প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট উইকলি ব্লিটজ-এর সম্পাদক সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী গত ২৭ নভেম্বর এক নিবন্ধে দাবি করেছেন— নোবেল বিজয়ী ড. মোহাম্মদ ইউনুস ও গ্রামীণ নেটওয়ার্কের সাথে আল-কায়েদার “অর্থ যোগানদাতার” সম্পর্ক রয়েছে।
তার দাবি অনুযায়ী, ওসামা বিন লাদেন ও আল কায়েদার কথিত “অর্থ যোগানদাতা” মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আব্দুল লতিফ জামিল গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনুসের সাথে ব্যবসায়িকভাবে যুক্ত।
তিনি লিখেছেন, “নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে পরিচালিত এবং বিল ক্লিনটন, হিলারি ক্লিনটন ও জর্জ সোরসের মতো প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক ব্যক্তিদের দীর্ঘদিনের প্রশংসা পাওয়া বৈশ্বিক করপোরেট সাম্রাজ্য ‘গ্রামীণ’ এখন ওসামা বিন লাদেন ও আল-কায়েদার সঙ্গে উদ্বেগজনক যোগসূত্রের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সন্ত্রাসবিরোধী সংস্থার অধিকতর নজরদারির মুখে পড়তে পারে।”
সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী তার লেখায় যদিও দাবি করেছেন ‘এখন’ ‘বিভিন্ন দেশের সন্ত্রাসবিরোধী সংস্থার অধিকতর নজরদারির মুখে পড়তে পারে’। তবে অভিযোগটি সংক্রান্ত যেসব বিদেশি সংবাদমাধ্যমের লিংক যুক্ত করেছেন সেগুলো ২০০৩ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত।
অর্থাৎ, দুই যুগেরও বেশি সময় আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর বরাতে তিনি লেখাটি লিখেছেন।
উইকলি ব্লিটজ এর রিপোর্ট দেখুন এখানে।
বিতর্কিত লেখক সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী এর আগেও বহুবার বাংলাদেশ বিষয়ক ভুয়া খবর ছড়িয়েছেন তার ওয়েবসাইটে লেখার মাধ্যমে এবং সেই ভুয়া খবরের অনেকগুলোই ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
নিকট অতীতে শোয়েব চৌধুরীর প্রচারিত ভুয়া খবর বিভিন্ন ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা খণ্ডন করেছে যার কয়েকটি দেখা যাবে এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।
গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে শোয়েব চৌধুরীর ২৭ নভেম্বরের দাবিটি ভারতীয় বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে পু:প্রকাশিত হয়েছে। এসব সংবাদমাধ্যমের মধ্যে রয়েছে: News18, IANS, United News of India, HT Syndication, Kolkata24x7, TV9 Bangla, Indian Politics এবং Capital TV.
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় তার এক্স হ্যান্ডেলেও এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। দেখুন এখানে।
দুই যুগ পুরনো ভুয়া খবর
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শোয়েব চৌধুরী এবং তার প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট উইকলি ব্লিটজ-এর বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম যেসব অভিযোগকে ড. ইউনূসের সঙ্গে যুক্ত করছে, সেগুলোর শিকড় দুই দশক আগের পশ্চিমা কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের কিছু বিতর্কিত প্রতিবেদনে।
২০০১–২০০২ সালের প্রেক্ষাপটে আল-কায়েদার অর্থযোগান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যখন জল্পনা-কল্পনা চলছিল, তখন বিট্রিশ পত্রিকা The Sunday Times-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, ইউসুফ (মোহাম্মদ আব্দুল লতিফ) জামিল নাকি ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে আর্থিকভাবে যুক্ত ছিলেন।
কিন্তু এ দাবি যুক্তরাজ্যের আদালতে টেকেনি। জামিল পরিবার মানহানির মামলা করলে The Sunday Times অভিযোগের পক্ষে কোনো কার্যকর প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।
২০০৫ সালে আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয় এবং পত্রিকাটি ক্ষতিপূরণ প্রদান করে। আদালতের নথিতে এই অভিযোগগুলোকে ’অপ্রমাণিত, দুর্বল এবং আইনগতভাবে মজবুত নয়’ বলে উল্লেখ করা হয়।
কাছাকাছি সময়ে Wall Street Journal Europe–এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, জামিল পরিবারের কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সন্ত্রাসী অর্থায়ন তদন্তের আওতায় রয়েছে। এ নিয়েও মামলা হয়। শুরুতে নিম্ন আদালত WSJ–কে ক্ষতিপূরণ দিতে বললেও পরবর্তীতে UK House of Lords “জনস্বার্থে সাংবাদিকতা” নীতির ভিত্তিতে সংবাদপত্রটির পক্ষে রায় দেয়।
তবে আদালত উল্লেখ করে যে, প্রতিবেদনের তথ্য সত্য বলে আদালত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি; বরং রায়ে ’সাংবাদিকতার নীতি ও স্বাধীনতার প্রসঙ্গ’ বিবেচিত হয়েছে।
এ ছাড়াও “গোল্ডেন চেইন”–সম্পর্কিত যেসব নথি এই বিতর্কে ব্যবহৃত হয়েছিল, সেগুলো নিয়েও ব্রিটিশ আদালতের একাধিক নথিতে এর তথ্যগত দুর্বলতা এবং সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
উল্লিখিত নথি ও আদালতের সিদ্ধান্তগুলো সামগ্রিকভাবে দেখায় —জামিল পরিবারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী সংগঠনের অর্থায়নের অভিযোগ কোনো আদালতই প্রমাণিত বলে ঘোষণা করেনি।
বরং অভিযোগের উৎস হিসেবে যে তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো আদালতে অগ্রাহ্য বা অসত্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে বহু বছর আগেই।