Image description
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি এক মাস

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আছে মাত্র এক মাস। ভোটের ডামাডোলে এখন পুরো দেশ। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে ব্যস্ত সময় পার করছে নির্বাচন কমিশনও। তবে নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে পরপর সংঘটিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ শঙ্কা আরও বেড়েছে। এজন্য কেউ কেউ নির্বাচন ভন্ডুলের ষড়যন্ত্রের কথাও বলছেন। এর মধ্যেই দলগুলোর অভিযোগ ও পালটা অভিযোগে কোথাও কোথাও উত্তেজনাকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দলগুলো বলছে, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাদের মতে, মব সন্ত্রাস ও ভয়ের রাজত্ব দূর করতে না পারলে সুষ্ঠু নির্বাচন করা কঠিন। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করার জন্য অনবরত তাগিদ দিচ্ছেন তারা। দাবি জানাচ্ছেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করারও। উদ্দেশ্য হলো, প্রার্থীরা যাতে নির্ভয়ে প্রচারণা চালাতে পারেন, ভোটাররা নির্ভয়ে যেতে পারেন ভোটকেন্দ্রে।

বিশ্লেষকদের মতে, সব দলকে নিরপেক্ষ আচরণ করতে হবে, যাতে ভোট নিয়ে জনগণের মধ্যে কোনো প্রশ্ন দেখা না দেয়। এছাড়াও নাগরিক ও রাজনৈতিক দল সবার জন্য আস্থার পরিবেশ তৈরি করা, দলগুলোর মধ্যে বিভেদ দূর করা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করাও চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন তারা।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। তবে দলটির নেতাকর্মীরা ‘আওয়ামী লীগকে ছাড়া ভোট হতে পারবে না’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন প্রচারণা চালাচ্ছেন। প্রার্থিতা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে নির্বাচনে অংশ নেওয়া কয়েকটি দলের মধ্যে। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিনিয়তই তিক্ততা বাড়ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। এর প্রভাব পড়ছে দল দুটির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও। এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে আরও শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও বিশ্লেষকরা মনে করেন। তাদের মতে, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আয়োজন করা ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ভোটগ্রহণ ও গণনাকে কেন্দ্র করে উদ্ভব হতে পারে নতুন কোনো পরিস্থিতির। কারণ গণনায় অপ্রত্যাশিত বিলম্ব হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করাই চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এ বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়া নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক দলগুলোর শতভাগ সহযোগিতার ওপর। এছাড়া এআই ব্যবহারজনিত চ্যালেঞ্জও দলগুলোর সামনে বড় ঝামেলা হয়ে উঠতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যেই। তারা যদি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে তাহলে নির্বাচন সংকটের মুখে পড়বে। তারা যদি সহিংসতাকে প্রমোট করে তাহলেও নির্বাচন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। নির্বাচনে ভোট দিতে কাউকে বাধা দেওয়া হলেও নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।’

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসবিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, আসন্ন নির্বাচনে জনগণের প্রত্যাশার জায়গাটা অনেক বড়। সেই চাওয়া মেটাতে না পারলে কোনো দলই সফল হবে না। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘জনগণ আগের মতো শুধু দল কিংবা মার্কা দেখে ভোট দিয়ে দেবে, তেমনটি নয়। কারণ এবার ভোটারদের ভেতর ৩০ বছরের কম বয়সিদের সংখ্যা বেশি। এখানে তাদের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী তরুণ প্রজন্মের একটা আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। দলগুলো যদি সেটাকে শনাক্ত করে পূরণ করতে না পারে, তাহলে এই তরুণরা ভোট দিতে উৎসাহিত হবে না।’

অবশ্য আলোচনা করে জানা গেছে, ভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতিতে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সন্তুষ্ট। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের উদাহরণ টেনে দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বলেন, অতীতে মনোনয়নপত্র দাখিল, মনোনয়নপত্র বাছাই, আপিল দায়ের ও নিষ্পত্তির সময়ে অনেক মারামারি, প্রার্থী তুলে নেওয়া ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এবারই প্রথমবারের মতো দু-একটি ঘটনা ছাড়া সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে এসব কর্মযজ্ঞ শেষ হতে যাচ্ছে। তবে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের কারণে প্রার্থীদের মধ্যে নানা শঙ্কাও কাজ করছে। নির্বাচন কমিশনকে এজন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করার আহ্বান জানিয়েছে দলগুলো।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যুগান্তরকে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনই একটা চ্যালেঞ্জ। এবার যাদের সঙ্গে নির্বাচন করছি তারা একটা ‘ছায়া শক্তি’। তারা ছায়ার মতোই নানাভাবে কাজ করে ভোটারদের প্রভাবিত করছে। প্রতিপক্ষ ধর্মকে ব্যবহার করছে। এগুলো মোকাবিলা করে সামনের দিনে এগিয়ে চলাই চ্যালেঞ্জ।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য যেটা করার দরকার ছিল, সেটি সরকার করেনি। তারপরেও এখন পুলিশ তৎপর থাকলে এটা কোনো সমস্যা হবে না। এছাড়া প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় জামায়াতের লোকজন রয়েছে। এনিয়ে আমরা সরকারকে চিঠি দিয়েছি। সরকারকে এই বিষয়ে দৃষ্টি রাখতে হবে।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার যুগান্তরকে বলেন, প্রশাসন একটি দলের দিকে ঝুঁকে গেছে। ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের বৈষম্যপূর্ণ আচরণ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের বিপরীত। প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় রদবদল হয়েছে। কোনো কোনো জায়গা থেকে অভিযোগ আসছে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও ইউএনওরা জামায়াতের প্রার্থীদের সঙ্গে বৈরী আচরণ করছেন। এটা সরকারি কর্মকর্তাদের কাজ হতে পারে না। তাদের সবার সঙ্গে সমান আচরণ করা উচিত।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না। চট্টগ্রামে শনিবারেও খুন হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে, হামলা-মামলা হচ্ছে। যেখানে মারামারি হচ্ছে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। এসব ঘটনায় নানা প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। ফলে আসন্ন নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের ভূমিকা একটা চ্যালেঞ্জের মুখে আছে। এই জায়গায় সরকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনকে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।

গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক যুগান্তরকে বলেন, বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। প্রার্থী, ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ইস্যুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এগুলো নির্বাচনে শঙ্কা তৈরি করছে, সেই সঙ্গে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছে। এটি নির্বাচন বানচাল করার কোনো ষড়যন্ত্র কিনা সেটি দেখার বিষয়।

তিনি বলেন, প্রশাসন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের পেশাদারত্বের মধ্যে আনা সরকারের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সেই সঙ্গে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধটাও জাগিয়ে তুলতে হবে, যাতে ভোটাররা মনে করেন তারা নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন। সাইফুল হক অবশ্য মনে করেন, ইতোমধ্যে দেশ নির্বাচনি পরিবেশে ঢুকে গেছে। ২১ জানুয়ারি প্রার্থীদের মার্কা বরাদ্দ দেওয়া হলে সব শঙ্কা ও সন্দেহ দূর হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স যুগান্তরকে বলেন, ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার জন্য সব রাজনৈতিক দলকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। এজন্য নির্বাচনি আচরণবিধি সব রাজনৈতিক দলের মেনে চলা উচিত। তিনি বলেন, নির্বাচনি সহিংসতা যাতে কোনোভাবেই না হয়, সেজন্য সব দলকে সতর্ক থাকতে হবে। বিজয়ী মনোভাব নিয়ে নির্বাচন করলেও জনগণ যাতে প্রত্যক্ষভাবে ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে সব দলকে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, যারা চব্বিশের অভ্যুত্থানের সময় জনগণের ওপর গুলি করেছে, পিটিয়ে মেরেছে, সেসব সন্ত্রসীরা এখনো ঘাপটি মেরে রয়েছে। সরকার এখন পর্যন্ত সেসব আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসী এবং তাদের দোসরদের গ্রেফতার করতে পারেনি। এমতাবস্থায় যে কারও পরিণতি শরিফ ওসমান হাদির মতো হওয়ার আশঙ্কা বিরাজমান রয়েছে। তিনি বলেন, যারা প্রার্থী আছেন, প্রার্থীদের সঙ্গে কাজ করছেন এবং দেশের আপামর জনতা; সবার জন্য শতভাগ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বারবার বলে আসছি, তাও নিশ্চিত করতে হবে।