Image description

আর ঠিক এক মাস বাদে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন। আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রচার। অনানুষ্ঠানিক প্রচার চলছে। ভোটের দিন যত কাছে আসছে, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্বেগ-উৎকন্ঠাও বাড়ছে। সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভোট নিয়ে হতাশা সংখ্যালঘু শিবিরে।

ফেব্রুয়ারিতে ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পরেই দেশজুড়ে সংখ্যালঘুদের উপর নানামাত্রিক নির্যাতনের খড়গ নেমে আসায় সমান তালে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের অন্য ধর্মের বিশিষ্ট নাগরিকরাও। এরমধ্যেই ৩২ জন বিশিষ্ট নাগরিক এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সংখ্যালঘুদের উপরে ক্রমাগত হিংসার বিচারে ব্যর্থ হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিবৃতিতে চারটি দাবি জানিয়েছেন এই নাগরিকেরা। দাবিগুলো হলো—সংখ্যালঘু মানুষ হত্যা, বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা এবং উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, দোকানপাট, মন্দির, গির্জা-সহ সব উপাসনালয়ের সুরক্ষা দিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

প্রশ্ন হল, এই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও দাবির বিষয়ে কতাটা সাড়া দিয়েছে সরকার? সে কথারও উল্লেখ আছে ৩২ নাগরিকের বিবৃতিতে। তাতে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে একের পর এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড-সহ ধারাবাহিক ভাবে সংখ্যালঘু নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড বেড়ে গিয়েছে। সংখ্যালঘু পরিবারের বাড়ি-ঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে দেশকে অস্থিতিশীল করতেই এগুলি করা হচ্ছে বলেই জনগণ মনে করে।

২০২৪ সালের ৫ অগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যলঘুদের ওপর হামলা- নির্যাতনের আড়াই হাজারের বেশি ঘটনা ঘটেছে বলে পরিসংখ্যান দিয়ে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা জানিয়েছেন, ভোটের আগে সংখ্যালঘুরা আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠায় আছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে ধারাবাহিক কয়েকটি ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সংখ্যালঘুদের মধ্যে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের রাউজানে বেশ কয়েকটি হিন্দু বৌদ্ধ বসতবাড়িতে বাইরে থেকে দরজা আটকে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মিঠুন শীল নামের এক জন জানান, ভোটের আগে এ ধরনের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। ওই ঘটনার পর থেকে সংখ্যালঘুরা পালাক্রমে রাতে বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছেন।

এই রাউজানের এক বিশিষ্ট নাগরিক নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানিয়ে ফোনে এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, ইচ্ছে থাকলেও ভোটে তারা কখনও কোনও ধরনের কাজকর্ম করতে পারেন না। এবার তো ভোট কেন্দ্র যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও নেই। তিনি বলেন, 'আমরা যদি বিএনপিকে ভোট দেই, তা হলে জামাত অসন্তুষ্ট হয়। তারা এসে উল্টো চার্জ করবে। আবার, যদি জামাতকে ভোট দেই, তাহলে বিএনপি ধরবে।' তাঁর প্রশ্ন- কোন দিকে যাবো আমরা?

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা এখন কার্যত আতঙ্কের জনপদে রূপ নিয়েছে। হত্যা, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও সশস্ত্র সংঘর্ষে লাগামহীন হিংসার কারণে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মী ও প্রার্থীরাও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ সম্ভব হবে কি না— তা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সর্বত্র। পুলিশের তথ্যমতে, এই দেড় বছরে রাউজানে অন্তত ৬৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে বিএনপির আট জন, আওয়ামি লিগের চার জন কর্মী এবং এক জন ব্যবসায়ী রয়েছেন।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, 'আপনি ভালুকার ঘটনা চিন্তা করেন। এক জন মানুষকে কোন প্রমাণ ছাড়া পেটানো হয়েছে এবং পরে তাঁকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে।' নির্মল রোজারিও বলেন, ‘এই ধরনের ঘটনাগুলো আমাদের শঙ্কিত করে। ভোটের আগে আমার প্রথম গুরুত্ব হল জীবন রক্ষা। আমার জীবন যদি রক্ষা না হয়, আমার পরিবার যদি রক্ষা না হয়, তাহলে ভোট দিয়ে কী করবো আমরা?’ তাঁর মতে, বাংলাদেশে নির্বাচনে হিন্দু ভোট সবসময়ই একটা ফ্যাক্টর। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের মূল্যায়নে দেশে ৮০টির মতো সংসদীয় আসনে জয় পরাজয় নির্ধারণে প্রভাব ফেলে সংখ্যালঘুদের ভোট। তবে, এবার নির্বাচনে আওয়ামি লিগ লড়তে না পারায় সংখ্যালঘুদের ভোট টানতে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বে দুই জোট‌ই তৎপর হয়ে উঠেছে। জামায়াতে ইসলামি এবারই প্রথম দু'জন হিন্দুকে মনোনয়ন দিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট নিজেদের দিকে টানতে চাইছে।