Image description
এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস এর জাতীয় নির্বাচন নিয়ে করা জরিপের ডেসিমিনেশন প্রোগ্রামটাতে অংশগ্রহণ করেছি আজ বিকেলে জাতীয় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে। সুন্দর আয়োজন ছিলো। এমিনেন্সের সিইও ডা. শামীম হায়দার তালুকদার চমৎকার প্রেজেন্টেশান দিয়েছেন।
 
৩০০ আসন থেকে সাড়ে বিশ হাজার মানুষের অংশগ্রহনে করা জরিপের ফলাফল হচ্ছে-
আগামী নির্বাচনে
৭০% মানুষ বিএনপিকে ভোট দিবে,
১৯% জামায়াতে ইসলামী,
২.৬% এনসিপি,
ভোট দিবে না বা না ভোট দিবে ০.৩%
আর কিছু অন্যান্য দলকে।
 
সার্ভে রেজাল্ট প্রেজেন্টেশানের পর বিজ্ঞ প্যানেলিস্ট ও অতিথিরা সার্ভে ফাইন্ডিংস বা মেথোডোলজি নিয়ে তেমন আলোচনা করেন নি, যেটা আমি এক্সপেক্ট করেছিলাম যে একটা অ্যাকাডেমিক ডিস্কাশন হবে। উনারা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন ইস্যুতে কথা বলেছেন। আমি আমার কিছু প্রশ্ন ও পর্যবেক্ষণ শেয়ার করেছিলাম। আপনাদের সাথেও শেয়ার করি-
 
১) উনাদের ফাইন্ডিংস মতে- নির্বাচনে ভোট দিবে না বা না ভোট দিবে মাত্র ০.৩%। এক শতাংশেরও কম। তার মানে আওয়ামীলীগকে ছাড়া ইলেকশান করলে জনগণের অংশগ্রহন কম তো হবেই না, বরং স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহন থাকবে। উল্লেখ্য- এই স্যাম্পলের মধ্যে ২৭% অংশগ্রহনকারী ছিলো যারা আগে লীগকে ভোট দিয়েছিলো বা দেয়ার ইচ্ছে ছিলো।
২) উনাদের স্যামপ্লিং ইউনিট ছিলো ইউনিয়ন/ওয়ার্ড। প্রত্যেক আসন থেকে ২টা ইউনিয়ন (সিটির ক্ষেত্রে ৩টা ওয়ার্ড) এবং প্রত্যেক ইউনিয়ন/ওয়ার্ড থেকে ৩০ জনের মতো মানুষের রেস্পন্স নিয়েছেন।
এ স্যামপ্লিং স্ট্র্যাটেজিতে একটু সিরিয়াস গলদ আছে। অনেক আসনে একাধিক উপজেলা থাকে, ভৌগলিক বৈচিত্র্য থাকে, যা এখানে কন্সিডার করা হয় নি। বিশেষভাবে ইউনিয়নের মধ্যে কিভাবে ৩০ জন চুজ করা হয়েছে এ প্রশ্নের জবাবে ডা. শামীম জানালেন উনারা ইউনিয়ন সেন্টারে গিয়ে সেখান থেকে ৩০ টা হাউজহোল্ড পর্যন্ত গিয়েছেন। তার মানে এটা ঐ ইউনিয়নেরও রিপ্রেজেন্টেটিভ স্যাম্পল না।
 
৩) ইন্টারেস্টিংলি এ সার্ভেতে আনডিসাইডেড বা সিদ্ধান্তহীন ভোটারের অনুপাত হচ্ছে ১.৫% যারা কাকে ভোট দিবে শেয়ার করে নাই। বাকি সবাই কোন দলকে ভোট দিবে এটা রিভিল করেছে। এটা খুবই আনইজুয়াল একটা ফাইন্ডিংস।
সম্প্রতি যতগুলো সার্ভে হয়েছে (ইনোভিশন, বিআইজিডি, সানেম, আমেরিকান আইআরআই), সব সার্ভেতে ১৭% থেকে ৪০% এর মতো মানুষ সিদ্ধান্তহীন বা ভাসমান ভোটার ছিলো। আইআরআই বিশেষ টেকনিক অবলম্বন করায় সবচেয়ে কম সিদ্ধান্থীন ভোটার ছিলো- সেটাও ১৭%।
 
সো, এ সার্ভেতে মাত্র দেড় শতাংশ লোক ছাড়া বাকি সবাই তাদের পার্টি প্রিফারেন্স রিভিল করেছে এটা একটা সন্দেহজনক ফাইন্ডিংস। মাঠ পর্যায়ের গবেষণা সহকারী বা যেকোন পর্যায়ে এ ডাটা মেনিপুলেটেড হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।
 
উনারা কিভাবে সব মানুষকে কনভিন্স করতে পেরেছেন তাদের প্রিফারেন্স রিভিল করতে বা কিভাবে এই অসাধ্য সাধন করেছেন যেটা আর কেউই পারে নি- এ প্রশ্নটা আমি করেছিলাম। সন্তোষজনক উত্তর পাই নি।
 
৪) এ জরিপে বিএনপি এবং জামায়াতের সাপোর্ট (৭০% বনাম ১৯%)। যেটা অন্যান্য রিপ্রেজেন্টেটিভ সার্ভেগুলোর তুলনায় খুবই আউটলায়ার একটা ফাইন্ডিংস (আইআরআই বা ইনোভিশনের সার্ভেতে ৫-১০% ব্যবধান দেখা গিয়েছিলো।
এরকম আউটলায়ার রেজাল্টের ব্যাখ্যা কী হতে পারে আমার এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. শামীম বলেছেন উনাদের সার্ভেটা হয়েছে ২০ ডিসেম্বর থেকে ১ জানুয়ারী এই সময়ে। হাদী হত্যা, তারেক রহমানের দেশে ফেরা, এবং বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু এসকল কারনে বিএনপির প্রতি এ সময়টাতে মানুষের সিম্প্যাথি বা ইমোশান বেশি কাজ করে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
এ রিজনটা পার্শ্বিয়ালি এ ফলাফলকে অ্যাফেক্ট করে থাকতে পারে (মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে যদিও)। যদি এটা সত্যি হয় তাহলে আনইজুয়াল একটা সময়ে সার্ভে করার কারণে এ জরিপের ফলাফল এক্সটার্নাল ভ্যালিড হবে না।
 
৫) ইন্টারেস্টিংলি- সর্বশেষ কাকে ভোট দিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে কাকে ভোট দিবেন, আপনার আসনে কোন দল জিততে পারে, এবং কোন দল সরকার গঠন করতে পারে এসকল প্রশ্নের উত্তরে যারা বিএনপি, জামায়াত, বা অন্যান্য দলের কথা বলেছেন, সেখানে নারী ও পুরুষের মতামতের অনুপাত কন্সিস্টেন্টলি অলমোস্ট সমান। কোন ভ্যারিয়েশন নেই। দেখলে মনে সমানভাবে নারী ও পুরুষের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছে অনুপাতগুলো।
যেমন- বিএনপিকে ভোট দিবে ৭০% পুরুষ, ৭১% নারী
জামায়াতকে ভোট দিবে ১৯% পুরুষ, ১৮% নারী
 
ইভেন অন্যান্য দলে (লিস্টের বাইরের) ভোট দেয়ার ক্ষেত্রেও নারী পুরুষের পার্সেন্টেজ সমান। এ ফাইন্ডিংস নিয়ে তাই আমার ডাউট থেকে গেলো।
 
৬) বিভাগ পর্যায়েও অন্যান্য সার্ভের রেজাল্টের সাথে তেমন কোন মিল এখানে পাওয়া যায় নি। এখানে সব বিভাগেই বিএনপি ৫৮%-৭৪% ভোট পেয়ে এগিয়ে আছে। অন্য সার্ভেগুলোতে বিশেষ করে রংপুরে জামায়াতকে এগিয়ে থাকতে দেখা গিয়েছে (আইআরআই এবং ইনোভিশন)। কিন্তু এ সার্ভেতে রংপুরে বিএনপি ৬৮% এবং জামায়াত ২০% এসেছে। বরিশালে জামায়াতের এসেছে প্রায় ৩০%। যেটা আনইজুয়াল মনে হয়েছে।
এটার একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন ডা. শামীম আরেকটা ফাইন্ডিংস এর বরাতে যেখানে এসেছে- আগে যারা আওয়ামীলীগকে ভোট দিয়েছে তাদের ৬০% এখন বিএনপিকে ভোট দিবে। সুতরাং বিএনপির নিজেদের ভোট এবং আওয়ামীলীগের ভোট একসাথে হওয়ায় বিএনপির মোট ভোট ৭০% হয়েছে। আওয়ামীলীগের ভোটের মেজোরিটি বিএনপিতে গেলেও ২৫% জামায়াত, ও ১৫% অন্যান্য দলে ভোট দিবে জানিয়েছে। এখানেও কেউই আনডিসাইডেড নেই বা সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগছে না। আওয়ামীলীগের সকল ভোটাররা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে গিয়েছে এবং সেটা তারা প্রকাশও করেছে। এটা অবশ্য একটা ভালো লক্ষণ।
 
ড. শিব্বির আহমদ
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর অব ইকোনোমিক্স
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি