দক্ষিণাঞ্চলের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ’। এটি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকায় ভাড়া ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। তবে, প্রতিষ্ঠার প্রায় ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ে একবারও সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়নি।
এর মধ্যেই চলতি জানুয়ারি সেশন থেকে গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সব ধরনের প্রোগ্রামে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে ইউজিসি। গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর কমিশনের ৫৮তম সভার সিদ্ধান্ত এবং তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কেবল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ নয়, ঢাকার বাইরের ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে— যেগুলোর প্রতিষ্ঠাকাল ২০১৮ সালের আগে— সেগুলোতে একবারও সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়নি। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নিয়মিত আসনসংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না পাওয়াই এর অন্যতম কারণ।
সমাবর্তন না হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনোটি শাহ মখদুম ম্যানেজমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৫ সালে রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠিত। আবার কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয় সরকার নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে সমাবর্তনের তারিখ চেয়ে আবেদন করলেও এখনও অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে।
এছাড়া এমন বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে, যেগুলো প্রতিষ্ঠার ২৪ বছরে মাত্র দুই থেকে তিনটি সমাবর্তন করতে পেরেছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বেতন অনিয়মিত— এমন অভিযোগ অনানুষ্ঠানিকভাবে উঠে এলেও সংশ্লিষ্ট কেউ এ বিষয়ে সরাসরি তথ্য দিতে চাননি।
এক দশকের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও সমাবর্তন আয়োজন না করা প্রসঙ্গে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সরাসরি মন্তব্য না করলেও, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বলছে, ‘সমাবর্তন হবে।’
একবারও সমাবর্তন হয়নি যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে
বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোতে অবস্থিত যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একবারও সমাবর্তন হয়নি, সেগুলো হলো– নর্থ ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় (খুলনা), নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় (সিলেট), নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (রাজশাহী), বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রাজশাহী), গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (বরিশাল), শাহ মখদুম ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটি (রাজশাহী), ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি চিটাগং, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় (খুলনা), আহছানিয়া মিশন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রাজশাহী) এবং খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়।
এর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো শাহ মখদুম ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটি রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালে। যদিও এটি ২০১৮ সালে ইউজিসির তালিকাভুক্ত হয়, তবু এখনও পর্যন্ত কোনও সমাবর্তন আয়োজন করতে পারেনি। আহছানিয়া মিশন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রাজশাহীতে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনও সমাবর্তন হয়নি।
‘সুবিধাজনক সময়ে সমাবর্তনের আয়োজন হয়’
সমাবর্তনের জন্য সময় চেয়ে আবেদন করে অনুমতির অপেক্ষার কথা জানিয়েছে কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয়। আবার কেউ কেউ বলছেন— প্রতি বছর যে সমাবর্তন আয়োজন করতে হবে, এ ধরনের কোনও নিয়ম নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের সুবিধাজনক সময়ে সমাবর্তনের আয়োজন করে থাকে। প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য বলছে, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় দুই দশকে দুটি, সর্বোচ্চ তিনটি সমাবর্তন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি।
প্রতিষ্ঠার পর মাত্র দুইবার সমাবর্তনের আয়োজন করেছে চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে অবস্থিত এই ইউনিভার্সিটি। ২০২৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির দ্বিতীয় সমাবর্তন। এ প্রসঙ্গে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের রেজিস্ট্রার ড. এস এম শোয়েব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে দুইটি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতি বছর যে সমাবর্তন আয়োজন করতে হবে এ ধরনের কোনও নিয়ম নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের সুবিধাজনক সময়ে সমাবর্তনের আয়োজন করে থাকে। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকেও এ ধরনের নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়নি।’’
চট্টগ্রামে ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি চিটাগং ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও তারা একবারও সমাবর্তন করতে পারেনি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা অভিমান ঘোষ দস্তিদার বলেন, ‘‘আমাদের প্রতিষ্ঠানটি নতুন হিসেবে ভালো শিক্ষার্থী পাচ্ছে। এ বছর এইচএসসিতে পাসের হার কম বলে শিক্ষার্থী পাওয়া নিয়ে আমরা চিন্তিত।’’
একবারও সমাবর্তন কেন করা গেলো না জানতে চাইলে উপাচার্য ড. মো. জাহিদ হোসাইন বলেন, ‘‘আমাদের আড়াই হাজার শিক্ষার্থী আছে, শিক্ষক ৮০ জনের বেশি। একবারও সমাবর্তন হয়নি ঠিকই— আমরা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে চিঠি দিয়েছি। তারা যখন তারিখ নির্ধারণ করে দেবে, সে অনুযায়ী সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হবে।’’
এদিকে, চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের মাত্র তিনটি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অপরদিকে, ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ১৯১ জন শিক্ষক ও চার হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে পরিচালিত হলেও মাত্র দুটি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্বিবদ্যালয় ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরে দুইটি সমাবর্তন হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে তিনটি অনুষদে দুই হাজার শিক্ষার্থী আছে।’’
বরিশালের ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা মেহেদী হাসান শুভ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বরিশাল নগরীর সিঅ্যান্ডবি রোড এলাকায় তিনটি ভাড়া ভবনে কার্যক্রম চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসন, প্রকৌশল, মানবিক ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞান অনুষদে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করে।’’
প্রতিষ্ঠার পর থেকে কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয় এবারও সমাবর্তন করতে পারেনি কেন, জানতে চাইলে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কিছু বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যাদের সমাবর্তন হয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমাবর্তন করার জন্য আবেদন জানিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের আবেদন পাঠানো হয়েছে ইউজিসিতে। বর্তমান সরকারের সময় উদ্যোগ নিয়ে বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন সম্পন্ন করা হয়েছে। কম সময়ের মধ্যে বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তন আয়োজনের ব্যবস্থা করা হবে। ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তনের সব তথ্য ইউজিসির ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে। যাতে কারও তথ্য জানতে সমস্যা না হয়।’’
দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আসন সংখ্যা অনুযায়ী শিক্ষার্থী পায় কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ন্যূনতম শিক্ষার্থী না থাকলে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিবিড়ভাবে দেখভাল করা হচ্ছে।’’
সমাবর্তন কেন গুরুত্বপূর্ণ
গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠান অনেকের জীবনে এক আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। কারও জন্য এটি দীর্ঘ পথচলার পর অর্জিত সাফল্যের স্বীকৃতি— যেখানে অ্যাকাডেমিক, ব্যক্তিগত কিংবা আর্থিক নানা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করার গল্প জড়িয়ে থাকে। এই অর্জন শুধু শিক্ষার্থীর একার নয়। পরিবার ও প্রিয়জনদের কাছেও গ্র্যাজুয়েশন মানে গর্ব ও আনন্দের উপলক্ষ। প্রিয় মানুষের পরিশ্রম, ত্যাগ ও নিরন্তর সমর্থনের ফল হিসেবেই এই সাফল্য উদযাপিত হয়। তাই গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানটি ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি সবার সম্মিলিত আনন্দের প্রতিফলন। ভবিষ্যতের দিগন্তে দাঁড়িয়ে এই অনুষ্ঠান আশা ও সম্ভাবনার বার্তা বহন করে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. ম আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কনভোকেশন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ম্যান্ডেটরি। মূল সনদ পেতে হলে রাষ্ট্রপতি আচার্যের অনুমতি প্রয়োজন। এটি অলংকারিক নয়।’’
প্রতিবেদনটি তৈরি করতে সহযোগিতা করেছেন বাংলা ট্রিবিউনের সিলেট, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের প্রতিনিধিরা