চট্টগ্রামের এক চোরাচালান মামলায় বিদেশে বসে নিয়মিত ‘সশরীরে’ হাজিরা দিচ্ছিলেন আসামি সাইফুল ইসলাম সানি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে কালবেলায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, “বিদেশে বসে আদালতে ‘সশরীরে’ হাজিরা দেন আসামি—আদালতপাড়ায় চাঞ্চল্য।” এরপর মামলাটি আদালতপাড়া থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন মহলে আলোচিত হতে থাকে। প্রশ্ন উঠেছিল—কীভাবে বিদেশে থাকা সত্ত্বেও সানি নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন এবং কে আসলে হাজির হচ্ছেন আদালতে?
বুধবার (৭ জানুয়ারি) সেই প্রশ্নের এক জোরালো উত্তর মিলল। চট্টগ্রামের চতুর্থ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তফার আদালত সানিকে সশরীরে পাসপোর্টসহ হাজির থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। দীর্ঘ ৪ মাসের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সানি উপস্থিত ছিলেন না এবং তার পক্ষে কোনো আইনজীবীও হাজির হয়নি। এই অবস্থায় আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার পরোয়ানা জারি করেছে।
এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শাহজাহান কালবেলাকে বলেন, ‘সানি বিদেশে থাকা সত্ত্বেও আদালতে হাজির দেখানো হচ্ছে। আদালত তাকে ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি পাসপোর্টসহ হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আজ নির্ধারিত সময়ে আসামি বা তার আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। ফলে আদালত তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করেছেন।’
চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা আদালতের এডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর মাসুদুল হক কালবেলাকে জানান, বিদেশে বসে আসামি ভুয়া হাজিরা দিচ্ছিল। কালবেলায় সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি আরও আলোচিত হয়েছে। আজ তাকে সশরীরে হাজির হতে বলা হয়েছিল, কিন্তু সে উপস্থিত ছিল না। তাই আদালত তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করেছেন। সম্ভবত আসামিপক্ষের আইনজীবীকে শোকজ করা হয়েছে।
এদিকে অবিশ্বাস্য হলেও নথি স্পষ্ট করছে, সানি দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের রিয়াদে একটি প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। পাসপোর্ট ও ভ্রমণ সংক্রান্ত নথি প্রমাণ করছে, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে তিনি দেশে ছিলেন না। তবু চট্টগ্রাম আদালতের রেকর্ডে দেখা যাচ্ছে, চোরাই পণ্য কেনাবেচার মামলায় সানি নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, আসলে সানির ছোট ভাই তাহসান ইসলাম সোহাম আসলে আদালতে গিয়ে বড় ভাইয়ের ছদ্মবেশে হাজির হচ্ছেন। সোহামের ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথাও জানা গেছে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের পাথরঘাটার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম সানির (২২)। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন পাসপোর্ট হাতে পান এবং ওই বছরের আগস্টে চট্টগ্রাম থেকে ওমান হয়ে সৌদি আরব যান। নথি বলছে, রিয়াদের এক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। তার নামে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের এজাহারে বলা হয়, সানি ও নকিব মোস্তফা চোরাই মালপত্র কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত। তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের মে মাসে অভিযোগপত্র জমা পড়ে। আদালত অভিযোগ গঠন করে ধারা ৪১১-এর অধীনে বিচার শুরু করেন, যা সর্বোচ্চ তিন বছরের সাজাযোগ্য অপরাধ।
আদালতের নথি বলছে, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন সানি। সেপ্টেম্বর, ডিসেম্বর ও চলতি বছরের একাধিক তারিখে তাকে হাজির দেখানো হয়েছে। অথচ ভ্রমণ নথি প্রমাণ করছে, তিনি তখনো সৌদি আরবেই ছিলেন। বাদীপক্ষের অভিযোগ, আসলে সানির ছোট ভাই তাহসান ইসলাম সোহাম আদালতে গিয়ে বড় ভাইয়ের ছদ্মবেশে হাজির হচ্ছেন। সোহামের ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথাও জানা গেছে। এ নিয়ে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর কালবেলায় বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
ওইদিন চট্টগ্রাম মহানগর পিপি মফিজুল হক ভূঁইয়া কালবেলাকে বলেছিলেন, ‘আসামি হাজির না হলে ওয়ারেন্ট জারি হতে পারে, এতদিনের হাজিরার বিষয়েও শোকজ হতে পারে।’
নাগরিক সংগঠন সুজনের সাধারণ সম্পাদক আকতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘তদন্ত করে সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।’ অন্যদিকে মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের মহাসচিব জিয়া হাবিব আহসান বলেন, ‘আদালতের প্রতারণা রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যপক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এটি ন্যায়বিচারের অন্তরায়, দায়ীদের শনাক্ত করে শাস্তি দেওয়া দরকার। এমন অনিয়ম আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করে।’