Image description

আওয়ামী লীগ আমলের শেষ দিকে, ২০২৩ সালে তথ্য অধিদপ্তরের কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও জাল-জালিয়াতি হয়েছে- যা তদন্তে উদঘাটিত হয়েছে। তদন্তে পাওয়া গেছে, একই হাতের লেখায় অনেকগুলো উত্তরপত্র রয়েছে। কোনো কোনো উত্তরপত্রে পরীক্ষক ও মূল্যায়নকারীর স্বাক্ষর নেই। উত্তরপত্রের টপশিটে ব্যক্তিগত তথ্যাদি ও প্রার্থীর স্বাক্ষরে লেখায় মিল নেই। কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন কালিও ব্যবহৃত হয়েছে। কোনোটিতে উত্তরপত্রের টপশিটে প্রার্থীর স্বাক্ষর নেই। নামের বানানের ক্ষেত্রে স্বাক্ষরের বানান ভিন্ন। হাজিরা শিট এবং টপশিটের স্বাক্ষর ভিন্ন। হল পরিদর্শকের স্বাক্ষরের মধ্যেও পার্থক্য পাওয়া গেছে। এমনকি তথ্য অধিদপ্তরের মনোগ্রামযুক্ত সিলও ভিন্ন পাওয়া গেছে।

তথ্য অধিদপ্তরের ৮ ক্যাটাগরির ১১-২০তম গ্রেডের ৪৫টি শূন্য পদের জন্য ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া চলাকালে আওয়ামী লীগ আমলেই লিখিত পরীক্ষায় অনিয়ম ও জাল-জালিয়াতির অভিযোগ উঠে। এ নিয়ে তখন তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তা ধামাচাপা দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া হয়। তারমধ্যেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৩ আগস্ট, ২০২৫ তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সম্প্রচার-এর নেতৃত্বে একই বিষয়ে সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম ও জাল-জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায় তদন্তে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি তথ্য অধিদপ্তর এই নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিলের আদশ জারি করে।

তদন্ত প্রতিবেদনে যা আছে
তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ আলতাফ-উল-আলমের নেতৃত্বে গঠিত এই তদন্ত কমিটিতে ছিলেন গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফায়জুল হক, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা নিজামুল কবীর, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) খালেদা বেগম, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালক (বর্তমানে গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক) মো. আবদুল জলিল, জেলা পর্যায়ে আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মুন্সী জালাল উদ্দিন এবং তথ্য অধিদপ্তরের উপপ্রধান তথ্য অফিসার (প্রশাসন ও অর্থ) হাছিনা আক্তার। উল্লেখ্য, খালেদা বেগম, আবদুল জলিল এবং মুন্সী জালাল উদ্দিন ওই নিয়োগ কমিটিতেও ছিলেন।

তদন্ত কমিটির সভায় আলোচনা, দায়ী ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং কমিটির মতামতের মধ্য দিয়ে গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। তৎকালীন নিয়োগ কমিটির সদস্য মুন্সী জালাল উদ্দিন বলেন, “তৎকালীন নিয়োগ কমিটির জনপ্রশাসন এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিগণ লিখিত পরীক্ষার অনিয়মের বিষয়ে তাদের সন্দেহ ও অনাস্থা প্রকাশ করে তদন্তের পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে নিয়োগ কমিটির সভায় তদন্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরিপ্রেক্ষিতে, তথ্য অধিদফতরের সিনিয়র উপপ্রধান তথ্য অফিসার জনাব আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত করা হয় এবং কমিটি যথাসময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। কিন্তু পূর্ব সিদ্ধান্ত থাকলেও তদন্ত রিপোর্ট নিয়োগ কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হয়নি কিংবা পরবর্তী সভার রেজুলেশনেও বিষয়টি প্রতিফলিত হয়নি।”

খালেদা বেগম বলেন, “লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় দেখা যায় যে, অনেক খাতার প্রাপ্ত নম্বর এবং হাতের লেখা সন্দেহজনক। অনেকগুলো উত্তরপত্রে একই ধরনের হাতের লেখ্য লক্ষ্য করা যায় এবং প্রাপ্ত নম্বর অধিক বলে প্রতীয়মান হয়। তিনি আরো জানান, লিখিত পরীক্ষার পর সকল ডকুমেন্টস নির্ধারিত রুমে সিলগালা করার পর তৎকালীন প্রধান তথ্য অফিসার তার কাছ থেকে চাপ দিয়ে উক্ত কক্ষের চাবি নিয়ে নেন।”

এদিকে মো. আবদুল জলিল তার বক্তব্যে দাবি করেছেন, তিনি নিয়োগ কমিটির সভাপতি থাকাকালে কমিটি অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে নিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নিয়েছেন। প্রার্থীদের কম্পিউটার দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে ব্যবহারিক পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। এছাড়াও, ড্রাইভার ও আলোকচিত্রগ্রাহকের ব্যবহারিক পরীক্ষা কমিটির সদস্যগণ ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থেকে এবং সরেজমিন তত্ত্বাবধানে গ্রহণসহ ৪ ক্যাটাগরির পদের মৌখিক পরীক্ষা সর্বোচ্চ সততা ও স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করেছেন বলে সভাকে অবহিত করেন। পরীক্ষার খাতায় অনিয়মের অভিযোগ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নকারী কর্মকর্তাদের মতামতের ভিত্তিতে কোনো অনিয়ম পাননি বলে জানান। তিনি বলেন, মৌখিক পরিক্ষার সময় প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষার খাতার হাতের লেখা মেলানো হয়। এসময় কোনো অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়নি। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে লিখিত পরীক্ষার সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না।”

নিয়োগ প্রক্রিয়া চলাকালে ওই সময় ডিপিসির যেসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতেই উল্লেখ রয়েছে অনিয়মের বিষয়গুলো। বিভাগীয় নিয়োগ কমিটির (ডিপিসি) ১৫.০৭.২০২৩ তারিখের কার্যবিবরণীতে বলা আছে, “অদ্য উত্তরপত্রসমূহ মূল্যায়নকালে দেখা যায়, কিছু উত্তরপত্রের সাথে পরীক্ষকদের কাছে সরবরাহকৃত নমুনা উত্তরপত্রের সামঞ্জস্যপূর্ণ মিল পাওয়া যায়। এ ধরনের উত্তরপত্রসমূহে প্রাপ্ত নম্বর শতকরা ৯০ ভাগের অধিক। গত ২৪.০৩.২০২৩ তারিখে অফিস সহায়ক পরীক্ষা চলাকালে উত্তরপত্রের নমুনাপত্র প্রস্তুত করা হয়। এমতাবস্থায়, সামগ্রিকভাবে বিষয়টি যথাযথভাবে পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনে বিধি মাফিক তদন্তপূর্বক আগামী সভায় উপস্থাপনের জন্য কমিটির সভাপতি ও প্রধান তথ্য অফিসার মহোদয়কে অনুরোধ জ্ঞাপন করা হয়।”

উক্ত ডিপিসি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তীতে তথ্য অধিদফতরের তৎকালীন সিনিয়র উপপ্রধান তথ্য অফিসার মো. আবদুল জলিল এর নেতৃত্বে ৩ (তিন) সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য দুজন সদস্য ছিলেন যথাক্রমে সিনিয়র তথ্য অফিসার পরীক্ষিৎ চৌধুরী ও সিনিয়র তথ্য অফিসার এ এইচ এম মাসুম বিল্লাহ। কমিটি যথাসময়ে তদন্ত সম্পন্ন করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে বলে দাবি করা হয়। আবদুল জলিলের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় “তথ্য অধিদফতরের গ্রেড-১১ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রশ্নপত্র ও নমুনা উত্তরপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্রসমূহ তথ্য অধিদফতরে নিয়ে আসা, কোডিং, সংরক্ষণ ও মূল্যায়নের সকল পর্যায়ে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা এবং নিয়োগ সংক্রান্ত বিদ্যামান নিয়মকানুন, পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয়েছে বলে তদন্ত কমিটি মনে করে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের ব্যতায় তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।” কিন্ত ডিপিসি সভার পূর্ব সিদ্ধান্ত থাকলেও অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনটি পরবর্তী ডিপিসি সভায় উপস্থাপন করা হয়নি। এমনকি আবদুল জলিলের নেতৃত্বাধীন ওই তদন্ত কমিটি ঞঙজ অনুযায়ী তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করেনি। এ প্রসঙ্গে আবদুল জলিল তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বাধীন এই তদন্ত কমিটির সামনে দেয়া বক্তব্যে বলেছেন, “উত্তরপত্রগুলো সিলগালা কক্ষে রক্ষিত ছিল বিধায় তা পুনঃপর্যালোচনা করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরো বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন ত্রুটিপূর্ণ হলে তৎকালীন প্রধান তথা অফিসার এটি গ্রহণ না করে পুনঃতদন্ত করাতে পারতেন।”

তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বাধীন এই তদন্ত কমিটি সিলগালাকৃত কক্ষের দরজা খুলে অস্বাভাবিক নম্বরপ্রাপ্ত উত্তরপত্রসমুহ চিহ্নিত করে সেগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করে। অফিস সহায়ক পদ, তথ্য সহকারী পদ ও সাঁট মুদ্রাক্ষরিক পদের উত্তরপত্র পর্যালোচনায় ব্যাপক অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসে। এতে দেখা যায়, একই হাতের লেখায় অনেকগুলো উত্তরপত্র রয়েছে, কোনো কোনো উত্তরপত্রে পরীক্ষক ও মূল্যায়নকারীর স্বাক্ষর নেই, উত্তরপত্রের টপশিটে ব্যক্তিগত তথ্যাদি ও প্রার্থীর স্বাক্ষরে লেখায় মিল নেই প্রভৃতি।

কমিটি এই মর্মে মতামত দেয় যে, “উত্তরপত্র পুনঃপর্যালোচনা এবং নিয়োগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতামতের আলোকে তথ্য অধিদফতরের ৮ ক্যাটাগরির ১১-২০তম গ্রেডের ৪৫টি শূন্য পদের চলমান নিয়োগ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম সংগঠিত হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়।” কমিটি নিয়োগ কার্যক্রম বাতিলের সুপারিশও করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নিয়োগ কার্যক্রম বাতিল করা হয়। তবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এই ব্যাপক নিয়োগ অনিয়ম ও জাল-জালিয়াতির জন্য দায়-দায়িত্ব নিরূপণ বা কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়নি। মনে করা হচ্ছে, নিয়োগ কমিটির তিনজন সদস্য এই তদন্ত কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত থাকায় এ বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, নিয়োগ দুর্নীতির দায়-দায়িত্ব নিরূপণের জন্য নতুন করে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এই কমিটি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

 


শীর্ষনিউজ