Image description

জুলাই আন্দোলনে শহীদ আটজনের পরিচয় ও কবর শনাক্ত হয়েছে। আন্দোলনে শহীদ হওয়া ১১৪ জনকে দাফন করা হয়েছিল বেওয়ারিশ হিসেবে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে ১৬ মাস পর এই আটজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। গতকাল এই ৮ শহীদের পরিবার তাদের কবরও চিহ্নিত করতে পেরেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজার কবরস্থানে জুলাই আন্দোলনের সময় বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা ১১৪ জনের লাশ উত্তোলন করে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করে পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট-সিআইডি। সেই তালিকা থেকে আদালতের মাধ্যমে আবেদন করা ৯ জনের মধ্যে গতকাল সকালে ৮ শহীদের লাশ শনাক্ত করে তাদের কবর স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। এ সময় স্বজনদের আহাজারিতে রায়ের বাজার কবরস্থানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

শনাক্ত হওয়া ২৫ নম্বর কবরটি শহীদ রফিকুল ইসলামের (৫২)। পেশায় এই কম্পিউটার প্রশিক্ষকের বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুরে হলেও কর্মসূত্রে তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার গোলাপবাগে থাকতেন। ’২৪ সালের ১৯শে জুলাই তাকে যাত্রাবাড়ী এলাকাতেই কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর দিনের পর দিন হাসপাতাল, থানাসহ বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের বেওয়ারিশ লাশ দাফনের তালিকায় তার ছবি পায় পরিবার। তবে কেউই বলতে পারেনি রায়ের বাজারের ৪ নম্বর ব্লকের কোন কবরটি রফিকুলের। তাই নিখোঁজের ১৬ মাস পর গতকাল যখন কবরটি পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছিল তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন স্ত্রী নার্জিয়া ইসলাম নূপুর। আম্মু আম্মু বলে কোনোভাবেই যেন নূপুরের জ্ঞান ফেরাতে পারছিলেন রফিকুল দম্পতির একমাত্র সন্তান রায়হান ইসলাম। সকলে কবরস্থান ত্যাগ করলেও নূপুর ঠায় বসে ছিলেন শহীদ রফিকুলের ওই ২৫ নম্বর কবরের পাশে। অঝোরে চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল তার। রায়হান বলেন, আমি আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম বলে বাবা সব সময় চিন্তা করতো। আর তিনিই ডিম কিনতে বাসার বাইরে গিয়ে আর ফিরে আসলেন না। তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। আমি আমার বাবার হত্যাকারীদের বিচার চাই। 

ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ প্রোফাইলের পর রফিকুলের পাশেই ২৪ নম্বর কবরে দাফন করা হয়েছে চাঁদপুরের মতলব থানার বারোহাটিয়া গ্রামের পারভেজ বেপারী (২৩)কে। আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৯শে জুলাই রাজধানীর বাড্ডায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন তিনি। গতকাল তার কবর বুঝে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা শামসুন্নাহার। বারংবার তিনি বলছিলেন, আমার বাবা কই, আমার সাত রাজার ধন, আমার মানিক কই। তুই একবার আমার কোলে আয়। আমার বাবাকে আমি এতদিনেও খোঁজ করে পাইনি। আমি আজকে তোমাকে পেয়েছি। 

২৯ নম্বর কবরে দাফন করা হয়েছে ’২৪ এর ১৮ই জুলাই যাত্রাবাড়ীর দক্ষিণ কাজলা এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়া কাপড় ব্যাবসায়ী শহীদ সোহেল রানা (৩৮)কে। গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে হলেও তিনি পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর মোহাম্মদবাগে থাকতেন। গতকাল তার কবরে পাশে দাঁড়িয়ে তার মা রাশেদা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। অশ্রুশিক্ত হয়ে ছেলের কবর ছুঁয়ে বলছিলেন, আমাকে যতই তোমরা এখান থেকে নিয়ে যাও আমি আবার এখানে চলে আসবো। আমি একদিন ঠিকই আমার ছেলের পাশে এই কবরে চলে যাবো। তার সঙ্গে আসা ছোট ছেলে নাদিমকে বলেন, তোরা আমাকে ছেড়ে দে, আমি সোহেলের কাছে যাবো। এতদিন কতোবার এসেছি, কিন্তু কেউ আমাকে বলতে পারেনি কোনটা আমার সোহেলের কবর। আজ আমি আমার সন্তানের কবর খুঁজে পেয়েছি। আমি আর এখান থেকে যাবো না। শহীদ সোহেলের ছোট ভাই নাদিম বলেন, আমার ভাইতো ওয়ারিশ। তার তো বাবা-মা, ভাই-বোন সকলে আছে। তারপরও আমার ভাইকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হলো। লাশটা পর্যন্ত আমাদের দেয়া হলো না। আমরা কি এমন অন্যায় করেছিলাম! আমরা এর বিচার চাই। রায়ের বাজার কবরস্থানের ৪ নম্বর ব্লকের ৩৫ নম্বর কবরটি কুমিল্লা দেবিদ্বারের কাচিমারা গ্রামের ফয়সাল সরকারের (২৬)। পড়ালেখার পাশাপশি যাত্রীবাহী গাড়ির সুপারভাইজারের কাজ নিয়েছিলেন তিনি। জুলাই আন্দোলন চলাকালে ২২শে জুলাই রাজধানীর উত্তরাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। গতকাল ছেলের লাশ বুঝে নিতে কুমিল্লা থেকে মা হাজেরা বেগম এসেছিলেন রায়ের বাজারে। ছেলের কবরের পাশে বসে বিলাপ করতে করতে তিনিও জ্ঞান হারাচ্ছিলেন বারবার। কান্না করতে করতে গলা বসে গিয়েছিল তার। হাত দিয়ে বারবার ছেলের কবরের মাটি ঠিক করে দিচ্ছিলেন তিনি। তিনি বলছিলেন, আমি আর কোনোদিনও আমার ছেলেকে পাবো না। এতদিন ভাবতাম আমার ছেলে নিখোঁজ। একদিন ঠিকই ফিরে আসবে। কিন্তু আজকে আমি নিশ্চিত আমার ছেলে এখানেই শুয়ে আছে। আমার কলিজার টুকরাটাকে এইভাবে বেওয়ারিশভাবে দাফন করা হলো। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে, আমি আর সহ্য করতে পারছি না। 

শহীদ রফিকুল ইসলাম, শহীদ পারভেজ বেপারী, শহীদ সোহেল রানা ও শহীদ ফয়সাল সরকারসহ মোট ৮ জনের লাশ শনাক্ত করে গতকাল তাদের স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছে সিআইডি। বাকিরা হলেন- ২রা আগস্ট ঢাকার মাদারটেকে নিহত মুগদার শহীদ কাবিল হোসেন (৫৮), ২২শে জুলাই উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের ২ নম্বর রোডে নিহত শেরপুরের শ্রীবর্দী থানা এলাকার গাড়িচালক শহীদ আসাদুল্লাহ, ১৮ই জুলাই ঢাকার মোহাম্মদপুরে নিহত ময়মনসিংহের ফুলপুরের শহীদ মাহিম (৩২) ও ১৯শে জুলাই যাত্রাবাড়ী এলাকায় নিহত ফেনীর টাইলস মিস্ত্রি শহীদ রফিকুল ইসলাম (২৯)। সকলের স্বজনরাই গতকাল রায়ের বাজার কবরস্থানে এসেছিলেন প্রিয় মানুষটির কবর বুঝে নিতে। 

‘২০২৪ সালের জুলাই উত্থানে অজ্ঞাতনামা শহীদদের মধ্যে পরিচয় শনাক্তকরণ’ ওই অনুষ্ঠানে সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ বলেন, প্রায় ১ মাস সময় নিয়ে উত্তোলনকৃত মোট ১১৪টি অজ্ঞাত মরদেহের ডিএনএ ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন শেষে ৮ জন শহীদের পরিচয় শহীদ পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা প্রতিটি লাশের ডিএনএ স্যাম্পল তৈরি করে রেখেছি। এখন কেউ যদি তার স্বজনের খোঁজ করে, আমরা সহজেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করতে পারবো। 

এ সময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ৯টি পরিবারের সংগৃহীত ডিএনএ নমুনার মাধ্যমে ইতিমধ্যে ৮ জন অজ্ঞাতনামা শহীদের পরিচয় সফলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। 

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, এই শনাক্তকরণের ফলে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। যদিও আমরা জানি, এই শোক কোনোদিন পুরোপুরি মোছা যাবে না, তবুও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সত্য উদ্‌ঘাটন ও পরিচয় ফিরিয়ে দেয়ার এই প্রচেষ্টাকে শহীদ পরিবারের হৃদয়ে কিছুটা হলেও প্রশান্তি এনে দিবে।  

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ময়নাতদন্ত এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের মতো সংবেদনশীল কাজগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে। 

এর আগে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপোলজিস্ট ও ফরেনসিক কনসালটেন্ট ড. লুইস ফনডেব্রিডারের প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় গত ৭ই ডিসেম্বর থেকে বেওয়ারিশভাবে রায়ের বাজার কবরস্থানে দাফন হওয়া নিহত জুলাইযোদ্ধাদের লাশ উত্তোলন কার্যক্রম শুরু করে সিআইডি। গত ২৭শে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১১৪টি অজ্ঞাত লাশ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত সম্পন্নকরণ এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ সফলভাবে সমাপ্ত হয়।