৮০ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের কারণে বিপাকে পড়েছে জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন সহ সমমনা ১১ দলীয় জোট। বিলম্বিত হচ্ছে এই জোটের আসন সমঝোতা। আছে নানা গুঞ্জনও। তবে জোট নেতারা জানিয়েছেন, টানাপড়েন থাকলেও আসন সমঝোতা ঠিকমতো এগোচ্ছে। দুই/একদিনের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। গতরাতে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে আসন চূড়ান্ত হওয়ার কথা।
নেতারা দাবি করেছেন, জোটে কোনো সমস্যা নেই। জটিলতা আছে এটা কাটানোর চেষ্টা হচ্ছে। এই জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমাদ সকল গুঞ্জন ও অনিশ্চয়তাকে নাকচ করে বলেন, প্রাথমিক অবস্থায় কিছু সমস্যা ছিল। এখন সকল অনিশ্চয়তা ও টানাপড়েন কেটে গেছে। ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনের ব্যাপারে সবাই একমত। নির্বাচনের এই আগ মুহূর্তে ঐক্যের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই কারও।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আসন সমঝোতার শুরুতেই চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে ১৮৩ আসনে সমঝোতা হয়েছিল জামায়াতের। এতে ইসলামী আন্দোলনকে ৩১টি আসন ছেড়ে দিতে রাজি ছিল জামায়াত। নিজের জন্য দলটি ১৫২ আসন রেখেছিল। অবশিষ্ট ৫২ আসন জরিপের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে বণ্টনে একমত হয়েছিল জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলন। তখন দুই দলই একমত হয়েছিল, যেখানে যে দলের অবস্থান ভালো, সেখানে ওই দলের প্রার্থীকে প্রাধান্য দেয়া হবে।
পরবর্তীতে জামায়াত ১৯০ আসনে নির্বাচনের পরিকল্পনা নিলে ইসলামী আন্দোলনকে সর্বোচ্চ ৪৫ এবং এনসিপিসহ বাকি ৯টি দলকে ৬৫টি আসন ছাড়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়। তবে যাচাই বাছাইয়ে সমমনা দলগুলোর প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিলে সব পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যায়। যেমন কুড়িগ্রাম-৩, যশোর-২, ঢাকা-২ এবং কক্সবাজার-২ এর মতো আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা ১১ দলের একক প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এই চারটি আসনেই জামায়াত প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
২৭২ আসনে প্রার্থী দেয়া ইসলামী আন্দোলনের ৪৬টি আসনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে গ্রহণ করা হয়নি। ৪৪ আসনে প্রার্থী দেয়া এনসিপি’র তিনটি আসনে মনোনয়নপত্র অবৈধ হয়েছে বাছাইয়ে। ৯৬ আসনে প্রার্থী দেয়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ২১টি আসনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে টেকেনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে যে ১৩টি আসন ছাড়তে সম্মত হয়েছিল জামায়াত; এর একটি মুন্সীগঞ্জ-৩। খেলাফতের প্রার্থী নুর হোসাইন নুরানীর সমর্থনে এই আসনে জামায়াত প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেননি। বাছাইয়ে নুরানী বাদ পড়েছেন। এই আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী সমঝোতার শরিক ইসলামী আন্দোলন এবং খেলাফত মজলিসের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে গৃহীত হয়েছে। আপিলে নুর হোসাইন প্রার্থিতা ফেরত না পেলে কোন দল এ আসন থেকে নির্বাচন করবে, তা নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনকে প্রথম দফায় যে ৩১ আসন ছাড়তে সম্মত হয়েছিল জামায়াত, এর একটি ভোলা-৪। সেখানে হাতপাখার প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়নি। এনসিপিকে ছেড়ে দেয়া সিলেট-১ আসনে দলটির প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। আবার জাগপাকে একটি আসন ছাড়ার সিদ্ধান্ত হলেও দলটির প্রার্থীর মনোনয়নপত্র অবৈধ হয়েছে।
১১ দলীয় সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ খেলাফত অন্তত ২৫ আসন চেয়েছে। গত ২৮শে ডিসেম্বর এনসিপি, এলডিপি এবং এবি পার্টি জোটে যোগ দেয়ায় নতুন শরিকদের জন্য নিজের ভাগ থেকে তিনটি আসন ছাড়তে রাজি হয় মওলানা মামুনুল হকের দল। জামায়াত দলটিকে ১৩টির বেশি আসন ছাড়তে রাজি হয়নি। নতুন আলোচনায় দলটি বলছে, ছেড়ে দেয়া আসনের কোনোটিতে যদি আপিলে দলীয় প্রার্থিতার মনোনয়নপত্র বৈধ হয়, তাহলে অন্য আসন দিতে হবে। দলটি এমন আসন চাচ্ছে, যা আগের আলোচনায় জামায়াতের ভাগে পড়েছিল বলে জানা যায়।
এদিকে আপিলে দলীয় প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ না হলে জামায়াত নিজের ভাগের ঢাকা-২ আসন ইসলামী আন্দোলনকে ছাড়তে চায়। এর বিনিময়ে ইসলামী আন্দোলনকে আগে ছেড়ে দেয়া আসন থেকে একটি কমাতে চায়। এতে রাজি নয় চরমোনাই পীরের দল।
মনোনয়নপত্র বাতিলে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে স্বীকার করে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব ইউনুস আহমেদ বলেন, দলীয় প্রার্থীদের কোথায় কার প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, তা দেখতে হচ্ছে। এ কারণে আসন সমঝোতায় বিলম্ব হচ্ছে। যদিও আপিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে, কিন্তু প্রার্থীরা মাঠে আছেন। তাই সমঝোতায় বিলম্ব হলেও নির্বাচনে অসুবিধা হবে না।
প্রশাসনের ভেতরে এখনো ফ্যাসিবাদী সরকারের দোসররা সক্রিয়, এমনকি তাদের প্রভাবে প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
কক্সবাজার-২ আসনে (মহেশখালী ও কুতুবদিয়া) জামায়াতের প্রার্থী হামিদুর রহমান আযাদ শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমার হলফনামায় ঋণখেলাপি, ট্যাক্স ফাঁকি বা রাষ্ট্রীয় কোনো আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নেই। তারপরও ২০১৩ সালের আদালত অবমাননার একটি মামলাকে সামনে এনে মনোনয়ন বাতিল করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বৈষম্যমূলক।
তিনি আইনি ব্যাখ্যায় বলেন, যে মামলাটি দেখিয়ে প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে, তা ফৌজদারি অপরাধ নয়। এটি ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে একটি বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে করা আদালত অবমাননার মামলা, যা কোনো ক্রিমিনাল কেসের সংজ্ঞায় পড়ে না।
দলীয় প্রার্থীদের মনোয়নপত্র বাতিলের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ। সোমবার দলের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অভিমত প্রকাশ করা হয় যে, দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি। প্রশাসনের মধ্যে কিছু সরকারি কর্মকর্তা একটি বিশেষ দলের পক্ষে কাজ করছে বলে অভিযোগ আসছে। অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে ইসলামী আন্দোলনের তরফেও।