গাড়িতে বসে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছি। হঠাৎ মাথায় এল, বিএনপি ও জামায়াত দুটো দলের মধ্যে কিছু পার্থক্য নোট করি। বিএনপির দল বড়, ভোট ব্যাংক বেশি; তবে নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, বিএনপি 'জনপ্রিয়তায়' অনেক এগিয়ে থাকলেও জামায়াত 'সংগঠন হিসেবে' অনেক বেশি সুসংহত ও পেশাদার। বিএনপি একটি 'প্ল্যাটফর্ম' যেখানে সব মতের মানুষ মিশে আছে, আর জামায়াত একটি 'মেশিন' যেখানে সবাই একই ছাঁচে তৈরি। এটাকেই দশটি পয়েন্টে ব্যাখ্যা করা যায়।
১. সাংগঠনিক শৃঙ্খলা (Organizational Discipline)
বিএনপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ধরা হয় তাদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাকে। দলটিতে প্রায়ই পদ-পদবি নিয়ে গ্রুপিং এবং প্রকাশ্য কোন্দল দেখা যায়। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী একটি 'ক্যাডার ভিত্তিক' দল হওয়ায় তাদের শৃঙ্খলা অত্যন্ত কঠোর। ওপরের নির্দেশ নিচের কর্মীরা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই পালন করে, যা বিএনপিতে বিরল।
২. নিয়মিত তহবিল বা অর্থ ব্যবস্থাপনা
জামায়াতের আয়ের উৎস অত্যন্ত সুসংগঠিত। তাদের প্রত্যেক কর্মীকে আয়ের একটি অংশ নিয়মিত চাঁদা (এয়ানত) হিসেবে দিতে হয়, যা দিয়ে দল সারাবছর চলে। বিএনপির কোনো নিয়মিত আর্থিক কাঠামো নেই; তারা মূলত বড় নেতাদের ডোনেশন বা নির্বাচনের সময় পাওয়া অনুদানের ওপর নির্ভরশীল।
৩. কর্মীদের মান ও প্রশিক্ষণ
জামায়াতের প্রতিটি স্তরের কর্মীকে নির্দিষ্ট সিলেবাস অনুযায়ী বই পড়তে হয় এবং পরীক্ষা দিতে হয়। একে বলা হয় 'পাঠচক্র'। এর ফলে তাদের কর্মীরা দলের আদর্শ সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন থাকে। বিএনপির কর্মীরা মূলত আবেগ এবং নেতার প্রতি আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে রাজনীতি করে, কিন্তু আদর্শিক প্রশিক্ষণে তারা অনেক পিছিয়ে। যার কারণে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন অপরাধের কারণে তারা নিউজপেপারের শিরোনাম হয়ে থাকে।
৪. বিপদে পারস্পরিক সহযোগিতা
জামায়াতের কোনো কর্মী জেল খাটলে বা অসুস্থ হলে দল তার পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করে। প্রবাসেও তারা একে অপরকে আগলে রাখে। বিএনপির বিশাল কর্মী বাহিনী থাকলেও বিপদের সময় কর্মীরা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের একা মনে করেন এবং দল থেকে পর্যাপ্ত সাংগঠনিক বা আর্থিক সহায়তা পান না।
৫. চেইন অফ কমান্ড ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ
জামায়াতের 'শুরা' পদ্ধতি বা পরামর্শ ভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটি খুব শক্তিশালী। একবার সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে কোনো দ্বিমত থাকে না। বিএনপিতে অনেক সময় কেন্দ্র থেকে আসা সিদ্ধান্ত তৃণমূলের নেতারা মানতে চান না, অথবা দলের ভেতরেই নানা উপদল তৈরি হয়।
৬. আনুগত্য ও ত্যাগ
জামায়াত কর্মীদের মধ্যে দলের প্রতি এক ধরনের 'ধর্মীয় আবেগ' কাজ করে, যা তাদের অনেক বেশি ত্যাগী করে তোলে। বিএনপির বড় অংশই ক্ষমতায় যাওয়ার বা ব্যক্তিগত লাভের আশায় রাজনীতি করে (যদিও সবাই নয়), যার ফলে প্রতিকূল সময়ে অনেক নেতা দল ত্যাগ করেন বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। জামায়াতের বড় নেতাদের দল ত্যাগ করার উদাহরণ প্রায় নেই বললেই চলে।
৭. সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রোপাগান্ডা ম্যানেজমেন্ট
বর্তমান সময়ে জামায়াতের আইটি সেল এবং সোশ্যাল মিডিয়া উইং বিএনপির চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় এবং পরিকল্পিত। তারা দলীয় প্রচারণা বা কোনো ইস্যুকে অনলাইনে যতটা সুসংগঠিতভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে, বিএনপি তাদের বিশাল জনবল থাকা সত্ত্বেও তা প্রায়ই পারে না।
