Image description

সব ভয়ভীতি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কড়াকড়ি, বিশেষ অভিযানসহ সব ধরনের নজরদারিকে তুচ্ছ করে দুর্বৃত্ত, সন্ত্রাসী আর খুনিরা বেপরোয়া। দিনদুপুরে প্রকাশ্যে এখন তারা মানুষ খুনে মত্ত। সরকারের নির্দেশনাকে পাত্তা না দিয়ে একের পর এক খুন করে যাচ্ছে। আজ ঢাকায় তো কাল যশোরে।

 
পরশু চট্টগ্রামে। সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেখানে সবাই মিলে স্থিতিশীল রাখার কথা, সেখানে একটি সন্ত্রাসীচক্র নির্মম, নিষ্ঠুর ও নৃশংসভাবে যাকে তাকে হত্যা করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। সবার সামনে ব্যস্ত রাস্তায় তাদের অস্ত্রের ঝনঝনানি আর গুলির শব্দে এখন নিয়মিত প্রকম্পিত হচ্ছে জনপদ।
 
তুচ্ছ ঘটনা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যাধুনিক সব বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র। এতে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। যৌথ বাহিনীর অপারেশন ডেভিল হান্ট চলাকালীন এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগ আরো বাড়াচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

 

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযান ও তৎপরতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

 

গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়েও দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার গ্রাফ নিম্নমুখী হচ্ছে না। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল ছিল রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর। বছরজুড়ে দেশে মোট ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছে ১০৪ জন। এ ছাড়া এসব ঘটনায় আহত হয়েছে চার হাজার ৭৪৪ জন।

মাসওয়ারি নিহতের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ১০ জন, ফেব্রুয়ারিতে আটজন, মার্চ মাসে সর্বোচ্চ ২০ জন, এপ্রিলে ১০ জন, মে মাসে ৯ জন, জুন মাসে ১০ জন, জুলাইয়ে আটজন, আগস্টে ছয়জন, সেপ্টেম্বরে পাঁচজন, অক্টোবরে ছয়জন, নভেম্বরে আটজন এবং ডিসেম্বরে চারজন রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছে।

 
নির্বাচনের বছর হিসেবে ২০২৬ সালের শুরুতেও এই ধারা অব্যাহত থাকায় সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। গত ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর গত বুধবার পর্যন্ত অন্তত পাঁচজন রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছে।

 

দেশে বর্তমানে অপরাধী দমনে অপারেশন ডেভিল হান্ট নামের বিশেষ অভিযান চলমান; কিন্তু এই অভিযানের মধ্যেই একের পর এক প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত বুধবার রাতে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় আজিজুর রহমান মুছাব্বির নামের স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক আরো ঘনীভূত হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মী নাসির উদ্দিন এলান এ বিষয়ে বলেন, ‘আমি মনে করি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যর্থতার কারণেই এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে। পলিটিক্যাল ব্যক্তিরা জনসমক্ষে হত্যার শিকার হচ্ছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অপরাধ ঘটার পর প্রকৃত খুনিরা যখন ধরা পড়ে না বা পার পেয়ে যায়, তখনই এ ধরনের অপরাধে অন্যরা উৎসাহিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর খুনিদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। অপারেশন ডেভিল হান্ট চলাকালীন প্রকাশ্যে গুলি চালানো মানে হলো অপরাধীরা রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। পুলিশ প্রতিদিন অনেককে গ্রেপ্তার করছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত অপরাধীরা জালে ধরা পড়ছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।’

গোয়েন্দা সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ অপরাধজগৎ বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। তাদের মধ্যে অন্যতম সানজিদুল ইসলাম ইমন। তিনি মালয়েশিয়া থেকে তাঁর বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে রাজধানীর ধানমণ্ডি, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড ও হাজারীবাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন। মোহাম্মদপুরের অপরাধজগৎ এখনো নিয়ন্ত্রণ করছেন বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ ও পিচ্চি হেলাল।

জানা গেছে, গত বছর ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই ইমন ও পিচ্চি হেলাল বাহিনীর মধ্যে আধিপত্যের লড়াই চলছে। এক পর্যায়ে পিচ্চি হেলাল দেশ ছাড়লে মোহাম্মদপুরের বেশির ভাগ এলাকা ইমনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অন্যদিকে ক্লাবপাড়া, মতিঝিল, খিলগাঁওসহ বেশ কয়েকটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ করছে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান গ্রুপের সদস্যরা। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই মাফিয়াদের ইশারায় স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠছে নতুন নতুন সন্ত্রাসী বাহিনী ও দখলবাজ চক্র।

গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে লোমহর্ষক কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে গত সোমবার যশোরের মণিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে গত শনিবার যশোর শহরের শংকরপুরে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর দুপুর আড়াইটার দিকে তিনি ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে যাওয়ার সময় পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা তাঁকে প্রকাশ্যে গুলি করে। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি মারা যান। এর আগে গত ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় নির্বাচনী প্রচারে যাওয়ার পর প্রকাশ্যে গুলি করা হয় বিএপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহকে। এ সময় নিহত হন ‘সন্ত্রাসী’ সারোয়ার হোসেন।  

গত ১১ নভেম্বর পুরান ঢাকায় আদালতের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় সন্ত্রাসী তারেক সাইদ মামুনকে। গত ১৫ নভেম্বর লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জের পশ্চিম লতিফপুর এলাকায় ওয়ার্ড বিএনপি সাধারণ সম্পাদক আবুল কালামকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। রাজধানীর পল্লবীতে গত ১৭ নভেম্বর গোলাম কিবরিয়া নামের এক যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরনগরীর বায়েজিদ বোস্তামী, আকবরশাহ এবং পতেঙ্গা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা পকেটে পিস্তল নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরছে। গত ১৫ দিনে সেখানে অন্তত তিনটি বড় গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, মূলত তিনটি কারণে অস্ত্রের মহড়া বাড়ছে। প্রথমত, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় থানা থেকে পুলিশের লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। দ্বিতীয়ত, নতুন নতুন সন্ত্রাসী গ্রুপের আবির্ভাব ঘটছে, যারা আধিপত্য বজায় রাখতে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করছে। তৃতীয়ত, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মনোবলের ঘাটতি ও তদারকির অভাব।

সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রকাশ্যে গুলির ঘটনায় সাধারণ মানুষ চরমভাবে আতঙ্কিত হয়। কোনো একটি অশুভ শক্তি এই আতঙ্ক ছড়িয়ে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে বানচালের চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা যায়। তারা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে ফ্যাসিস্টদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দাদের খুঁজে বের করতে হবে যে হত্যাকাণ্ডের পেছনের সুবিধাভোগী কারা। আসল জায়গা চিহ্নিত করতে না পারলে কেবল ছোটখাটো ধরপাকড় দিয়ে এই সমস্যা মিটবে না। পুলিশকে প্যাট্রলিং বা টহল বাড়াতে হবে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুপারভিশন বা নজরদারি আরো কঠোর করতে হবে।’

বিভিন্ন সূত্র বলছে, বর্তমানে ব্ল্যাক মার্কেটে অস্ত্র পাওয়া অত্যন্ত সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমান্ত দিয়ে সুকৌশলে অত্যাধুনিক ছোট অস্ত্র বা ‘স্মল আর্মস’ দেশে ঢুকছে। এক-দেড় লাখ টাকার মধ্যেই বিদেশি নাইন এমএম বা সেভেন পয়েন্ট সিক্স পিস্তল পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরে বিভিন্ন কামারশালায় তৈরি হচ্ছে দেশীয় ওয়ান শ্যুটার গান বা এলজি।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল খালেক আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে ছিনতাইকারীর ভয়ে থাকতাম, এখন দেখছি রাস্তা দিয়ে হাঁটতেও ভয়। কখন কার মাথায় গুলি লাগে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। দিনদুপুরে যদি রাজধানী নিরাপদ না থাকে, তবে আমরা যাব কোথায়?’

রাজনৈতিক নেতারাও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আকবর খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মুছাব্বিরকে যেভাবে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে, তাতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এর আগে শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করা হলো। যদি প্রথম ঘটনার খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতো, তবে পরের হত্যাকাণ্ড হয়তো ঘটত না। নির্বাচনের আগে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন নাজুক থাকলে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে সাহস পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, অপরাধীদের দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা নিয়মিত অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছি এবং বেশ কিছু ঘটনার মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করেছি। পুলিশের মনোবল ফেরাতে এবং মাঠ পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে।’ তবে পুলিশের এই আশ্বাসে সাধারণ মানুষের মন ভরছে না। কারণ আজ একজন ধরা পড়লে কাল অন্যজন অস্ত্র হাতে রাস্তায় নামছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি উত্তরণে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দেশব্যাপী চিরুনি অভিযান চালাতে হবে। সীমান্ত এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অস্ত্র চোরাচালান বন্ধ করতে হবে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়া এবং তাদের স্থানীয় এজেন্টদের সমূলে উৎপাটন করতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এসব হত্যাকাণ্ডের সাজা নিশ্চিত করতে হবে।