Image description

গত বছরের ৯ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে পাথর ও কনক্রিট দিয়ে মাথা-শরীর থেঁতলে হত্যা করা হয়।

হত্যার ঘটনার পাঁচ মাস পর ২১ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সোহাগ আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করতেন। কেরানীগঞ্জের ছেলে সোহাগ ঢাকার বংশাল থানার রজনী বোস লেন সংলগ্ন মসজিদের পাশে “সোহানা মেটাল” নামে একটি ভাঙারির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাতেন।

ভাঙারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং এলাকার আধিপত্য সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আসামি মাহমুদ হাসান মহিন ও সারোয়ার হোসেন টিটুর সঙ্গে সোহাগের বিরোধ চলছিল। ওই বিরোধের জের ধরে তারা সোহাগের গোডাউন তালাবদ্ধ করেছিল। এছাড়া জিয়াউদ্দিন রাজিবের পরিকল্পনায় তারা তাকে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে আসছিল। কিন্তু সোহাগ এসব হুমকিকে কর্ণপাত না করে গোডাউনের তালা খুলে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

হত্যার দিন বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটে আসামিরা ধারালো দা, প্ল্যাস্টিকের পাইপ, লোহার রড, লাঠি, কনক্রিট ও পাথরের টুকরা নিয়ে সোহাগের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে তাকে ঘিরে ধরে মারপিট শুরু করে। পরে তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩নং গেইটে নিয়ে আসে। এরপর সোহাগকে ব্যাপক মারধর করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। ঘটনার পর আসামিরা ‘আমার সোনার বাংলায়, চাঁদাবাজের ঠাই নাই’ বলে স্লোগান দিয়ে পৈশাচিক উল্লাস করে।

গত ৮ ডিসেম্বর আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার ইন্সপেক্টর মো. মনিরুজ্জামান অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগপত্রে ২১ জনের নাম থাকলেও সোহাগের পরিবার সন্তুষ্ট নন।

তবে সোহাগের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম অভিযোগ করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এই হত্যার ঘটনায় মূল তিন জনকে ধরা হয়নি। যাদের নাম আমি এজাহারে দিয়েছিলাম, তাদের নাম অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। মোজাফ্ফর হোসেন বাবুল, রাকেশ ও কাইয়ুম মোল্লা আমার ভাইকে হত্যার মাস্টারমাইন্ড। তাদের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। কার কাছে বিচার দিমু? আইন আসলে অন্ধ।”

তবে মঞ্জুয়ারা বেগম জানান, বিচার দেরি বা না হওয়ার আশঙ্কায় এই চার্জশিটের ওপর নারাজি দেবেন না। তিনি বলেন, “এই তিন আসামিকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটা পরে দেখবো। আপাতত চার্জশিটের ওপর বিচার হোক, বাকিটা পরে দেখবো।”

মঞ্জুয়ারার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এটা কি সম্ভব? এত বড় সেনসেটিভ মামলায় আসামি বাদ দেওয়া যায়? ২১ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট জমা দিয়েছি এবং মামলাটি ন্যায়বিচারের পথে এগোচ্ছে।” তিনি আরও জানান, মামলায় ৮ জন পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে।”

অব্যাহতির সুপারিশ করা আসামিরা হলেন- রাজীব ব্যাপারী, সাবা করিম লাকী, কালু ওরফে স্বেচ্ছাসেবক কালু, রজব আলী পিন্টু, সিরাজুল ইসলাম, হিম্মত আলী, আনিসুর রহমান হাওলাদার, মিজান, নাইম ও রিয়াদ।

অভিযোগপত্রে নাম থাকা আসামিরা হলেন- মাহমুদ হাসান মহিন, সারোয়ার হোসেন টিটু, মনির ওরফে ছোট মনির, আলমগীর, মনির ওরফে লম্বা মনির, নান্নু ওরফে নান্নু কাজী, সজিব ওরফে সজিব ব্যাপারী, টিটন গাজী, তারেক রহমান রবিন, অপু দাস, রিজওয়ান উদ্দিন ওরফে অভিজিৎ বসু ওরফে অভি, জহিরুল ইসলাম, পারভেজ, সাগর, রুমান ব্যাপারী, আবির হোসেন, মো. জহির, ইমরান হোসেন, শারাফাত ওরফে শফিউল ইসলাম, হোসেন চৌকিদার, জিয়াউদ্দিন রাজিব।

২১ জনের মধ্যে ৮ জন পলাতক আছেন- মো. জহির, মো. ইমরান, মো. শারাফাত ওরফে শফিউল, মো. জিয়াউদ্দিন রাজিব, হোসেন চৌকিদার, সারোয়ার হোসেন টিটু, মনির ওরফে লম্বা মনির ও অপু দাস।

উল্লেখ্য, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও শত্রুতার জের ধরে সোহাগকে ৩নং গেটে পাথর ও কনক্রিট দিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

হত্যাকাণ্ডের পরের দিন ১০ জুলাই সোহাগের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম বাদী হয়ে ১৯ জনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। পুলিশ ও র‌্যাব অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে ১৪ জন জেল হাজতে রয়েছেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মূল পরিকল্পনাকারী ও নেতৃত্বদানকারী ছিলেন মাহমুদুল হাসান মহিন ও সারোয়ার হোসেন টিটু। তারা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি নির্দেশনা দেন এবং ঘটনার সময় লাশের চারপাশে স্লোগান দিয়ে পৈশাচিক উল্লাস চালান।