Image description

শিশুর গলায় ঝুলবে মাত্র দুই গ্রাম ওজনের ছোট্ট একটি ডিভাইস। দেখতে অনেকটা লকেটের মতো। কোনো কারণে শিশুটি পানিতে পড়লেই সঙ্গে সঙ্গে সাইরেন বেজে উঠবে। একই সময়ে অভিভাবকের মোবাইল ফোনে কল যাবে।

এমন একটি ডিভাইস উদ্ভাবনের দাবি করেছেন ভোলার তরুণ উদ্ভাবক মো. তাহসিন।
 
তাহসিন জানান, তার আপন দুই খালাতো বোন বাড়ির পুকুরে পড়ে মারা যায়। ঘটনাটি তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই শোক ও চিন্তা থেকেই তিনি শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে একটি কার্যকর সমাধান খোঁজার চেষ্টা শুরু করেন।

প্রায় আট থেকে নয় মাস গবেষণার পর তিনি ডিভাইসটি তৈরি করতে সক্ষম হন। এর নাম দিয়েছেন ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে ভোলা শহরের পৌরসভার পুকুরে তাহসিনের উদ্ভাবিত ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’টির পরীক্ষামূলক প্রদশর্নী অনুষ্ঠিত হয়। 

প্রদর্শনীতে দেখা যায়, পুকুর ভর্তি পানিতে নেমে পড়ছে সাঁতার না জানা এক শিশু।

সাথে সাথেই বেজে উঠলো বিপদ সংকেত (সাইরেন)। বিপদের আভাস পেয়ে আশপাশের লোকজন এসে তাকে উদ্ধার করেন। পানিতে ডুবে মৃত্যু থেকে রক্ষা পায় শিশুটি। তাহসিনের এ ব্যতিক্রমী উদ্ভাবন দেখতে পৌরসভার পুকুরে ভীর করেন পথচারীরা।
 
ডিভাইসটির উদ্ভাবক মো. তাহসিন জানান, পানিতে ডুবে নিজের দুই খালাতো বোনের মৃত্যু ভীষণভাবে নাড়া দেয় তাকে।


বিজ্ঞান প্রেমি তাহসিনের সেই ভাবনা থেকে উদ্ভাবন করেন লকেট আকৃতির বিশেষ একটি ডিভাইস। যার নাম দেন ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’। এ ডিভাইস সাথে থাকা শিশুটি পানির সংস্পর্শে আসলেই বেজে উঠবে সাইরেন। কল চলে যাবে অভিভাবকের মোবাইল ফোনে। অভিভাবকরা চাইলে জিপিএস-এর মাধ্যমে শিশুটি কোথায় পানিতে পড়েছে তার স্থানও নির্ধারণ করতে পারবেন।
তাহসিন জানান, ডিভাইস উদ্ভাবনে তার প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রথমদিকে এটির আয়তন ও ওজন বড় ছিল। কিন্তু বর্তমানে শিশুর শরীরে যুক্ত রাখার লকেটটির ওজন মাত্র ২গ্রাম। অভিভাবকের কাছে থাকবে একটি পোর্টেবল রিসিভার। যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে বাজার থেকে সংগ্রহ করা ইএসপি-৩২, জিএমএস মডিউল, ৩১৫, মেঘাহার্জের একটি ট্রান্সমিটার সিরিভার, ব্যাটারি ও আনুসাঙ্গিত কিছু যন্ত্রপাতি। শিশুর শরীরে থাকা ডিভাইসটি পানির সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে পানিতে থাকা মুক্ত ইলেকট্রনগুলো সামান্য বিদ্যুৎ পরিবহন করে রিসিভারে সিগনাল পাঠাবে। তখনই সাইরেন বেজে উঠবে ও মোবাইলে কল চলে যাবে। রিসিভার থেকে ৫০০ থেকে ৭০০ মিটার এলাকায় কার্যকর থাকবে ডিভাইসটি। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা গেলে প্রতিটি ডিভাইস ২-৩ হাজার টাকার মধ্যে অভিভাবকদের হাতে পৌঁছানো যাবে।

২০০৭ সালে ভোলার মনপুরা উপজেলার হাজিরহাটে জন্ম নেয়া তাহসিন ২০২৪ সালে স্থানীয় হাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। বর্তমানে ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজি মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী তিনি।

ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ভোলা একটি দ্বীপ জেলা। অন্যান্য জেলার থেকে এ জেলায় পানিতে পড়ে শিশু মৃত্যুর হার বেশি। এটি রোধ করার একটি উপযুক্ত সিস্টেম উদ্ভাবন করেছেন ভোলার ছেলে তাহসিন। তার ডিভাইসটির মাধ্যমে যদি একটি শিশুরও প্রাণ বাঁচানো যায় তাহলেই তার এ উদ্ভাবন সফল। ডিভাইসটি বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দিতে প্রশাসনিক সকল ধরনের সহায়তা করা হবে।

তাহসিনের ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে ভোলা জেলার সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, ভোলার চার দিকে নদী বেষ্টিত। এখানে প্রতিনিয়ত পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। আর এ মৃত্যু থেকে রক্ষায় তরুণ তাহসিন যে চাইল্ড সেফটি ডিভাইস উদ্ভাবন করেছেন বিষয়টি ভালো ও প্রশংসনী। এটির আরো উন্নয়নের জন্য যদি কোনো সহযোগীতা লাগে তাহলে সেটি করা হবে। সেই এটির ব্যবহারে শিশুদের অভিবাবকদের উদ্ভুদ্ব করতে প্রচারণা চালানো হবে।