আসন্ন ‘গণভোটে’ যদি ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী না হয় এবং ‘না’ জয়যুক্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশে আবারও ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন ঘটবে এবং তা কেউ ঠেকাতে পারবে না। ফ্যাসিবাদের পুনরাগমন ঠেকানোর লক্ষ্যেই মূলত এই গণভোটের আয়োজন। বুধবার (৭ জানুয়ারি) সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘গণভোট ২০২৬ কী ও কেন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এমন বক্তব্যের বিপরীতে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন—এটা পূর্বশর্ত হলেও একমাত্র শর্ত না। ‘ফ্যাসিবাদ’ আচরণের মধ্য দিয়ে ফিরে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সাবেক ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, ‘‘হ্যাঁ বা না ভোট দিয়ে ফ্যাসিবাদের ফিরে আসা বা ফ্যাসিবাদকে রুখে দেওয়া সম্ভব না। ফ্যাসিবাদ তৈরি হয় আচরণের ভেতর থেকে। সরকার জনবিচ্ছিন্ন হলে, প্রতিষ্ঠানকে সেভাবে তৈরি করা না গেলে, ফ্যাসিবাদ তৈরি হয়। আমি ফিলসোফিক্যালি গণভোট সমর্থন করি না। যে পদ্ধতিতে সংবিধান পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে সেটা ঠিক না, এটা অবৈধ। সরকার কখনও গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে না। জনগণ কী করবে, সেটা সরকার বলে দিতে পারে না। সেটা পক্ষপাতমূলক হওয়ার শঙ্কা থাকে। কোনও একটা পক্ষ নিলে সরকার তার পুরো শক্তিকে কাজে লাগিয়ে চূড়ান্ত ফলাফল ম্যানুপুলেট করারও ক্ষমতা রাখে। আমার ধারণা, ফ্যাসিস্ট বলতে আওয়ামী লীগকে চিহ্নিত করেই কাজটি করা হচ্ছে।’’
উল্লেখ্য, জুলাই জাতীয় সনদ প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এতে সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে সরকারি দলের ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন বন্ধ করা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ গঠন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য সৃষ্টি, অপরাধীদের রাষ্ট্রপতি ইচ্ছামতো ক্ষমা করতে পারবেন না—এরকম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে। জুলাই সনদে বিএনপি সই করেছে। যদিও বিএনপি ৯টি প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত দিয়েছে।
বুধবার গণভোট নিয়ে এক গোলটেবিল অনুষ্ঠানের শুরুতে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার গণভোটের বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত করেন এবং হ্যাঁ ভোট দিলে দেশবাসীর সুবিধাগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’তে ভোট না দিলে দেশ ভবিষ্যতে আবারও ফ্যাসিবাদীদের হাতে চলে যাবে। এ জন্য প্রথমে পরিবার থেকে গণভোটের সুবিধা বোঝাতে হবে। তারপর বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদেরও বোঝাতে হবে।
এদিকে বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুমে কৃষি বিভাগের ১৭ হাজার কর্মকর্তা ও মাঠকর্মীকে গণভোট বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে একটি সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “বাংলাদেশ যাতে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় আর ফিরে না যায়, সে জন্যই এবারের গণভোট। গণভোটের এই সুযোগ আগামী ৫ কিংবা ১০ বছরে আর আসবে না। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কীভাবে চলবে, তা ঠিক করে দেওয়ার এই সুযোগকে কাজে লাগাতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’’
‘ফ্যাসিজমের মধ্য দিয়ে পূর্ববর্তী সব সরকার গিয়েছে’’ উল্লেখ করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘‘হ্যাঁ ভোটে যদি না জেতে তাহলে ফ্যাসিবাদ ফিরবে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেছেন নির্বাচনের মাধ্যমে, জোর করে ক্ষমতা দখল করেননি। তার আগে খালেদা সরকারও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, দুজনেই প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় সরকারপ্রধান ও দলীয়-প্রধান হিসেবে দেখেছেন। তাদের সময় রাষ্ট্রপতির কোনও আলাদা করে ক্ষমতা দেখা যায়নি, কারণ কাঠামোতে ছিল না। খালেদার পথ ধরে একইভাবে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলেও তিনি আমৃত্যু প্রধানমন্ত্রী থাকতে চেয়েছেন এবং পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে চেয়েছেন। নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়ন করেছেন, পঞ্চদশ সংশোধন করেছেন। এটা অনেকটা ক্যানসারের মতো, আক্রান্ত হওয়ার পরে নির্মূল না করলে ছড়িয়ে পড়বে। পুরোনো পথে হেঁটে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা যাবে না।’’
তিনি বলেন, ‘‘কাঠামো বদলাতে হবে, সংস্কারের বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, মৌলিক কাঠামোগত সংস্কারের দরকার আছে। না ভোট জিতলে এই জরুরি সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলো সম্ভব হবে না, পুরোনো প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। তবে এসব বদলালেই যে সব ঠিক হয়ে যাবে, তাও মনে করছি না। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিশাল পরিবর্তন ঘটে গেছে। কাঠামোর চরম অবক্ষয় এবং কারোর মধ্যে সহনশীলতা নেই। ফলে গণভোট এই পরিস্থিতি থেকে উতরানোর একটা চেষ্টা হিসেবে দেখছি।’’
হ্যাঁ ভোটের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিজমকে বিলুপ্ত করা যাবে কিনা প্রশ্নে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এটা পূর্বশর্ত, আবশ্যক ও অপরিহার্য। কিন্তু যথেষ্ট নয়। মূল জিনিস হলো চর্চা। গণভোট হলো, এর মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন হলো, কিন্তু সেটা যদি চর্চায় আনা না যায়, তাহলে পরিবর্তন আসবে না। আমাদের দেশে এর আগেও সংবিধান সংশোধন হয়েছে, সেটা লঙ্ঘিতও হয়েছে বারবার। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ধরনের আইন আছে। আবার আইনের সবচেয়ে বেশি ব্যত্যয়ও এখানে দেখা যায়। ফলে জুলাই আন্দোলন, জুলাই সনদের চেতনা থেকে যদি শিক্ষা গ্রহণ করে, তবেই সম্ভব।’