Image description

গত বছর ২০২৫ সালে ভারতে অন্তত ৫০ জন মুসলিম বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৩ জন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে এবং ২৭ জন হিন্দু চরমপন্থীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে ‘দক্ষিণ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইন’ (এসএজেসি)।

সংস্থাটির ‘ইন্ডিয়া পার্সিকিউশন ট্র্যাকার’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী বা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কর্মীদের হাতে নিহত ২৩ জন মুসলিমের মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে। এ ছাড়া হিন্দু চরমপন্থীদের সহিংসতা বা হয়রানির শিকার হয়ে দুই জন মুসলিম আত্মহত্যা করেছেন বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর রাষ্ট্রীয় এবং চরমপন্থী গোষ্ঠী উভয় পক্ষ থেকে সহিংসতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হামলা একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে মুসলিম নিধনের বেশ কিছু ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালে ছিল ২০ জন, ২০২৪ সালে ২১ জন এবং ২০২৫ সালে ২৩ জনেরও বেশি মুসলিমকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাধ্যমে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। পহেলগাম হামলার পর কাশ্মীরে ৩,০০০ এর বেশি এবং দিল্লি কার বোমায় অভিযুক্ত করে ১,০০০ এর বেশি মুসলিমকে আটক করা হয়েছে।

উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত সহিংসতা ২০২৫ সালে নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে হিন্দু উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হাতে অন্তত ২৭ জন মুসলিম এবং ১ জন দলিত ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় (১৫ জন নিহত) প্রায় ৮০% বেড়েছে। ভারতের ১৩টি রাজ্যে মুসলিমদের লক্ষ্য করে অন্তত ২৬টি বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ২০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এ ছাড়া শত শত ব্যক্তিগত হামলা এবং ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধের ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে মুসলিমদের ওপর নানাবিধ অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে নির্বিচার গ্রেপ্তার, বাংলাভাষী মুসলিমদের ব্যাপকভাবে বহিষ্কার এবং পুশইন বা জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানোর মতো ঘটনা।

২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে জম্মু ও কাশ্মীরে। সেখানে নিরাপত্তা অভিযানের সময় অন্তত আটজন কাশ্মীরি মুসলিম বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় হেফাজতে নির্যাতন, গুম, সাজানো ‘এনকাউন্টার’ এবং পরিকল্পিতভাবে তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে।

উত্তরপ্রদেশে নিশ্চিতভাবে পুলিশের সঙ্গে ‘এনকাউটারে’ অন্তত ছয়জন মুসলিম নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া পুলিশের গুলিতে অসংখ্য মুসলিম পঙ্গু হয়ে যাওয়ার (যা ‘হাফ-এনকাউন্টার’ নামে পরিচিত) ঘটনাও নথিবদ্ধ করেছে সংস্থাটি।

ভারতের আরও চারটি রাজ্যে অন্তত পাঁচজন মুসলিম পুলিশ হেফাজতে বা আটকের কিছুক্ষণ পরে মারা গেছেন। পরিবারগুলোর অভিযোগ— নির্যাতন এবং চিকিৎসা সেবা না দেওয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযান এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ফলেও বেশ কিছু প্রাণহানি ঘটেছে।

গত বছরের মার্চ মাসে রাজস্থানে এক মুসলিম পরিবারে পুলিশি অভিযানের সময় দেড় মাস বয়সী এক শিশু পিষ্ট হয়ে মারা যায়। অন্যদিকে, নভেম্বর মাসে দিল্লিতে একটি বিয়ের শোভাযাত্রার সময় সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্সের (সিআইএসএফ) একজন অফ-ডিউটি কনস্টেবলের গুলিতে সাহিল আনসারি নামে ১৪ বছরের এক কিশোর নিহত হয়।

চরমপন্থীদের হাতে নিহত ২৭ জনের মধ্যে ৯ জন তথাকথিত ‘গো-রক্ষা’ বাহিনীর সহিংসতা বা গরু চুরির অপবাদে গণপিটুনির শিকার হন। এছাড়া অন্তত ৫ জনকে (৪ জন মুসলিম ও ১ জন দলিত) ‘বাংলাদেশি’ বা ‘অবৈধ অভিবাসী’ আখ্যা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ভারতের বর্তমান সরকারের বাংলাভাষী মুসলিম বিরোধী প্রচারণার ফলেই এমন ঘটনা ঘটছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ছত্তিশগড়ের আদিবাসীরা গত বছর ভয়াবহ নিরাপত্তা অভিযানের মুখে পড়েছেন। নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে ২৭৫ জনেরও বেশি মাওবাদীকে হত্যার দাবি করেছে, যাদের অনেকের বিরুদ্ধেই বেসামরিক আদিবাসী হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

আসাম এবং ভারতজুড়ে 'অবৈধ অভিবাসী' বিরোধী অভিযানের নামে হাজার হাজার বাঙালি মুসলিম ও রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে মে-আগস্ট মাসে ১,৮৮০ জনকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২০০ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে। আসামে গোরক্ষা আইনের অধীনে প্রায় ৩০০ জন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার অপরাধে আরও ১০০ জন মুসলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ধর্মীয় পরিচিতি বা শান্তিপূর্ণ প্রচারণার কারণেও বিশাল সংখ্যক মানুষ আইনি হেনস্তার শিকার হয়েছেন। উত্তরপ্রদেশসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শান্তিপূর্ণভাবে 'আই লাভ মুহাম্মদ' স্লোগান বা পোস্টার ব্যবহারের দায়ে ২৬৫ জনের বেশি মুসলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এসএজেসি-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “২০২৬ সালে প্রবেশের মুখে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর এই নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতা এখন একটি ‘বিপজ্জনক স্বাভাবিকতায়’ পরিণত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে নির্বাচন ঘনিয়ে আসা এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রবণতা সংখ্যালঘুদের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।”

শীর্ষনিউজ