পাল্টা শুল্ক নিয়ে টানাপড়েন এখনো শেষ হয়নি পুরোপুরি। এবার ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আভির্ভূত হয়েছে স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের আগাম ভিসা বন্ড প্রদানের বাধ্যবাধকতা। বলা হচ্ছে-অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনকে স্ট্রিমলাইন করতে এমন কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। অবশ্য ভিসা বন্ড তালিকায় বাংলাদেশের নাম যুক্ত হতে পারে এমন আভাস আগেই পেয়েছে ঢাকা। দায়িত্বশীল কূটনৈতিক সূত্র মানবজমিনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের তরফে তখন বলা হয়েছিল- ওই তালিকার বাইরে থাকতে হলে যেকোনো দেশকে তার নাগকিদের ওভার-স্টে বা ঘোষিত সময়সীমার চেয়ে বেশিক্ষণ অবস্থান বন্ধ করতে হবে। দুই, অনিয়মিত বা অবৈধ হয়ে পড়াদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজ দেশে ফেরাতে হবে। ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের রিপোর্ট বলছে, অভিবাসন প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসনের কড়াকড়ির বিষয়টি টের পেয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক ভূমিকা নেয়। এ পর্যন্ত প্রায় ৩ শতাধিক বাংলাদেশি যারা নানা কারণে অনিয়মিত বা অবৈধ হয়ে পড়েছেন তাদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বাংলাদেশিদের ওভার স্টেও কমে এসেছিল সরকারের সচেতনতামূলক নানামুখী তৎপরতায়। কিন্তু তারপরও বন্ড তালিকা থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি বাংলাদেশ। যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তথা দায়িত্বপ্রাপ্তদের চরমমাত্রায় হতাশ করেছে। যদিও পূর্ণাঙ্গ তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত এ নিয়ে কিছু বলতে নারাজ বাংলাদেশের ফরেন পলিসি বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত সরকারের প্রতিনিধিরা।
একটি সূত্রের দাবি, ২০২৫ সালে হোয়াইট হাউসে পরিবর্তনের পর একের পর এক ইস্যু সামনে আসছে। নতুন প্রশাসনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে দুনিয়ার অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশ চেষ্টা করে চলছে। শুল্ক নিয়ে প্রায় খাদের কিনারা থেকে বেঁচে ফিরেছে বাংলাদেশ। অবশ্য এতে অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা জয়ী হয়েছে। সূত্র মতে, সরকারের কার্যক্রম, রাজনৈতিক উত্তরণ চেষ্টা তথা কাঙ্ক্ষিত একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রস্তুতি এবং সদ্য আরোপিত ভিসা বন্ড নিয়ে আলোচনায় ওয়াশিংটন গেছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান।
বুধবার বিকালে তিনি দুবাইগামী ফ্লাইটে ঢাকা ছাড়েন। বৃহস্পতিবার থেকে তার ওয়াশিংটনের অফিসিয়াল ভিজিট শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সূত্র মতে, ভিসা বন্ডের বিষয়টি সামনে আসায় তার পূর্বনির্ধারিত সূচিতে খানিকটা সংযোজনী আনা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালিসন হুকার, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি এস. পল কাপুর এবং ওয়াশিংটন সফরে থাকা নয়াদিল্লির আমেরিকান রাষ্ট্রদূত দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বৈঠক চাওয়া হয়েছে।
মার্কিন ভিসা পেতে বাংলাদেশিদের এখন সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার বন্ড জামানত দিতে হবে: যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা বন্ড তালিকায় বাংলাদেশের নাম যুক্ত হওয়ার প্রেক্ষিতে এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে ব্যবসায়ী বা পর্যটক হিসাবে আবেদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদেরকেও মোটা অঙ্কের বাড়তি জামানত দিতে হবে। যার পরিমাণ পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার। বিবিসি’র রিপোর্ট মতে, ভিসা বন্ডের শর্তযুক্ত দেশগুলোর তালিকায় প্রথমে ছিল সাতটি দেশ। কিন্তু ৭ দিন যেতে না যেতেই সেই তালিকা প্রায় চার গুণ বাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন, যাতে আছে বাংলাদেশের নামও।
মঙ্গলবার (৬ই জানুয়ারি) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ওই তালিকা আপডেট করে। বর্তমানে এই তালিকায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের মোট ৩৮টি দেশ রয়েছে। আগামী ২১শে জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা বন্ড কার্যকর হবে। ভিসা বন্ড জমা দিয়ে যারা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাবেন, তাদের জন্য বিমানবন্দরও নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। বিমানবন্দর তিনটি হলো: বোস্টন লোগান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (বিওএস), জন এফ কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (জেএফকে) ও ওয়াশিংটন ডুলস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (আইএডি)। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের জন্য এই তিন বিমানবন্দর বরাদ্দ এখন। এর বাইরে অন্য কোনো বিমানবন্দর দিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে বা সে দেশ থেকে বের হতে পারবে না।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য মতে, কার কতো পরিমাণ বন্ড দিতে হবে, তা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা কর্মকর্তা। আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও ইন্টারভিউয়ের ওপর ভিত্তি করে এটি নির্ধারিত হবে। বিবিসি’র রিপোর্ট মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করতে যতদিনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে ভ্রমণকারী নির্ধারিত সময়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন, যদি বেশি দিন অবস্থান করেন অথবা থেকে যান, আশ্রয় বা অন্য কোনো ভিসার জন্য আবেদন করেন, তাহলে বন্ডের শর্ত লঙ্ঘন হয়েছে বলে মনে করবে যুক্তরাষ্ট্র। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্য মার্কিন অভিবাসন দপ্তরে পাঠাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র বিভাগ। স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত দেশগুলোর কোনো নাগরিক বা নাগরিকত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি বি১ ও বি২ ভিসার জন্য যোগ্য বিবেচিত হন, তাহলে তাকেও এই ভিসা বন্ড জমা দিতে হবে।
কীভাবে বন্ড জমা নেয়া হবে?
বিবিসি বাংলার রিপোর্ট মতে, কনস্যুলার কর্মকর্তা আবেদনকারীকে নির্দেশ দেয়ার পরে আবেদনকারীকে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ফরম আই-৩৫২ জমা দিতে হবে। তাদেরকে চধু.মড়া নামের যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফরমের মাধ্যমে বন্ডের শর্তে সম্মতি জানাতে হবে। এই নিয়ম সবার জন্য প্রযোজ্য। স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানায়, বন্ড জমা দিতে কোনো তৃতীয়-পক্ষের ওয়েবসাইট ব্যবহার করা যাবে না। মার্কিন সরকারের নিজস্ব সিস্টেমের বাইরে কোনো জায়গায় অর্থ পরিশোধ করলে তার জন্য মার্কিন সরকার দায়ী থাকবে না। আর কনস্যুলার কর্মকর্তার নির্দেশ ছাড়া কেউ যদি বন্ড ফি পরিশোধ করেন, তাহলে সেই অর্থও ফেরত দেয়া হবে না। কনস্যুলার কর্মকর্তা বন্ড জমা দিতে বললে তখন আবেদনকারীকে পেমেন্ট করার একটি সরাসরি লিংক পাঠানো হবে। সেই লিংকে প্রবেশ করে বন্ডের অর্থ জমা দিতে হবে। স্টেট ডিপার্টমেন্ট এও জানিয়েছে যে বন্ড জমা দেয়া মানেই ভিসা পাওয়া নিশ্চিত না। বাংলাদেশ ছাড়াও এই তালিকায় কিউবা, ভেনেজুয়েলা, কঙ্গো, আলজেরিয়া, জিবুতি, ফিজি, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, তুর্কমেনিস্তান, উগান্ডা, জাম্বিয়া, জিম্বাবুয়েসহ দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল ও ভূটানের মতো দেশ রয়েছে।