ইঞ্জিন-কোচ সংকটে চালু করা যাচ্ছে না দেশের দুই অঞ্চলের দু’টি অনুমোদিত ট্রেন সুবর্ণচর এক্সপ্রেস ও টাঙ্গুয়ার এক্সপ্রেস। দু’টি ট্রেনের অনুমোদন দিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৩ সালের নভেম্বরে আওয়ামী লীগ সরকার অনুমোদনসহ ঢাকা-নোয়াখালী রুটের নতুন আন্তঃনগর ট্রেনের নামকরণ করে সুবর্ণচর এক্সপ্রেস। একই বছরে ঢাকা-সিলেট-ঢাকা রুটে বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন সুবর্ণচর এক্সপ্রেস চালুর বিষয়েও উদ্যোগ নেয়া হয়। সরকার টাঙ্গুয়ার এক্সপ্রেস ট্রেনটিও অনুমোদন করে। সর্বশেষ গত মার্চে টাঙ্গুয়ার এক্সপ্রেস চালুর বিষয়ে নির্দেশ দিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রজ্ঞাপনে ওই ট্রেন দ্রুত সময়ে চালুর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। অনুমোদন পেলেও ট্রেন দু’টি চালু করতে পারছে না রেলপথ মন্ত্রণালয়। রেলের ইঞ্জিন-কোচের সংকটের কারণেই অনুমোদিত দু’টি ট্রেন চালু করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
ঢাকা-সিলেট-ঢাকা রুটে বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর ব্যাপারে জোরালো দাবি ছিল সিলেটবাসীর। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদেও দাবি উত্থাপিত হয়। পরে ২০২৩ সালের শেষের দিকে একটি বিশেষ ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই বছরের নভেম্বরে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তখনকার উপ-সচিব মো. তৌফিক ইমাম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে দেয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ঢাকা-সিলেট-ঢাকা রুট চালুর জন্য নতুন বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেনের নাম টাঙ্গুয়ার এক্সপ্রেস প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন। যাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ও অর্থনৈতিক কার্যাবলি বাড়ানোর লক্ষ্যে আন্তঃনগর ট্রেনের সময়সূচিও অনুমোদিত হয়েছে। আবার, ঢাকা-নোয়াখালী রুটে আন্তঃনগর ট্রেন সুবর্ণচর এক্সপ্রেস মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব তৌফিক ইমাম স্বাক্ষরিত আরেক বিজ্ঞপ্তিতে অনুমোদন দেয়া হয়। সেই প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয় ঢাকা-নোয়াখালী রুটের নতুন আন্তঃনগর ট্রেনের নাম সুবর্ণচর এক্সপ্রেস প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদন হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
বাংলাদেশের রেলের ইঞ্জিন ও কোচের সংকটের খবর নতুন নয়। এই সংকটের কারণেই দুইটি ট্রেন অনুমোদন ও নামকরণের পরও ওই রুটগুলোয় নতুন দুই ট্রেন পরিচালনা করা যাচ্ছে না। রেলপথ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রেলের এই ধরনের সংকট, বিশেষ করে (লোকোমোটিভ) সংকট না কাটলে এখনই দুই রুটে ট্রেনগুলো চালানো সম্ভব নয়। চীন থেকে ২০টি নতুন লোকোমোটিভ পেতে যাচ্ছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। সে লোকোমোটিভগুলো ট্রেনের লোকোমোটিভের সংকট কিছুটা দূর হবে বলে জানিয়েছে রেলের কর্মকর্তারা। তবে, লোকোমোটিভ রেলবহরে যুক্ত হলেও চালু করা যাচ্ছে না নতুন ট্রেন। তখনো সংকট থাকবে ট্রেনের কোচের। ফলে লোকোমোটিভ পেলেও পর্যাপ্ত কোচ না থাকলে সহসাই প্রস্তুত করা যাচ্ছে না নতুন ট্রেন। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমাদের কোচ এবং ইঞ্জিনের সংকটের কারণে এই রুটগুলোতে ট্রেনগুলো চালানো যাচ্ছে না। আমরা চেষ্টা করছি, ইঞ্জিন ও কোচ প্রাপ্তি সাপেক্ষে এগুলো আমরা ওইসব রুটে নতুন ট্রেন দেবো।
মন্ত্রণালয়ের সচিব আরও বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে সড়ক খারাপ হওয়ায় ট্রেনের উপর বেশি চাপ পড়ছে। সেজন্য সিলেট ও শ্রীমঙ্গলের যাত্রীরা এটা নিয়ে কথা বলছেন। এ বিষয়ে উপদেষ্টার কাছেও অনুরোধ এসেছে। আমরা গত কয়েকদিনে সিলেট ও শ্রীমঙ্গলের তিনটি ট্রেনে ৫টা এক্সট্রা কোচ দিয়েছি। গত সোমবার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জন্য কালনি এক্সপ্রেসে এক্সট্রা কোচ সংযুক্ত করেছি। যেখানে ২০টি আসন শুধুমাত্র শ্রীমঙ্গলের জন্য রেখে বাকিআসনগুলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সিলেট ও নোয়াখালীর যাত্রীদের আন্দোলন-অবরোধ:
সিলেট ও নোয়াখালীর দুই নতুন ট্রেন চালুর জন্য নানা সময়ে আন্দোলন করে আসছে দুই এলাকার যাত্রীরা। নানা সময় তারা রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। সিলেটের যাত্রীরা সিলেট বিভাগের রেলপথ উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত সংস্কারসহ ৮ দফা দাবিতে আন্দোলন করছে। অন্যদিকে, নোয়াখালীর যাত্রীরাও আন্দোলন-বিক্ষোভ করাসহ ট্রেন চালুর বিষয়ে স্মারকলিপিও দিয়েছে রেলে। সমপ্রতি তারা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন এ বিষয়ে। গত ৪ঠা মে নোয়াখালী-ঢাকা রুটে বরাদ্দপ্রাপ্ত নতুন আন্তঃনগর ট্রেন সুবর্ণচর এক্সপ্রেস দ্রুত চালুর দাবিতে নোয়াখালীতে রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন ওই এলাকার সাধারণ শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনতা। অবরোধ চলাকালে বিক্ষোভকারীরা রেললাইনে অবস্থান নিলে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে। গত সপ্তাহে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে নোয়াখালী রেল উন্নয়ন ফোরাম ও নোয়াখালী যোগাযোগ উন্নয়ন ফোরামের ব্যানারে মানববন্ধন করে ফোরামের সদস্যরা।
অন্যদিকে আগামী ১লা নভেম্বর থেকে রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে সিলেট এলাকার জনগণের একটি অংশ। গত শুক্রবার রাতে আন্দোলনকারীরা এ কর্মসূচির ডাক দেন। এর আগে বিকালে সিলেটের কুলাউড়া জংশন স্টেশনের ভিআইপি ওয়েটিং রুমে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে রেলওয়ের ঢাকা অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. মহিউদ্দিন আরিফের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে বৈঠকে সন্তুষ্ট হয়নি আন্দোলনকারীরা। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম মানবজমিনকে এ নিয়ে আরও বলেন, সিলেটে যাত্রীরা আন্দোলন করছে। রেলের বৈঠক হয়েছে। কিন্তু তারা বৈঠকে সন্তুষ্ট হয়নি। তারা বলছে- ওই রুটে স্বাধীনভাবে নতুন ট্রেন চালনা করতে হবে। রেলওয়ের সক্ষমতা অনুযায়ী এটা সম্ভব হবে না। মিটারগেজের কিছু কোচ এসেছে। কিন্তু ট্রেন পরিচালনা করতে বিভিন্ন রকমের কোচ লাগে। এখানে বিভিন্ন ধরনের কোচ লাগবে। এসি, সুলভ, শোভন ইঞ্জিনসহ সব কোচ-ই লাগে। তাই বাকি কোচগুলো আসলে এটা করতে পারবো।