রাজনৈতিক অস্থিরতা, মব জাস্টিস এবং আসন্ন নির্বাচনের ডামাডোলে আড়ালে পড়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ রপ্তানি খাত। টানা পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি আয়ে ধস নামায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, গত বছরের তুলনায় বর্তমানে ক্রয়াদেশ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে এবং আগামী জুন মাসের আগে এই মন্দা কাটার কোনো লক্ষণ নেই। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং কর্মসংস্থানে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ১৪.২৫ শতাংশ কমে ৩৯৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগস্ট মাস থেকে শুরু হওয়া এই নেতিবাচক প্রবণতা জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে মোট রপ্তানিকে ২.১৯ শতাংশ বা প্রায় ৫৪ কোটি ডলার কমিয়ে দিয়েছে। অক্টোবর ও নভেম্বরেও ধারাবাহিকভাবে আয় কমেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বৈশ্বিক চাহিদা সংকোচন এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার এই যুগলবন্দী দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
রপ্তানি আয় কমে যাওয়া মানেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়া। রিজার্ভ দুর্বল হলে জ্বালানি তেল, খাদ্যশস্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা সৃষ্টি হয়, যা সরাসরি বাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার কারণে তারা বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারাচ্ছেন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে যুক্ত থাকা ৪০ লাখ শ্রমিকের জীবিকা এখন হুমকির মুখে। ক্রয়াদেশ কম আসায় অনেক কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতা কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছে।
বিকেএমইএ এবং বিজিএমইএ-র শীর্ষ নেতাদের মতে, চীন, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া যেখানে সরকারি নীতি সহায়তায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ-গ্যাসের অনিশ্চয়তা ও নীতি সহায়তার অভাবে পিছিয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ এবং ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দাও বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ও নতুন সরকারের জন্য ক্রেতাদের দীর্ঘ অপেক্ষা ক্রয়াদেশের প্রবাহকে আরও শ্লথ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশ যখন এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চূড়ান্ত পথে রয়েছে, তখন রপ্তানি খাতের এই টানা মন্দা অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা যখন সংকুচিত হবে, তখন এই দুর্বল প্রস্তুতি বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এখনই নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং সংস্কার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে না পারলে রপ্তানি খাতের এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
সোর্স: কালের কণ্ঠ