩৬ সালে বাংলার উত্তরাঞ্চলের প্রদেশগুলিকে বাংলা থেকে পৃথক করা হয়। ১৮৫৪ সালে বাংলায় গভর্নর জেনারেলের পরিবর্তে জারি হয় লেফটেন্যান্ট গভর্নরের শাসন। আর ১৮৭৪ সালে চিফ কমিশনারশিপ গঠনের প্রক্রিয়া হিসাবে বাংলা থেকে আসামের সীমানা ভাগ করা হয়। এর মধ্যে তখন সিলেটও ছিল। পরবর্তীতে ১৮৯৮ সালে যুক্ত হয় লুসাই পাহাড়। এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় সমগ্র বাংলাকে ভেঙে দুইটি প্রদেশ গঠনের পরামর্শ আসে। ১৯০৩-০৪ সালের দিকে এর পরিকল্পনা চূড়ান্ত হতে থাকে। এ সময়ে ঢাকার নবাব ছিলেন খাজা সলিমুল্লাহ। এতদিন নিরবে-নিরুপদ্রবে ব্যবসা ও জমিদারি সামাল দিলেও এখন তিনি জড়িয়ে পড়লেন রাজনীতিতে।
অবশ্য সন্ত্রাসবাদীরা যেমন ‘প্রগতিশীল’ আবদার করেন, নবাব সলিমুল্রাহ প্রথমে সেই ধরণের উদ্যোগই নেন। ১৯০৪ সালের ১১ জানুয়ারি তাঁর আমন্ত্রণে আহসান মঞ্জিলে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় হিন্দু আর মুসলিমরা ধর্ম নির্বিশেষে উপস্থিত হয়। এখানে ইংরেজ সরকারের বঙ্গবিভাগ পরিকল্পনার ওপর বেশ কিছু বিষয়ে নবাব সলিমুল্লাহ বিরোধিতা করে মত পেশ করেন। বরং ঢাকাকে রাজধানী করে এই প্রদেশ গঠনের প্রস্তাব তিনিই উত্থাপন করেন। পরে ১৮-১৯ ফেব্রুয়ারি ভাইসরয় লর্ড কার্জন নবাব সলিমুল্লাহর আথিতেয়তা গ্রহণ করেন। এর ফলে তাদের পরিকল্পনায় বেশ কিছু পরিবর্তন সূচিত হয়। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ঢাকাকে রাজধানী করে ঘোষিত হয় পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ।
বঙ্গভঙ্গ সম্পূর্ণত যৌক্তিক একটি উদ্যোগ ছিল। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে প্রথমত— প্রশাসনিক জটিলতা লাঘব করা ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতেও দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ, দ্বিতীয়ত— ইতোমধ্যে চিফ কমিশনার শাসিত অনগ্রসর আসামকে বঙ্গোপসাগরের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া এবং তৃতীয়ত— উড়িয়া ভাষাভাষীদের একটি প্রশাসনিক অঞ্চলে নিয়ে আসা। সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনায় পূর্ববঙ্গ প্রদেশ ছিল না, বরং ছিল আসাম প্রদেশ। যাতে পূর্ব বাংলার ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম বৃহত্তর জেলাগুলো যুক্ত থাকবে, থাকবে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন। নবাব সলিমুল্লাহ এই পরিকল্পনারই বিরোধিতা করে ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠনের পরামর্শ দেন। আজ এই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী।
পূর্ববঙ্গ প্রদেশ গঠনের ফলে ঢাকায় রাজধানীই হবে না শুধু, কলকাতার জমিদার বাবুদের এই গরীব প্রজারাও সরকারের সুনজর পাবেন। তাছাড়া দার্জিলিং বাদে চা এবং সমগ্র পাট উৎপাদনকারী এলাকাগুলো পূর্ব বাংলায় পড়ে যাচ্ছে। এসব কিছুই কলকাতার জমিদার শ্রেণিকে ভাবিয়ে তোলে। শুধু জমিদার শ্রেণি নয়- আইন ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীরা ‘সচেতন’ হয়ে ওঠেন। কারণ এদের প্রত্যেকের স্বার্থেই আঘাত লাগতে চলেছে। তারা মায়াকান্না জুড়লেন যে ব্রিটিশরা ‘বঙ্গমায়ের অঙ্গহানি’ করছেন। তারা অভিযোগ তুললেন ব্রিটিশরা ‘ভাগ কর, শাসন কর’ নীতিতে বাঙালির একক সত্তাকে ভেঙে দিচ্ছেন। যার প্রত্যেকটা অভিযোগই ছিল ফাও, বকওয়াস। আর এদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসাবে এগিয়ে আসে কংগ্রেস।
