Image description

২০১৩ সালের বিতর্কিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চে ‘তুই রাজাকার’ গান পরিবেশনের মাধ্যমে বিচার নয়, ফাঁসির দাবিকে জনপ্রিয় করতে ভূমিকা রাখা ব্যান্ড চিরকুটকে আসন্ন কনসার্টে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)।

ডাকসু ও ‘স্পিরিট অব জুলাই’-এর যৌথ আয়োজনে আগামী ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অনুষ্ঠেয় এই কনসার্টকে ঘিরে ক্যাম্পাসে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সমালোচকদের মতে, ২০১৩ সাল থেকেই শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রকাশ্য রূপ দেখা যায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিরোধী মত দমনের ঘটনায়। সে সময় বামপন্থী সংগঠন, ছাত্রলীগ এবং শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলনে ‘বিচার চাই’ নয়, বরং সরাসরি ‘ফাঁসি চাই’ স্লোগানকে সাংস্কৃতিকভাবে বৈধতা দিতে একাধিক ব্যান্ড মাঠে নামে। চিরকুটের ‘তুই রাজাকার’ এবং অবস্কিওরের ‘দেশ ছাড় রাজাকার’ গান সেই সময় রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করে তোলে। এসব গানের মাধ্যমে বিচারিক হত্যাকাণ্ডকে জনসমর্থনের মোড়কে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ডাকসুর আয়োজনে চিরকুটকে আমন্ত্রণ জানানোয় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে। বিশেষ করে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের বড় ধরনের বিজয়ের পর এমন সিদ্ধান্তকে অনেকেই রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি ডাকসু পরোক্ষভাবে হাসিনা আমলের বিচারিক হত্যাকাণ্ডের সাংস্কৃতিক বৈধতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে?

ফিরে দেখা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

২০১৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আসামিপক্ষের সাক্ষী হাজিরের সুযোগ, সাক্ষীদের হয়রানি এবং প্রতিরক্ষার সময়সীমা সংকুচিত করার অভিযোগ তোলে। সুখরঞ্জন বালীর মতো সাক্ষীকে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে তুলে নেওয়ার ঘটনাও বড় প্রশ্ন তৈরি করে।

২০১২ সালের স্কাইপ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে বিচারকদের সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ ফাঁস হওয়ার পর ট্রাইব্যুনালের নিরপেক্ষতা নিয়েও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। বিচারকদের একটি অংশকে ‘জুডিশিয়াল মার্ডার’-এর ছক কষার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়।

এই প্রেক্ষাপট জানা সত্ত্বেও চিরকুট ২০১৩ সালের পরও ওই ধারার গানে সক্রিয় ছিল। শুধু শাহবাগ নয়, পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে জাতীয় নির্বাচনেও তাদের গান গাইতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চিরকুটের গানের কথায় বিচারের পরিবর্তে সরাসরি ফাঁসির দাবি উচ্চারিত হয়েছে, যা তখনকার রাজনৈতিক হিংস্রতাকে আরও উসকে দেয় বলে মনে করেন সমালোচকরা।

এ বিষয়ে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, বিষয়টি জানা ছিল না এবং এটি একটি তথ্যগত ঘাটতি ছিল।

তিনি জানান, বিষয়টি এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এই আয়োজন ঘিরে ক্যাম্পাসে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে—ডাকসু কি সাংস্কৃতিক আয়োজনের নামে অতীতের বিতর্কিত রাজনৈতিক ভূমিকা ও বিচারিক হত্যাকাণ্ডকে উপেক্ষা করছে, নাকি সচেতনভাবে সেই ইতিহাসকে আবার বৈধতা দিচ্ছে।

আরটিএনএন