Image description

গত ১লা জানুয়ারি থেকে চালু হয়েছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্ট্রার তথা এনইআইআর প্রকল্প। ব্যক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত, অবৈধ হ্যান্ডসেট রোধ, চুরি হওয়া ফোন বন্ধ এবং মোবাইল বাজারের বিশৃঙ্খলা দূর করতে চালু করা হয় এই প্রকল্প। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসি এই সিস্টেমের মধ্যদিয়ে নির্দিষ্ট সময় পর দেশের নেটওয়ার্কে আর কোনো অবৈধ, চোরাই ও ক্লোন মোবাইল ফোন চলতে পারবে না। এই সিস্টেমকে স্বাগত জানিয়েছে সবাই। তবে এই ব্যবস্থা চালুর পর অনেকেরই জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে শত শত মোবাইল ফোন রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি সামনে এসেছে। যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। মোবাইল ফোন হস্তান্তরেও ভোগান্তির কথা বলছেন কেউ কেউ।

রাহি রাফসান নামে এক ট্রাভেল ব্যবসায়ী বলেন, এনইআইআর সিস্টেম চালুর পর কৌতূহলবশত আমি ওয়েবসাইটে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করি। কিন্তু সেখানে যেই তথ্য পাই তা দেখে আমি হতবাক হয়ে যাই। আমি দেখি- আমার জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে এটা-দুইটা নয় মোট ৭৩৮টি মোবাইল ফোন রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। যার বেশির ভাগই গত ডিসেম্বরে রেজিস্টার্ড করা। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই ৭৩৮টি মোবাইল ফোনের মধ্যে আমার ব্যবহৃত ফোনটি নেই। কিন্তু আমার ফোনের আইএমইআই নম্বর দিয়ে সার্চ করলে আবার রেজিস্টার্ড ও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে দেখাচ্ছে। তাহলে আমার ফোনটি অবশ্যই অন্য কারোর নামে রেজিস্ট্রি হয়েছে। 

তিনি বলেন, এই এনইআইআর ব্যবস্থাটা মূলত আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্যই সরকার চালু করেছে। যেন কেউ ফোন দিয়ে কোনো অপরাধ করতে না পারে। কিন্তু যদি আমার নামে এতোগুলো ফোন রেজিস্ট্রি হয়ে থাকে, যার একটি ফোনের সম্পর্কেও আমার ধারণা নেই, তাহলে কে কোথায় ওই ফোন দিয়ে অপরাধ করবে আর সেই দোষে কি আমি শাস্তি পাবো? মুফতি সাইফুল ইসলাম নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, আমার এনআইডি দিয়ে মোট ১১৭টা ফোন রেজিস্টার্ড দেখাচ্ছে। যার একটিও আমি কোনোদিনও ব্যবহার করিনি।

সবশেষ গত ৪ বছর আগে আমি আমার ব্যবহৃত ফোনটি বসুন্ধরা থেকে কিনি। এরপর আর কোনো ফোন কিনিনি। তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব? তিনি বলেন, সরকার বলছে, আগের সব ডাটার জন্য এখন একটা এনআইডির বিপরীতে অনেকগুলো ফোন দেখাচ্ছে। কিন্তু আমি তো সারাজীবনেও এতোগুলো ফোন ব্যবহার করিনি। আমার পরিবারের সকলে মিলেও এই ১১৭টি ফোন ব্যবহার করা সম্ভব নয়। বিষয়টি জানার পর থেকেই দুশ্চিন্তাই ভুগছি। কে কোথায় আমার নামে ফোন নিয়ে অপরাধ করবে, আর আমি দোষের ভাগি হবো। এদিকে এনইআইআর সিস্টেম চালুর পর থেকে অনেকেই তার মোবাইল ফোন বিক্রি করতে পারছে না বলেও জানিয়েছেন।

মিরাজ হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, আমি গত মঙ্গলবার আমার একটি মোবাইল ফোন বিক্রি করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সিম খুলে দোকানিকে দেয়ার পর তিনি বলেন, তার (দোকানি) সিম ঢুকালে ফোনটি চলছে না। এটা না কি এই সিস্টেম চালুর জন্য। এখন আমি চাইলেও আমার ফোন বিক্রি বা আমার পরিবারের মানুষকে হস্তান্তর করতে পারবো না। শুধুমাত্র যে যেই ফোন ব্যবহার করছে তিনি ছাড়া অন্য সিম ঢুকালেই ডি-রেজিস্ট্রেশন করা লাগবে। এটা অনেক ভোগান্তির। এগুলোর সহজকরণ প্রয়োজন।

বিষয়টি নিয়ে বিটিআরসির উপ-পরিচালক মো. জাকির হোসেন খান বলেন, আমরা প্রথমে সকল মোবাইল সেটকে নিরাপত্তার আওতায় আনার চেষ্টা করছি। একটি বড়  ডেটাবেজ তৈরি করে অবৈধ সেটগুলো শনাক্ত ও বিচ্ছিন্ন করার কাজ ধাপে ধাপে চলছে। এর ফলে নতুন করে অবৈধ মোবাইল সেট নেটওয়ার্কে ঢুকতে পারবে না। একাধিক ফোন নিবন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, যদি আপনার নামে একাধিক সেট রেজিস্ট্রেশন থাকে এবং আপনার ব্যবহৃত সেটটির আইএমইআই নম্বর মিল থাকে, তাহলে বাকিগুলো ডিএক্টিভেট করতে পারেন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট হেল্পলাইনে যোগাযোগ করলে সহায়তা পাওয়া যাবে। এ ছাড়া, ব্যবহৃত সিম অন্য ফোনে ব্যবহার করলে সেটিও তালিকায় যুক্ত হতে পারে, তাই যাচাই-বাছাই করার সময় এ বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। 

বিষয়টি নিয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, আমরা অপারেটরদের কাছ থেকে প্রায় তিন বিলিয়নের বেশি ডেটা সেট পেয়েছি। অপারেটররা তাদের সিস্টেমে থাকা আগের সব ‘হিস্টোরিক ডেটা’ এই সিস্টেমে যুক্ত করেছে। কিন্তু ডেটা মাইগ্রেশনের সময় তারিখটি বর্তমান সময়ের দেখানো হয়েছে বলে অনেকের এনআইডিতে সচল সিম বা হ্যান্ডসেটের সংখ্যা অস্বাভাবিক বেশি দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, একই এনআইডির বিপরীতে এত বেশি হ্যান্ডসেট দেখানোর পেছনে অতীতে সিম ব্যবহারের নীতিমালার প্রভাব রয়েছে। এনইআইআর ম্যাপিংয়ের সময় এনআইডির বিপরীতে পুরনো সব তথ্য মেলাতে গিয়ে হ্যান্ডসেটের সংখ্যা বেশি দেখানোটা স্বাভাবিক কারিগরি প্রক্রিয়া। তবে গ্রাহকদের দুশ্চিন্তার কারণ নেই। বিটিআরসি এবং মোবাইল অপারেটররা যৌথভাবে এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। ধীরে ধীরে পুরোনো ডেটাগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে আর্কাইভ করে সিস্টেমে প্রদর্শিত এই অসংগতিগুলো ঠিক করা হবে।