আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-১ আসনে (মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী উপজেলার একাংশ) গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন মোঃ কাবির মিয়া নামের কেন্দ্রীয় এক আওয়ামী লীগ ও জেলা পর্যায়ের তাঁতী লীগ নেতা। যদিও মনোনয়ন বাছাই শেষে তার প্রার্থিতা বাতিল ও আপিল দুটোই হয়েছে, তারপরও আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের ঘোর বিরোধী নেতা ভিপি নুরের দল থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হত্যাচেষ্টা মামলায় কারাগারে থাকা এ ব্যক্তিকে ট্রাক প্রতীকে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। যা নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানপন্থি দল গণ অধিকার পরিষদের কাছে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের মতো এ ধরণের কার্যক্রম অপ্রত্যাশিত। যেখানে দলটি জাতীয় পার্টির মতো আওয়ামী দোসরদের বিরুদ্ধেই নিজেদের শক্ত অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে, সেই দল আবার আওয়ামী লীগের নেতাকে মনোনয়ন দিয়ে দ্বিচারিতার প্রমাণ দিয়েছে। তবে গণঅধিকার পরিষদের দাবি, কাবির মিয়ার ব্যাপারে তারা কোনো অভিযোগ পায়নি। যার কারণে, মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, কাবির মিয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য এবং গোপালগঞ্জ জেলা তাঁতিলীগের সভাপতি। শুধু তাই নয়,বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যাচেষ্টা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। এ মামলায় গত বছরের ১৭ এপ্রিল ডিএমপির উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ বিমানবন্দর সিভিল অ্যাভিয়েশন এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেছে। তাছাড়াও, তার বিরুদ্ধে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আশুলিয়া থানায় পৃথক আরও দুটি মামলা রয়েছে। গত বছরের এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত তিনি কারাগারে রয়েছেন। তারপরও দলটি তাকে মনোনীত করেছে।
আরও জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি ডামী প্রার্থী হিসেবে ঈগল প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন। তারপর সে বছরই মে মাসে প্রশ্নবিদ্ধ দ্বিতীয় ধাপের ৬ষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে অংশ নেন।
তাছাড়াও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ডামী নির্বাচনের প্রচারণার সময়ে কাবির মিয়া এক ভিডিওতে বলেছিলেন,ছোটবেলায় যখন বুঝতে শিখেছি বা যখন ছাত্র ছিলাম, তখন ছাত্রলীগ করেছি। এরপরে যুবক বয়সে যুবলীগ করেছি। তারপরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পতাকাতলে থেকে মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ করেছি, গোপালগঞ্জ জেলা তাঁতী লীগের সভাপতি ছিলাম। আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক উপকমিটির সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন ছিলাম। আমার মুজিব কোর্ট পরা নিয়েও অনেকের অনেক ধরনের কথা আমি শুনতে পেয়েছি। জানিনা তাদের চিন্তাভাবনা কী? মুজিব কোর্ট কারো কেনা নয়। বঙ্গবন্ধুর পতাকাতলে থেকেই আমি রাজনীতি করছি। সুতরাং মুজিব কোর্ট পরার অধিকার আমার আছে।
তিনি এ ভিডিওতে আরও বলেন, আমার বিপরীতে যারা রাজনীতি করছে, তারা এমপি হওয়ার পর আওয়ামী লীগার হয়েছে। আর আমি আওয়ামী লীগ হওয়ার পর উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছিলাম এবং এমপি ইলেকশন করছি। সুতরাং আমাকে মুজিব কোর্ট নিয়ে কোনো কথা বললে কোনো বরদাশত করবো না। আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক। কোনোভাবেই দল পরিবর্তন করিনি, জীবদ্দশায় আর করবোও না। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
আরও জানা গেছে, গত ৩ জানুয়ারি গোপালগঞ্জ-০১ আসনে ১৩ প্রার্থীর মধ্যে ৪ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল এবং বাকী ৯ জনের প্রার্থিতাকে বৈধ ঘোষণা করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে গণঅধিকার পরিষদের কাবির মিয়াসহ স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল আলম শিমুল, কাইউম আলী খান এবং ব্যারিস্টার নাজমুল আলম রয়েছেন।
অন্যদিকে, বৈধ প্রার্থীরা হলেন— বিএনপি মনোনীত মো. সেলিমুজ্জামান মোল্যা, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ মোল্লা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, জনতার দলের মো. জাকির হোসেন, কমিউনিস্ট পার্টির নীরোদ বরণ মজুমদার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ইমরান হোসেন আফসারী, এবি পার্টির প্রিন্স আল আমিন, স্বতন্ত্র প্রার্থী এম. আনিসুল ইসলাম এবং সুলতান জামান খান।
