Image description

উচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষা করে এবার কলাপাড়ার ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কয়লা কিনতে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। গত ৩০শে নভেম্বর 
উচ্চ আদালত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির চতুর্থ দরপত্র বাতিল ও পুনঃদরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে কারিগরি ও আর্থিকভাবে যোগ্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তি প্রদানের নোটিশ ইস্যুর নির্দেশ দেন আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেড (আরএনপিএল) কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু আদালতের রায় উপেক্ষা করে বিদ্যুৎ বিভাগ ও আরএনপিএল ডিপিএমে কয়লা কিনতে তৎপরতা চালাচ্ছে। এর আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কয়লা সরবরাহে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া পদ্ধতিতে চতুর্থ দফায় ডাকা দরপত্রে আর্থিক ও কারিগরিভাগে যোগ্য বিবেচিত হওয়ার পরও কার্যাদেশ না দিয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে দরপত্র বাতিল করলে রিট পিটিশন করে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইয়াংথাই এনার্জি।

অভিযোগ উঠেছে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক জিনহে গ্লোবাল কমোডিটি সাপ্লাই চেইন নামে একটি কোম্পানির আগ্রহেই এ প্রক্রিয়ায় কয়লা কেনার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। গত ২৪শে নভেম্বর কোম্পানিটি সরাসরি খনি থেকে কয়লা সরবরাহের প্রস্তাব দিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির বরাবর একটি চিঠি দেয়া হয়। এতে বিদ্যমান কয়লার দরে (ইয়াংথাই এনার্জি সরবরাহকৃত কয়লার মূল্য অনুযায়ী) সরবরাহের জন্য আগ্রহ প্রকাশের কথা জানানো হয়। ৪ঠা জানুয়ারি কোম্পানিটির দেয়া চিঠির উপর “বিষয়টি দেখুন” লিখে বিভাগের সচিবকে নির্দেশনা দেন উপদেষ্টা। যদিও সিঙ্গাপুরভিত্তিক এই কোম্পানিটির স্থানীয় প্রতিনিধি রেডসান এগ্রোসিম (বিডি) লিমিটেডের কয়লা সরবরাহের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। অথচ আদালতের রায়ের পরও সাশ্রয়ী দর প্রস্তাবকারী ইয়াংথাই এনার্জিকে কয়লা সরবরাহের ক্রয়াদেশ না দিয়ে সিন্ডিকেটের জন্য প্রক্রিয়া জটিল করায় বন্ধ হয়ে গেছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। যা বড় ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে প্রকল্পটিকে।

এ নিয়ে একাধিক চিঠি চালাচালি হয়েছে আরএনপিএল, বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিপিডিবি’র মধ্যে। যেখানে দেখা যায়, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কয়লা সংগ্রহের জন্য বিশেষ একটি কোম্পানিকে কাজ দিতে চিঠির ভাষাতে কৌশল করে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি দেয় আরএনপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। চিঠিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে কয়লা সংগ্রহ করা না গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা জানানো হয়। এরপর সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানিটি কয়লা সরবরাহের প্রস্তাব জমা দেয়ার একদিন পর আরএনপিএলের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর জন্য কয়লা সংগ্রহে জরুরিভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি দেয়া হয়। আরএনপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এইচ এম রাশেদের সই করা চিঠিতে জানানো হয়, কয়লা সংগ্রহে তিন ধরনের পদ্ধতির অনুসরণ করা যেতে পারে। প্রথমত, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ করে খনি নির্বাচনের মাধ্যমে কয়লা সংগ্রহ করা, দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে মাতারবাড়ী মজুতকৃত কয়লা ধারে এনে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা এবং তৃতীয় পরিকল্পনায় অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড (এলটিএম) পদ্ধতি অনুসরণ করে কয়লা কেনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাকি বিকল্প যে দু’টি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, তা বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অবাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।

আরএনপিএল কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করতে গত ১০ই ডিসেম্বর কোম্পানির ৬৮তম বোর্ড সভায় কয়লা কেনার একাধিক সিদ্ধান্ত অনুমোদন দিয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদনে না আসা পর্যন্ত ইপিসি ঠিকাদার কনসোর্টিয়াম (টেপকো-সিএইচইসি-সিডব্লিউইসি) থেকে ভ্যারিয়েশন অর্ডারের মাধ্যমে জরুরিভিত্তিতে কয়লা সংগ্রহের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০২৫) অনুযায়ী সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) অনুসরণ করে ইপিসি এবং ইন্দোনেশিয়ার কয়লাখনি থেকে সরাসরি কয়লা সংগ্রহের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। এ লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ, বিপিডিবি বিআরইবি, আরপিসিএল, নরিনকো ইন্টারন্যাশনালের একজন করে প্রতিনিধিকে নিয়ে ছয় সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা কয়লা সংগ্রহের জন্য যোগ্য খনি চিহ্নিত করতে ইন্দোনেশিয়া সফর করবেন। এ ছাড়া, ইপিসি ঠিকাদার থেকে কয়লা সংগ্রহের ক্ষেত্রে মূল্য ও শর্ত মূল্যায়নের জন্য বিপিডিবি, এমআইএসটি মন্ত্রণালয় ও আরএনপিএল-এর তিন সদস্যের একটি ভ্যারিয়েশন অ্যাসেসমেন্ট কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইপিসি কন্ট্রাক্টর থেকে কয়লা সংগ্রহ করা এই প্রথম এবং তাদের শঙ্কা এভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বিপর্যস্ত ও ব্যয়বহুল। কারণ ইপিসি কন্ট্রাক্টর কয়লা আন্তর্জাতিক কয়লা ট্রেডার কোম্পানি হতে সংগ্রহ করবে। ইপিসি হতে কয়লা নিলে বেড়ে যাবে প্রকল্পের ঋণ।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আরএনপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ এইচ এম রাশেদ ইসলামকে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।