অথচ কংগ্রেস ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের সকল ধর্মের মানুষের রাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ তার খোলস ভেঙে হিন্দু চরিত্র উন্মোচন করে। ফলে মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক মঞ্চের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এক্ষেত্রেও এগিয়ে আসেন নবাব সলিমুল্লাহ। তাঁর উদ্যোগেই ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর শাহবাগ থেকে ঘোষণা আসে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ গঠনের। অবশ্য এর আগে নতুন প্রদেশ কার্যকর হওয়ার দিনই, অর্থাৎ ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর নর্থব্রুক হলে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ‘মোহামেডান প্রভিনশিয়াল ইউনিয়ন’ গঠন করা হয়। সে সময়ে এটিই মুসলমানদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ভূমিকা রাখে। ১৯০৬ সালে তিনি গঠন করেন ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক শিক্ষা সমিতি’। ১৪ ও ১৫ এপ্রিল শাহবাগে অনুষ্ঠিত সমিতির প্রথম সভায় তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। একই বছর ‘মুসলিম অল ইন্ডিয়া কনফেডারেসি’ নামে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক উদ্যোগের পরিকল্পনা নেন। পরে তাঁর আহ্বানে নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সমিতির ২০তম অধিবেশন বসে শাহবাগে। সেখান থেকেই মুসলিম লীগের ঘোষণা আসে।
কিন্তু ওপারের স্বার্থান্ধরা ততদিনে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেই। ‘বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ’ যেন তাদের জীবন-মরণ সমস্যা। এজন্য তারা বিভিন্ন গোপন আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯০৮-১০ সালে এটি চরম রূপ ধারণ করে। ‘শান্তিপূর্ণ’ থাকাকালেও এটি সাম্প্রদায়িক আন্দোলন ছিল। আর এখন তো কথা-ই নেই। বাংলার কথিত বিপ্লবী ক্ষুদিরামদের হাতে এই সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরাই তুলে দিয়েছিল বোমা। নবাব সলিমুল্লাহও এই সন্ত্রাসীদের টার্গেটে পরিণত হন। ১৯০৭ সালের ৪ মার্চ কুমিল্লায় একটি সভা চলাকালে নবাব সলিমুল্লাহর ওপর গুলি বর্ষণ করা হয়। সে সময় তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও একজন শহীদ হয়েছিলেন।
নবাব সলিমুল্লাহ ১৯০৮ সালের মধ্যেই বাংলা ও এর আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম লীগকে সংগঠিত করে তোলেন। একই বছর ৩০-৩১ ডিসেম্বর অমৃতসরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভায় মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচন দাবি করেন তিনি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, নবাব সলিমুল্লাহ শুধু মুসলমানের নেতা ছিলেন না। বরং কংগ্রেস ও হিন্দু জমিদারদের বশংবদদের প্রতিক্রিয়াশীলতা ও সাম্প্রদায়িকতার মুখে নিজ সম্প্রদায়ের কথা তাঁকে ভাবতে হয়েছিল। ১৯০৯ সালের ২১ মার্চ ‘ইম্পেরিয়াল লীগ অব ইস্টার্ন বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম’ গঠন করেন তিনি। যে সময়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রতিক্রিয়াশীল স্বদেশী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন চরমে, ঠিক তখনই পূর্ববঙ্গের হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি রক্ষায় এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। এই সংগঠনে উভয় সম্প্রদায়েরই সম্পদশালী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অন্তর্ভূক্ত ছিলেন।
১৯১১ সালের ১৯ আগস্ট বিদায়ী এবং নবাগত ছোটলাটদ্বয়ের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠার দাবি জানান নবাব সলিমুল্লাহ। এরই মধ্যে ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গ রদ করেন কিং জর্জ পঞ্চম। দিল্লীর দরবারে তার সম্মানে রবীন্দ্রনাথের ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে, ভারতভাগ্য বিধাতা’ গানটি গীত হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের অংশ হিসাবেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি।
পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক মর্যাদা লোপ পাওয়ায় সলিমুল্লাহ মর্মাহত হন। তাৎক্ষণিক তিনি নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করেন। ২০ ডিসেম্বর তিনি মুসলিমদের স্বার্থ সংরক্ষণে লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে ৮ দফা দাবি পেশ করেন। লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে এলে ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি সদলবলে গিয়ে পুনরায় বিভিন্ন দাবি-দাওয়া পেশ করেন। সেদিনই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিমদের জন্য শিক্ষা অফিসার নিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়। নবাব সলিমুল্লাহর প্রচেষ্টায় ঢাবির পরিকল্পনায় জায়গা পায় ইসলাম শিক্ষা বিভাগ।
কিন্তু এ দাবিও প্রতিক্রিয়াশীলদের সইল না। তারা এমনকি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মতো দাবিরও বিরোধিতা করতে লাগলেন। যারা আরও অর্ধশত বছর আগে একটি রেনেসাঁ পার করেছেন, এই বিরোধিতা তাদের কাছ থেকেই আসে। ইতিহাসের কী নির্মম নির্লজ্জতা। ১৯১২ সালের ৩-৪ মার্চ কলকাতায় অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের সভায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বিরোধিতাকারীদের অপযুক্তি খণ্ডন করেন। এদিন আবারও স্বতন্ত্র্য নির্বাচনের দাবি তুলে ধরেন এবং চাকরিতে কোটা দাবি করেন।
নবাব সলিমুল্লাহর শাহাদাত
বিরোধিতার সূত্র ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ পিছিয়ে যেতে থাকে। এরই মধ্যে ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চৌরঙ্গীর বাসভবনে ৪৩ বছর ৭ মাস বয়সে ‘অস্বাভাবিক’ মৃত্যু হয় নবাব সলিমুল্লাহর। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে ইতিহাসবিদদের মধ্যে। তিনি ঠিক কিভাবে মারা গেছিলেন তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে তাঁর মৃত্যুটি একটি চক্রান্তের অংশ হয়ে থাকতে পারে বলেই প্রতিষ্ঠিত।
এ নিয়ে আবার দুটি মত প্রচলিত আছে। প্রথমটি চক্রান্তের ফলে নবাবের অধরা স্বপ্ন ঢাবির প্রকল্প পিছিয়ে যাওয়া নিয়ে ‘বড়লাট’ লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে বাদানুবাদ হয়। এক পর্যায়ে বড়লাট তাঁকে নিয়ে অসৌজন্যমূলক কথা বললে তিনি সঙ্গে থাকা ছড়ি দিয়ে টেবিলে আঘাত করেন। এ নিয়ে চরম উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে বড়লাটের ইঙ্গিতে তার দেহরক্ষী গুলি ছোঁড়ে। এভাবেই মৃত্যু ঘটে নবাব সলিমুল্লাহর। তবে আরেকটি মত হচ্ছে, নবাবকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে।
কোন তথ্য সঠিক তা হয়তো উচ্চতর গবেষণা-ই বলতে পারে। কিন্তু হত্যা যে হয়েছিল সে বিষয়ক সন্দেহের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ হচ্ছে তাঁর দাফন ব্যবস্থা। ১৯১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি নবাব পরিবারের সদস্য খাজা শামসুল হক লিখেছেন, নবাবের লাশ পরিবারের কাউকে ধরতে দেওয়া হয়নি। নবাব বেগম রওশন আখতারের বরাত দিয়ে ছেলে খাজা নাসরুল্লাহ সম্পাদিত ‘নবাব স্যার সলিমুল্লাহ দ্য মিস্টেরিয়াস ডেথ’ নিবন্ধে বলা হয়েছে, নবাবের কফিন খুলতে দেওয়া হয়নি। কবরটিও প্রায় ছয় মাস পাহাড়া দেওয়া হয়। সৈয়দ আবুল মকসুদের নবাব সলিমুল্লাহ ও তাঁর সময় গ্রন্থে দাবি করা হয়েছে দাফনের পর কবরটি গুর্খা সৈন্যরা পাহারা দিত।
আরও দাবি করা হয় যে কলকাতায় শেষ সময়ে নবাব সলিমুল্লাহর পাশে তাঁর ব্যক্তিগত হেকিমকে থাকতে দেওয়া হয়নি। লাশটির ময়নাতদন্তও করতে দেওয়া হয়নি। এসব কারণে সন্দেহের জোরালো কারণ থাকার পরও অনেকেই নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে মানতে নারাজ। কারণ ‘জোরালো প্রমাণ’ নেই।
সলিমুল্লাহর অন্যান্য অবদান
১৮৭১ সালের ৭ জুন এক শুভক্ষণে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন নবাব সলিমুল্লাহ। নবাব খাজা আহসানুল্লাহর জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে জন্মসূত্রে এই নবাব আভিজাত্যের প্রাচীর ডিঙিয়ে খুব সহজেই মিশে যেতে পারতেন গণমানুষের কাতারে। পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে ছোট্ট সলিমুল্লাহর পড়াশোনা শুরু হয় গৃহশিক্ষকের কাছে। বাংলা, আরবি, ফারসি ও উর্দুর সাথে সাথে ইংরেজিও তিনি শিক্ষা নেন সেই শিক্ষকের কাছেই। ১৮৯৩ সালে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চাকরি নেন। তবে দুই বছরের মাথায় চলে যান ময়মনসিংহে, ব্যবসার শুভ যাত্রা করেন।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, ঢাকার নবাব পরিবার কাশ্মির থেকে ব্যবসা সূত্রে ঢাকায় আসে। বৃটিশ আমলে এস্টেট ব্যবসা লাভজনক দেখে তাঁরা জমিজমা কিনতে শুরু করেন। ১৯০১ সালে মারা যান নবাব আহসানুল্লাহ। জ্যেষ্ঠপুত্র হিসেবে নবাবির দায়িত্ব পড়ে আহসানুল্লাহর ওপর। তাঁর বয়স তখন মাত্র ৩০ বছর। এরপরই তো ঘটনাক্রমে জড়িয়ে পড়েছিলেন রাজনীতিতে।
নবাব সলিমুল্লাহ নারী শিক্ষা উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন। প্রদেশ সরকারের নারী শিক্ষা কমিটির সদস্য এবং মুসলিম নারী শিক্ষা সাব-কমিটির সভাপতি ছিলেন। ১৯১৪ সালে গঠিত হার্নেল কমিটিরও সদস্য ছিলেন তিনি। মাদ্রাসা শিক্ষা কমিটিতেও তিনি ছিলেন। তাঁর সুপারিশ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯১৫ সালে আধুনিক শিক্ষা সম্বলিত পরিকল্পিত মাদ্রাসা শিক্ষা চালু করে সরকার।
১৯০২ সালে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল (বুয়েট) প্রতিষ্ঠায় পিতার প্রতিশ্রুত এক লক্ষ ১২ হাজার টাকা মঞ্জুর করেন তিনি। এছাড়া কৃষি, মসজিদ-মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ছাত্রাবাস নির্মাণসহ নানান ধরণের সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। ঢাকার কারুশিল্প উন্নয়নে তিনি প্রদর্শনীর আয়োজন করতেন। এ সংক্রান্ত পূর্ববঙ্গীয় সরকারের গঠিত কমিটিরও সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯১২ সালে বলকান যুদ্ধে তুর্কি মুসলমানদের জন্য বিপুল পরিমাণ চাঁদা সংগ্রহ করে প্রেরণ করেন নবাব সলিমুল্লাহ।
লেখক: সংবাদকর্মী