এ বিষয়ে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আরিফ উজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, গোপালগঞ্জ-১ আসনে গণধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. কাবির মিয়া ঋণখেলাপি থাকার কারণে তার মনোনয়নপত্র প্রাথমিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। তবে তিনি চাইলে হাইকোর্টে আপিল করার সুযোগ রয়েছে।
কাবির মিয়াকে গণঅধিকারের মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ জানিয়ে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক গোপালগঞ্জ-১ আসনের এক সংসদ প্রার্থী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কাবির মিয়া জীবনের শুরু থেকেই আওয়াী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত, বিগত দিনে তিনি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ২০২৪ সালের ডামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর জাতীয় পার্টিকে ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে তাদের সাথে সংঘর্ষে পর্যন্ত জড়িয়েছে, অথচ তিনি নিজ দল থেকে প্রার্থী করেছেন ঘোর আওয়ামিলীগের নেতাকে। যিনি জুলাই আগস্টের গণহত্যা মামলায় কারাগারে ও ডামী নির্বাচনের প্রার্থী। নুরুল হক নুর ও তার দলের দ্বিচারিতামূলক অবস্থান খুবই নিন্দনীয় ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ।
মুকসুদপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, মানুষ এখন আর তাকে (কাবির মিয়া) গ্রহণ করবে না। আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ না করে গণধিকার পরিষদ থেকে নির্বাচন করা ওই দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা গণধিকার পরিষদের জন্য খুবই খারাপ বার্তা। আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন মুকসুদপুর-কাশিয়ানীর মানুষ কখনোই মেনে নেবে না।
মুকসুদপুর পৌরসভার সাবেক কমিশনার মোয়াজ্জেম হোসেন মিন্টু বলেন, আমাদের দেশের মানুষের অনেকের অভ্যাস সুযোগ বুঝে রং বদলানো। অর্থাৎ, যখন যেখানে সুবিধা হয় তখন সেই দলে যোগ দেওয়া। কাবির মিয়াও তেমনি একজন।
গোপালগঞ্জ জেলা জামায়াতের সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মো. রেজাউল করিম মোল্লা বলেন, কাবির মিয়া আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ না করেই গণধিকারের ব্যানারে নির্বাচন করতে চাচ্ছেন। এটা মূলত তিনি আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের অপচেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়।
নিজেদের অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা তার বিষয়ে কোনো ধরনের অভিযোগ পাইনি। তিনি আওয়ামী লীগের কোনো পদ-পদবীতে ছিল না, এতটুকুই আমরা জানি। যদি তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকে বা পদ-পদবীতে থাকার বিষয়ে কোনোকিছু প্রমাণিত হলে আমরা নতুন করে বিবেচনা করব।
এ বিষয়ে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) হাসান আল মামুন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের কাছে তথ্য ছিল তিনি (কাবির মিয়া) বহু আগেই আওয়ামী লীগ থেকে সরে এসেছেন। যার কারণে, আমাদের দল থেকে তাকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তারপরও আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগের বিষয়টি নতুন করে যেহেতু আলোচনায় এসেছে, সেহেতু আমরা ফের তদন্ত করে দেখব এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মনোনয়ন প্রত্যাহারও করে নেওয়া যাবে। তবে এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে দলের সভাপতি নুরুল হক নুরকে কল দিয়ে পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) দেশের ৩০০ আসনে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন এবং একই সাথে জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এর উপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন ছিল গত ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়ন যাচাই-বাছাই করা হয়।
এছাড়া, রিটার্নিং অফিসারের আদেশের বিরুদ্ধে কমিশনে আপিল দায়েরের শেষ তারিখ ১১ জানুয়ারি (আজ) পর্যন্ত। কমিশনের দায়ের করা আপিল নিষ্পত্তি করা হবে ১২ জানুয়ারি (আগামীকাল) থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং অফিসাররা প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনী প্রচারণা চলবে আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘন্টা আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত।