ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে আর বাকি মাত্র ৩৭ দিন। আসন্ন এ নির্বাচনে মোট ভোটকেন্দ্রের অর্ধেকের বেশি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে ঢাকায়। এমন পরিস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিতে ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে সারা দেশের ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৭ হাজার ৫৫৬টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা সর্বাধিক। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারা দেশে এক লাখ ৭৬ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগামী ৩৭ দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যে দেশব্যাপী জোরদার করা হয়েছে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান। একইসঙ্গে চালু রয়েছে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২। জনমনে আস্থা তৈরিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান টহল বাড়ানো হয়েছে এবং চেকপোস্টের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, রেঞ্জ ও মেট্রোপলিটন এলাকা ভাগ করে সারা দেশের ভোটকেন্দ্রগুলোকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও সাধারণ—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। বিগত নির্বাচনে সহিংসতার পরিসংখ্যান ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৭ হাজার ৩৫৯টি, অতি ঝুঁকিপূর্ণ আট হাজার ৭৪৬টি এবং ঝুঁকিপূর্ণ ১৬ হাজার ৩৫৯টি।
ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা থাকবে। ভোটগ্রহণ শুরু থেকে ফলাফল গণনা শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি কেন্দ্রে পুলিশের বিশেষ টিম অস্ত্রসহ দায়িত্ব পালন করবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে থাকবে বডি-ওর্ন ক্যামেরা। কেন্দ্র দখল, জালভোট ও সহিংসতা প্রতিরোধে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ইতোমধ্যে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) বদলি করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, ভোটার সংখ্যা, আধিপত্য বিস্তার, থানার দূরত্ব, দুর্গমতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো বিবেচনায় অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোকে রেড, ঝুঁকিপূর্ণগুলোকে ইয়েলো এবং সাধারণ কেন্দ্রগুলোকে গ্রিন মার্ক করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে এই নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ, আনসার, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে একাধিক বৈঠকে নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।
ডিএমপির দুই হাজার ১৩১টি কেন্দ্রের মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৬৯৫টি ও ঝুঁকিপূর্ণ এক হাজার ১৩৩টি। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের ৬০৭ কেন্দ্রের মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৩১২টি। গাজীপুর, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও রংপুর মেট্রোপলিটন এলাকাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কেন্দ্র ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে আট হাজার ৩১টি কেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পুলিশের মাঠ-পর্যায়ের সদস্যদের জন্য আচরণবিধি ও নির্বাচন আইন বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও সহজে বহনযোগ্য অস্ত্র সরবরাহ করা হবে। নির্বাচনকালীন সময়ে এসপি ও ওসিদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩৩ জন নিহত ও সাত হাজার ৫১১ জন আহত হন। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে ৫৪টি সহিংসতায় তিন জন নিহত ও ৪৯৪ জন আহত হয়েছেন। আসকের হিসাবে, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হন ১০২ জন।
পুলিশ বলছে, এবারের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং ঝুঁকিতে থাকা প্রার্থীদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আইজিপি বাহারুল আলম মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, নির্বাচনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে যেকোনও মূল্যে আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল রাখতে হবে। কোনও বিশৃঙ্খলা হলে তাৎক্ষণিক কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, “আগামী ৩৭ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। এই সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।”
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো নিয়ে নির্বাচন কমিশন আগেই প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজনে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে।”
নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ ও প্রস্তুতি প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “নির্বাচন সুষ্ঠু করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং জনমনে আস্থা ও স্বস্তি আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান কার্যক্রম বৃদ্ধি করা হয়েছে। নির্বাচনে নাশকতা সৃষ্টি করতে পারে এমন ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর বিষয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। একইসঙ্গে দেশব্যাপী চলছে ডেভিল হান্ট ফেজ-২ কার্যক্রম। যার সুফল আমরা পাচ্ছি। দেশব্যাপী চেকপোস্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানও চলছে।”
তিনি আরও বলেন, “এবারের নির্বাচনে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ, অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং সাধারণ এই তিন পর্যায়ে ভোটকেন্দ্রগুলোকে ভাগ করেছি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণগুলোতে আমরা বডি-ওর্ন ক্যামেরাসহ পুলিশ নিয়োজিত থাকবে। যাতে কোনও ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এছাড়া নির্বাচনের আমাদের সব মিলিয়ে প্রায় এক লাখ ৭৬ হাজারের মতো পুলিশ ফোর্স নিয়োজিত থাকবে।”
নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধে তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচন এলে রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এটা বলা যায়। তবে, এবার যেন এমন কিছু না হয় সেজন্য পুলিশ মাঠে খুবই সতর্ক রয়েছে। এছাড়া সেনাবাহিনী ও বিজিবি রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে।”