আগামীতে রাজনীতিতে তরুণদের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, তরুণরা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছে। তারা আসন্ন নির্বাচনেও অংশ নেবে। আমি নিশ্চিত যে তাদের মধ্যে কেউ কেউ নির্বাচিত হবেন। সেদিনও যারা ক্লাসরুমে ছিল, এখন তারা রাজপথ থেকে নিজেদের রাজনৈতিক দল গঠন করেছে। তারা যদি নির্বাচিত হয়, তাদের মধ্যে কেউ হয়তোবা শিক্ষামন্ত্রীও হবেন।
গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে তিন দিনব্যাপী ‘দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনা’ শীর্ষক আঞ্চলিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
যুবসমাজের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের শিক্ষাবিদদের একত্র হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত কয়েক মাসে ঢাকায় যা ঘটেছে, তা পর্যালোচনার একটি সুযোগ এই সম্মেলন তৈরি করেছে। এসব ঘটনা পর্যালোচনা করলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও সামগ্রিকভাবে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য আরও স্পষ্ট হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অধীনে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে যুক্তরাজ্য, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের ৩০ জন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি এবং বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই তরুণদের নিজেদের চিন্তা ও মনন আছে। তারা ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়ে প্রতিবাদ করেছে। তিনি বলেন, কয়েক মাস আগেই এই শহরে তরুণরা কেন অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিল-তাদের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা কী ছিল, তা বোঝার চেষ্টা না করলে একটি বড় সুযোগ নষ্ট হবে।
শিক্ষার্থীদের প্রেরণার উদাহরণ হিসেবে শহীদ স্কুলছাত্র শাহরিয়ার খান আনাসের মায়ের কাছে লেখা চিঠির কথা উল্লেখ করেন ড. ইউনূস। যেখানে বন্ধুদের সঙ্গে রাজপথে নামাকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছিল সে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এসব ঘটনা হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ নয়। শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও এমন ঘটনা ঘটেছে, তবে ঢাকায় তা ঘটেছে আরও ব্যাপকভাবে।
সম্মেলন আয়োজনের জন্য বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতার এমন আয়োজন সার্কের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সার্ককে আজ প্রায় ভুলে যাওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, সার্কের মূল ধারণাই ছিল পারস্পরিক বিনিময় ও একে অন্যের কাছ থেকে শেখা। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই আমি সার্ক পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানিয়ে আসছি এবং এ দাবি আমি বারবার জানিয়ে যাবো।
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণ-অভ্যুত্থান দেশের পুরোনো কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে। তরুণরা নিজেদের জুলাই সনদ তৈরি করেছে এবং তারা মনে করে, দেশের সমস্যার মূল নিহিত রয়েছে সংবিধানে। সে কারণেই ভবিষ্যৎ সংবিধান নির্ধারণে গণভোটের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এই বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এসব বিষয় শ্রেণিকক্ষে পড়ানো হয় না। তরুণরা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছে। তারা আসন্ন নির্বাচনেও অংশ নেবে। আমি নিশ্চিত যে তাদের মধ্যে কেউ কেউ নির্বাচিত হবেন। সেদিনও যারা ক্লাসরুমে ছিল, এখন তারা রাজপথ থেকে নিজেদের রাজনৈতিক দল গঠন করেছে। তারা যদি নির্বাচিত হয়, তাদের মধ্যে কেউ হয়তোবা শিক্ষামন্ত্রীও হবেন। এখন শিক্ষিত সমাজ আমাদের বলুন, শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা মৌলিকভাবে চাকরিকেন্দ্রিক, যা তিনি ভুল বলে মনে করেন। শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল চাকরির জন্য মানুষ তৈরি করা-এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, মানুষ জন্মগতভাবেই সৃজনশীল; সৃজনশীলতাই মানবসভ্যতার মূলশক্তি। চাকরিনির্ভর শিক্ষা সেই সৃজনশীল মানুষকে দাসে পরিণত করছে বলেও মন্তব্য করেন প্রধান উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত তরুণদের উদ্যোক্তা ও পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে গড়ে তোলা, চাকরিপ্রার্থী নয়। কল্পনাশক্তিই মানুষের মূলশক্তি, আর সেই কল্পনাশক্তির জোরেই তরুণরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে জীবন দিয়েছে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন এবং বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে। স্বাগত বক্তব্য দেন ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান।