Image description

আজ ৭ জানুয়ারি। বিশ্বজুড়ে আলোচিত কিশোরী ফেলানী খাতুন হত্যার ১৫ বছর পূর্ণ হলো। কুড়িগ্রাম সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকা কিশোরী ফেলানীকে খুনের ঘটনার দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও আজও বিচার পায়নি পরিবার। বিচারের দাবিতে ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম গত ১৫ বছর ধরে ভারতের বিএসএফ কোর্ট থেকে শুরু করে হাইকোর্টে ধরনা দিয়ে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে এখন হতাশায় দিন পার করছেন। তার মনে একটাই শঙ্কা চোখের সামনে নির্মমভাবে মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে, তার বিচার কি আদৌ হবে?

জেলার নাগেশ্বরীর নাখারগঞ্জ ইউনিয়নের কলোনিটারী গ্রামের নূরুল ইসলাম ও জাহানারা দম্পতি অভাব অনটনের সংসারে সামান্য সুখের আশায় কাজের উদ্দেশ্যে ভারতে পাড়ি জমান ১৪ বছরের ছোট্ট মেয়ে ফেলানীকে নিয়ে। ভারতের বঙ্গাইগাঁও এলাকায় ইটভাটা ও বাসাবাড়িতে কাজ শুরু করেন। কিছুদিন কাজের পর বাংলাদেশে ফেলানীর বিয়ে ঠিক হলে বাবা নুরুল ইসলাম মেয়েকে নিয়ে দেশের উদ্দেশে রওয়ানা হন। ভারতের কয়েকজন দালালের সহযোগিতায় সীমান্তের কাঁটাতার পার হয় নুরুল ইসলাম।

তার মেয়ে ফেলানী পার হওয়ার সময় বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের রাইফেলের গুলিতে খুন হয় ফেলানী। নিহত ফেলানীর লাশ সাড়ে চার ঘণ্টা ঝুলে থাকে কাঁটাতারের সঙ্গে। মিডিয়ার কল্যাণে এ নির্মম দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায় সারা বিশ্ব। নাড়া দেয় বিশ্ববিবেককে।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ভোর পাঁচটার দিকে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর অনন্তপুর ও ভারতের দিনহাটা সীমান্তের খিতাবেরকুঠি এলাকার ৯৪৭ নম্বর পিলারের পাশ দিয়ে সীমান্ত পার হওয়ার সময় এ ঘটনাটি ঘটে।

এরপর ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে ‘জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস’ কোর্টে ফেলানী হত্যার বিচার শুরু হয়। তার বাবা নুরুল ইসলাম ও মামা হানিফ আলী বিএসএফের কোর্টে সাক্ষ্য দেন। কোর্ট ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর অমিয় ঘোষকে খালাস দেন। সেই রায় প্রত্যাখ্যান করে ফেলানীর বাবা পুনরায় বিচারের দাবি জানান। এরপর ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর আদালতে সাক্ষ্য দেন নুরুল ইসলাম। ২০১৫ সালের ২ জুলাই আবারও অমিয় ঘোষকে খালাস দেয় আদালত।

বিএসএফ কোর্ট অমিয়কে দুই দুইবার খালাস দেওয়ার কারণে বাবা নুরুল ইসলাম ও ভারতীয় মানবাধিকারকর্মী কিরিটি রায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করেন। বারবার সে রায়ের তারিখ পিছিয়ে যাওয়ায় আজ পর্যন্ত সে রিটের নিষ্পত্তি হয়নি।

 

ফেলানী-2

 

বাবা নুরুল ইসলাম বলেন, ফেলানী হত্যার বিচার এখনো আটকে আছে। ১৫ বছর হয়ে গেলেও এখনো বিচার পাইনি। একজন বাবা হিসেবে এটা অনেক কষ্টের। সামনে বাংলাদেশে নতুন সরকার আসতেছে। যে দলই ক্ষমতায় আসুক যেন আমার মেয়ের হত্যার বিচার আগে করে। আমার মেয়েকে নির্মমভাবে হত্যার দায়ে অমিয় ঘোষের যেন ফাঁসি হয়।

তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর আর মামলা এগুচ্ছে না। মামলা সম্পর্কে কিছু জানতে পারছি না।

জানা যায়, ছয় সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিল ফেলানী। অভাবের সংসারে নুরুল ইসলামের আরো পাঁচ ছেলে-মেয়ে রয়েছে। মেয়ে মালেকা খাতুন লালমনিরহাট আদিতমারী কলেজের অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী, ছেলে জাহান উদিন নাগেশ্বরী ডিগ্রি কলেজে পড়ালেখা করছে, মেয়ে কাজলি খাতুন এবং আরেক ছেলে আক্কাস আলী এইচএসসি পরীক্ষার্থী। আরেক ছেলে আরফান আলী বিজিবিতে প্রশিক্ষণরত।

সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়ালেখা করাতে হিমশিম খাচ্ছেন ফেলানীর বাবা । সরকারের কাছে সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে আমার দুটা ছেলে এবং দুটা মেয়ে কলেজে পড়ালেখা করছে। আমি সংসারই চালাতে পারি না, তাদের পড়ালেখার খরচ জোগাব কীভাবে। সরকারের কাছে আমার আবেদন আমার ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার ব্যবস্থা যেন করে দেয়।

মেয়ের কথা মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন,

ফেলানী শুধু আমার মেয়ে না, আমার মা। আমি আমার মায়ের হত্যার বিচার চাই। ফেলানী হত্যার বিচার হলে আর কোনো মায়ের বুক খালি হবে না। আর তা না হলে কাঁটাতারে ঝুলতেই থাকবে বাংলাদেশ। কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

তিনি বলেন, ভারতের কাঁটাতারে ঝুলে ছিল আমার মেয়ে ফেলানীর লাশ। শেখ হাসিনা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন তিনিতো বিচার করেননি, এখন যে সরকারই আসুক আমার মেয়ের হত্যার বিচার যেন হয়। আমি আজ ১৫ বছর ধরে কাঁদতেছি, আর কোনো মা যেন এভাবে না কাঁদে। এই বিচার দেখে বিএসএফ ভয়ে আর গুলি করবে না এবং আর কোনো মায়ের সন্তান মারা যাবে না।

ফেলানীর মৃত্যু শুধু কুড়িগ্রাম নয় দেশের সব সীমান্ত হত্যার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর সেই ছবি প্রশ্ন জাগায় কবে হবে এই হত্যার বিচার? দীর্ঘ এই সময়ে বদলে গেছে অনেক কিছু, কিন্তু শেষ হয়নি বাবা-মায়ের অপেক্ষা।