ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার বিরুদ্ধে হওয়া আপিল আবেদন উদারনীতিতে বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে জমা দেওয়া এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে গরমিল, মামলার তথ্য গোপন, হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকাসহ কিছু কিছু বিষয় ‘ছোটখাটো ভুল’ হিসাবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আবেদন বিশেষভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপির বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইসি মনে করছে, অনেক সংখ্যক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে নির্বাচনে গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। ভোটার উপস্থিতিও বেশি হবে।
শনিবার আপিল আবেদন শুনানি শুরু থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত চার দিনে আপিল শুনানিতে ২০৩ জনের প্রার্থিতা ফেরত দেওয়া হয়েছে। এই চার দিনে ২৬৭টি আপিল আবেদন নিষ্পত্তি করেছে ইসি। ৬৪টি আবেদন নামঞ্জুর করেছে। অর্থাৎ আপিলকারীদের ৭৬ শতাংশই প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। এ সময়ে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ অনেক দলের বেশ কয়েকজনের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইসি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন কমিশন ছোটখাটো ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখছে। আইনে ছোটখাটো ত্রুটি আমলে না নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে ঋণখেলাপিসহ মৌলিক বিষয়ে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, অনেক সংখ্যক প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ভোটগ্রহণ উৎসবমুখর হবে।
গত ১০ জানুয়ারি থেকে আপিল আবেদন শুনানি করছে ইসি। চলবে আগামী ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন ৭০টি আপিল আবেদশ শুনানি করা হচ্ছে। মঙ্গলবার ৭০টি আবেদনের মধ্যে ৫৩ জনের আবেদন মঞ্জুর করা হয়। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী মো. আব্দুল হক ও কুমিল্লা-৩ আসনের মো. ইউসুফ সোহেলের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এদিন ১৫টি আবেদন নামঞ্জুর করা হয়েছে। এমনকি রাজশাহী-৫ আসনের বিএনপি প্রার্থী অধ্যাপক নজরুল ইসলামের প্রার্থিতা বাতিল করতে ওই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. জুলফার নাঈম মোস্তফার আবেদন নামঞ্জুর করা হয়েছে। একইভাবে নোয়াখালী-৫ আসনের বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আনিছুল হকের প্রার্থিতা বাতিল করতে ওই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. বেলায়েত হোসেনের আবেদনও নামঞ্জুর করা হয়েছে। অর্থাৎ এ দুই প্রার্থীর প্রার্থিতা বহাল রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করে ৭২৩ জনের প্রার্থিতা বাতিল করেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা। মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয় ১৮৪২ জনের। মনোনয়নপত্র বাছাই করে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে ৬৪৫টি আপিল আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৭০টি আবেদন জমা পড়েছে বৈধ প্রার্থীর বিরুদ্ধে। ওইসব আবেদনে ওই প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল চাওয়া হয়েছে। আপিল শুনানির প্রথম দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী এমএ হান্নানের আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে ওই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা এসএকে একরামুজ্জামানের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়।
জানা গেছে, এখনো ৬৯ জন বৈধ প্রার্থীর আপিল রয়েছে। আজ কুমিল্লা-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আবদুল মতিনের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে বিএনপির প্রার্থী মো. সেলিম ভূঁইয়ার আবেদন এবং কুমিল্লা-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. মনিরুল হক চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের আবেদনের ওপর শুনানি হবে। এদিন দিনাজপুর-৫ আসনে বিএনপি প্রার্থী একেএম কামরুজ্জামানের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী এজেডএম রেজওয়ানুল হকের আবেদন এবং কুড়িগ্রাম-৪ আসনের বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির প্রার্থী শেফালী বেগমের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী কেএম ফজলুল মন্ডলের আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
আপিলে ঝুলে গেল বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীর ভাগ্য : যশোর ব্যুরো জানায়, যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে বিএনপির সাবিরা সুলতানা মুন্নী ও জামায়াতে ইসলামীর ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদের ভাগ্য ঝুলে গেছে নির্বাচন কমিশনের আপিলে। দুজনের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে নির্বাচন কমিশনে একাধিক আপিল হয়েছে। ১৫, ১৬ ও ১৭ জানুয়ারি তিনটি আপিলের শুনানি হবে। ইসির শুনানিতে নির্ধারিত হবে তাদের ভাগ্য। এই আসনে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল মনোনীত প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের দাবিতে আপিল, পালটা আপিল হওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা গেছে।
জানা যায়, জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার যাচাই-বাছাইয়ে যশোর-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবিরা সুলতানা মুন্নীর প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়। ঋণখেলাপির অভিযোগ তুলে তার প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী জহুরুল ইসলাম ও ব্যাংক এশিয়া কর্তৃপক্ষ। আপিল দুটির শুনানি আগামী ১৬ ও ১৭ জানুয়ারি হওয়ার কথা রয়েছে। আপিলে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে সাবিরা সুলতানার ভাগ্য।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবিরা সুলতানা মুন্নী বলেন, ৬ জানুয়ারি আদালতের আদেশে আমাকে দুই মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
এদিকে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার যাচাই-বাছাইয়ে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। তার ক্রেডিট কার্ডের বিল বকেয়া থাকায় মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছিল। প্রার্থিতা ফিরে পেতে ইসিতে আপিল করেন ডা. ফরিদ। তার বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনে আরেকটি আপিল আবেদন করেছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবিরা সুলতানা মুন্নী। তার আপিল আবেদনের শুনানি ১৫ জানুয়ারি হওয়ার কথা রয়েছে।
এই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জহুরুল ইসলাম আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।