৮. নেতৃত্ব তৈরির ধারাবাহিকতা (Leadership Pipeline)
জামায়াতের একটি শক্তিশালী সহযোগী সংগঠন রয়েছে (ছাত্রশিবির), যেখান থেকে প্রতি বছর দক্ষ, শিক্ষিত এবং আদর্শিক কর্মী বের হয়ে আসে। এই কর্মীরাই পরবর্তীতে মূল দলের নেতৃত্বে আসেন। ফলে তাদের নেতৃত্বে কোনো শূন্যতা তৈরি হয় না। অন্যদিকে, বিএনপির ছাত্রদল বা যুবদলের কাঠামো থাকলেও সেখান থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াটি অনেক সময় ব্যক্তি-কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে দলটিকে পিছিয়ে দেয়।
৯. প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা (Resilience)
বিগত দেড় দশকে চরম রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মধ্যেও জামায়াত তাদের আন্ডারগ্রাউন্ড বা গোপন সাংগঠনিক তৎপরতা সচল রাখতে পেরেছে। তাদের কর্মীরা প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে কাজ করতে হয়, সেই প্রশিক্ষণ পায়। বিএনপি বড় দল হওয়ায় উন্মুক্ত পরিবেশে রাজনীতি করতে অভ্যস্ত, তাই প্রবল চাপের মুখে তাদের সাংগঠনিক কাঠামো অনেক সময় ভেঙে পড়ে বা নেতারা আত্মগোপনে চলে গেলে কর্মীরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
১০. প্রাতিষ্ঠানিক সেবা ও সামাজিক কাজ
জামায়াত কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, তারা একটি 'সোশ্যাল সার্ভিস নেটওয়ার্ক' হিসেবেও কাজ করে। সারাদেশে তাদের অসংখ্য স্কুল, হাসপাতাল এবং চ্যারিটেবল ট্রাস্ট রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সংকটে তারা দলীয় পরিচয়ের বাইরেও অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ত্রাণ ও সেবা পৌঁছে দেয়, যা তাদের কর্মীদের সাধারণ মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত রাখে। বিএনপির জনসেবা মূলত ব্যক্তিগত পর্যায়ের নেতাদের দানের ওপর নির্ভরশীল, দলের কোনো স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সেবামূলক কাঠামো নেই।
একনজরে দশটি পয়েন্ট
১. সাংগঠনিক শৃঙ্খলা
২. নিয়মিত তহবিল (এয়ানত)
৩. কর্মীদের আদর্শিক প্রশিক্ষণ
৪. বিপদে পারস্পরিক সহযোগিতা
৫. শক্ত চেইন অফ কমান্ড
৬. আনুগত্য ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মী
৭. দক্ষ সোশ্যাল মিডিয়া ও আইটি সেল
৮. সুশৃঙ্খল নেতৃত্ব তৈরির পাইপলাইন
৯. চরম প্রতিকূলতায় টিকে থাকার সক্ষমতা
১০. প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক ও সেবামূলক কাজ
এই পয়েন্টগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপি একটি 'ইলেকশন উইনিং মেশিন' হিসেবে শক্তিশালী, কিন্তু জামায়াত একটি 'অর্গানাইজেশনাল মেশিন' হিসেবে অনেক বেশি নিখুঁত।
তবে এ সবকিছুর পরও নির্বাচনী রাজনীতিতে বিএনপিই এগিয়ে থাকে, এর কারণ হিসেবে বলা যায়, (১) ধর্মীয় মূল্যবোধ ধারণের পাশাপাশি লিবারেলিজম ও জাতীয়তাবাদের আদর্শ প্রচার করা (অজ্ঞতা বা পাপাচারী মানসিকতার কারণে অধিকাংশ মানুষ এখনো সরাসরি শরিয়াহর শাসন কামনা করে না); (২) জনগণ ক্ষমতার কার্যকর বিকল্প (Alternative to Power) হিসেবে তাদের দেখে। দল মানেই লীগ ও বিএনপি, অনেক বাঙালি এভাবেই বিবেচনা করে। (৩) The Zia Factor। স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে খাল খনন ও গ্রামোন্নয়নের মাধ্যমে তিনি যে ভিত্তি গড়েছিলেন, তা আজও বিএনপির ভোট ব্যাংককে অটুট রেখেছে। লীগের আছে শেখ মুজিব, বিএনপির আছে শ হি দ জিয়া; কিন্তু দেশীয় প্রেক্ষাপটে সর্বস্তরের জনসাধারণের মধ্যে বরিত তাদের সমমানের কোনো ব্যক্তিত্ব জামায়াতের আছে বলে অনেকেই মনে করেন না। (৪) বৃহৎ ভোট ব্যাংক ও 'কিং মেকার' ভূমিকা।