Image description

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তীত বাংলাদেশে প্রায় অর্ধযুগ পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গেল বছরের ৯ সেপ্টেম্বর। এই নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয় পায় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিগত ২০-২৫ বছরের প্রকাশ্য ছাত্র রাজনীতিতে শিবিরের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। পাশাপাশি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে একেবারেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। তবে সেই সংকট কাটিয়ে জুলাই পরবর্তী সময়ে ডাকসুতে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে নতুন করে আলোচনায় আসে শিবির।

ডাকসুর পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ভুমিধস বিজয় আসে শিবিরের। এই বিজয় নিয়ে সভা-সমাবেশ, সেমিনার ও রাজনৈতিক মাঠে একেরপর এক বক্তব্য দিতে থাকেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। এমনকি নির্বাচনী প্রচারণার বড় অংশজুড়ে জায়গা করে নিয়েছে এসব জয়ের উদাহরণ। পরে চট্রগ্রাম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদেও জয়ের ধারা অব্যাহত রাখে শিবির। তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিবিরের কাজকে ভালোবেসে তাদের হাতেই দায়িত্ব দিয়েছে বলে বক্তব্য দেন জামায়াত নেতারা। এমনকি ঘরোয়া সভাসমাবেশেও এই জয়ের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনেও পড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন জামায়াত নেতেরা।

চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদে হেরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনকে বেশ গুরুত্বসহকারে নেয় দেশের অন্যতম বড় ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ক্যাম্পাসের সব আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি কে এম রাকিবকে সংগঠনটির সমর্থিত প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ক্যাম্পাসে রাকিবের জনপ্রিয়তা ছিল অসাধারণ। তাকে নিয়ে নিজেদের প্যানেলকে জেতাতে কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতারা সম্পৃক্ত হন নির্বাচনী কর্মযজ্ঞে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর এই নির্বাচন হয়ে উঠে ছাত্রদলের ইমেজ রক্ষার অভিযান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর রাকিবকে ৮৭০ ভোটে হারিয়ে ভিপি নিজেদের করে নেয় শিবির। একইসঙ্গে ডাকসুর পর প্রথম জকসুতে শীর্ষ তিন পদেই জয়লাভ করে শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা। এছাড়া শিক্ষার্থী সংসদের ২১টি পদের মধ্যে ১৬টিতেই জয় পেয়েছেন এই প্যানেলের প্রার্থীরা।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। সে হিসেবে নির্বাচনের বাকি মাত্র এক মাস। এখন নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াত পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়কে সামনে আনছে উদাহরণ হিসেবে। দলটির নেতারা বলছেন তরুণ প্রজন্ম এখন ছাত্রশিবিরের কার্যক্রমে আগ্রহী হচ্ছেন। তারা ডাকসুর নেতৃত্ব ও সুন্দর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার কাজ দেখে শিবিরের উপর আস্থা রাখছে, যা অন্যান্য ক্যাম্পাসের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীরা আমলে নিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক না। ছাত্রসংসদের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়বে না। বিষয়টি নিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই - সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, যুগ্ম মহাসচিব, বিএনপি।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এবং দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিবিরের কার্যক্রম দেখে শিক্ষার্থীরা ভরসা পেয়েছে। জুলাই আন্দোলনে আমাদের অবদান ও ভূমিকা তারা সরাসরি দেখেছে। তরুণদের প্রত্যাশা অনেক, আমরা আশা করি পাঁচটা বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে তরুণ প্রজন্ম যেভাবে ছাত্রশিবিরকে জয়যুক্ত করেছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনেও তারা এসব বিষয়গুলোকে দেখেই জামায়াতসহ জোটের প্রার্থীদের নিজেদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করবে।

এই জামায়াত নেতা বলেন, দেশের প্রায় চার কোটি ভোটার তরুণ, যা মোট ভোটারের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। জাতীয় নির্বাচনে আমরা তাদের পক্ষ থেকে সমর্থন পাবো বলেই আমরা আশা করছি। আমরা তরুণদের জন্য অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা প্রকাশ করেছি এবং এগুলো তরুণদের জন্য বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় খুবই প্রয়োজন। তরুণরা এগুলোকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে গ্রহণ করছে, যা নির্বাচনী প্রতিপক্ষের সঙ্গে আমাদের ব্যবধান বাড়িয়ে দেবে এবং জয়ের পথ সহজ করবে।

তবে পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়বে না বলে মনে করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ-১ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক না। ছাত্রসংসদের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়বে না। বিষয়টি নিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। 

বিএনপির এই নেতা বলেন, তরুণ প্রজন্মের জন্য আমাদের আলাদা নীতি আছে, তাদেরকে আমরা সংযুক্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছি। অনেকে সংযুক্ত হয়েছেন, অনেকে যুক্ত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি আর জাতীয় রাজনীতি এক না। এই তরুণেরাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করছিলো, তারাই এনসিপি করতেছে। আমরাও জনগণের কাছে যাচ্ছি, ভালো সাড়াও পাচ্ছি।

 

তবে শুধু জাতীয় নির্বাচন নয় আগামীর বাংলাদেশ নতুন ধারণার উপরে পরিচালিত হবে বলে মনে করেন জামায়াতের তরুণ এমপি প্রার্থী নূর মোহাম্মাদ আবু তাহের। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, ছাত্রসংসদগুলো তো আর বাংলাদেশের সীমানার বাইরের কোন ইনস্টিটিউট নয়। ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোতে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ হয়েছে। সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব বদলে গেছে, রাজনৈতিক পরিবেশ ও সমীকরণ পাল্টে গেছে। এই মুহূর্তে পুরানো ধ্যান ধারণার পরাজয় হয়েছে। এখন যারাই নির্বাচনে জিততে চাইবে, তাদের গুণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হবে, অবশ্যই তরুণ প্রজন্মের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাপিয়ারেন্স, এক্সপেক্টেশন উপলব্ধি করতে হবে এবং নতুন ধারার রাজনীতি তাদের সামনে হাজির করতে হবে। ছাত্রসংসদ নির্বাচনে এটি প্রমাণিত হয়েছে এবং শুধু জাতীয় নির্বাচন নয় আগামীর বাংলাদেশ এই নতুন ধারণার উপরে পরিচালিত হবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে তরুণ প্রজন্ম জামায়াত ও এনসিপি ভোটের সংখ্যা বাড়লেও ফলাফলের উপর তেমন প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ভোট স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়েছিটিয়ে যাবে। জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী বা এনসিপির ভোটের সংখ্যা বাড়বে এটা সত্য, কিন্তু এই ভোটের মাধ্যমে ফলাফল নির্ধারণ হবে এমনটা বলা যায় না।  জাতীয় নির্বাচনের ভোট অনেককিছুর ওপর নির্ভর করে, স্থানীয়ভাবে একটা আসনে শুধু শিক্ষার্থী না, এখানে বয়স্ক মানুষ আছে, বিভিন্ন পেশার মানুষ আছে, শিক্ষিত বা অক্ষর জ্ঞান নেই এমন মানুষও আছে। সব মিলিয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ভোট স্থানীয় পর্যায়ে বা আসনভিত্তিক প্রভাব পড়বে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে শিবির জিতে গেছে, সংসদীয় আসনে এমনটা নাও ঘটতে পারে। কিন্তু ভোট বাড়বে এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।

শিবিরের কার্যক্রম দেখে শিক্ষার্থীরা ভরসা পেয়েছে। জুলাই আন্দোলনে আমাদের অবদান ও ভূমিকা তারা সরাসরি দেখেছে। তরুণদের প্রত্যাশা অনেক, আমরা আশা করি পাঁচটা বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে তরুণ প্রজন্ম যেভাবে ছাত্রশিবিরকে জয়যুক্ত করেছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনেও তারা এসব বিষয়গুলোকে দেখেই জামায়াত প্রার্থীদের নিজেদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করবে- এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, জামায়াতে ইসলামী।

এনসিপি ও জামায়াত জোটে ভোট করায়, তরুণদের ভোট এই জোটে বেশি যেতে পারে মন্তব্য করে এই অধ্যাপক বলেন, তরুণ প্রজন্ম নিয়ে বিএনপির একটা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এমনকি ভোটে জিতে সরকার গঠন করলেও এই তরুণ প্রজন্মকে মোকাবিলা করতে হবে। কোন ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা জুলাইয়ের ব্যাপারে যে স্পিরিট, সে বিষয়গুলোতে এক ধরনের ঐক্যমত আছে। তরুণ প্রজন্মের আশা, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে, রাজনৈতিকভাবে কেউ স্বৈরাচার হতে পারবে না। মানে সবাইকেই সবাইকে নিয়ে চলতে হবে। এই চাওয়ার বাইরে গেলে এই তরুণ প্রজন্ম কিন্তু আবারো নামবে, আর এই চাপটা সবসময় থাকবে। 

তরুণ প্রজন্মের ভোটে এগিয়ে গেলে উচ্চকক্ষে জামায়াত সবচেয়ে বড় সুবিধা পাবে বলেও মনে করেন মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ভোটের সংখ্যা বাড়লে শতাংশের হারও বাড়বে। সেক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ গঠন হলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে জামায়াত। কেননা এনসিপির সঙ্গে সমঝোতার ফলে জামায়াতের পাল্লায় ভোট দিতে পারেন তরুণ ভোটাররা  

নূর মোহাম্মদ আবু তাহের মনে করেন, আগামী ২০-৩০ বছর দেশের রাজনীতি তরুণ প্রজন্মের নতুন ভাষার আলোকে পরিচালিত হবে। ৩৫ শতাংশ ভোটার এই জেনারেশনের, তাদের ভাষা, আকাঙ্ক্ষাগুলো বুঝা, সংকটগুলো সমাধান করার চেষ্টা আমরা করছি। তাদের কাছে সম্ভাব্য সব উপায় উপকরণ ব্যবহার করে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমরা আশা করছি এই জেনারেশনের ভোটগুলো আমরা পাবো।

পাঁচটি সংসদ নির্বাচনের পরে বিএনপির আত্মপর্যালোচনায় তাদের ভুলগুলো অবশ্যই নিয়ে আসবে বলে মনে করেন তরুণ এই নেতা। তিনি বলেন, বিএনপি বাংলাদেশের বড় একটা স্টেকহোল্ডার দেশের স্বার্থে তাদের সংশোধনটা প্রয়োজন এবং তারা করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। তবে বিএনপিকে তাদের নীতি ও কৌশলে পরিবর্তন আনতে হবে, নাহলে সংসদ নির্বাচনে তাদের মূল্য দিতে হবে। বাংলাদেশের স্বার্থে বিএনপি এক নতুন ধারা রাজনীতিকে সামনে আনবে বলেও আশা নূর মোহাম্মদের।