বিশ্ব যখন চারদিকে গণতন্ত্রের অবনতি দেখছে, বাংলাদেশ তখন গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের দিকে হাঁটছে। এ জন্য সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে দেশটি। গণতন্ত্রের পথে উত্তরণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে সংস্কারের প্রতি শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রতিশ্রুতি দেখাতে হবে।
চলতি মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার-বিষয়ক উপকমিটি ঢাকা সফর করে। তাদের এই সফরের প্রেক্ষিতে বুধবার ফ্রান্সের স্ত্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দপ্তরে বাংলাদেশ নিয়ে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদন উপস্থাপনের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সফরে আসা প্রতিনিধিদলের প্রধান মুনির সাতোরি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এসব কথা।
মুনির সাতোরি বলেন, “আমাদের সফরের উদ্দেশ্য ছিল দুটি। এক অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রম পর্যালোচনা ও গণতান্ত্রিক উত্তরণে মানবাধিকার। দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রায় ভুলতে বসা রোহিঙ্গা পরিস্থিতি।
তিনির বলেন, “রোহিঙ্গা সংকট যাতে হারিয়ে না যায়, সে জন্য এটি ইইউর রাজনৈতিক এজেন্ডায় আবার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।”
সরকারের সংস্কার কাজ নিয়ে তিনি বলেন, “এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে আমরা সহযোগিতার প্রস্তাব করেছি।”
প্রতিনিধি দলের আরেক সদস্য ছিলেন ইজাবেল উইসেলার-লিমা। তিনি বলেন, “যখন বিশ্বে নাটকীয়ভাবে গণতন্ত্র অবনতির পথে, তখন বাংলাদেশ পথ পরিবর্তন করে দেখিয়েছে যে গণতন্ত্রের পথে যাওয়া যায়। তারা চেষ্টা করছে গণতন্ত্রের দিকে যাওয়ার। আর এ জন্য সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এটা আশা করা জরুরি যে সামনে নির্বাচন হবে এবং তা প্রতিযোগিতামূলক হবে, যা হওয়া উচিত। অন্তর্বর্তী সরকার এ জন্য চেষ্টা করছে।”
ইজাবেল উইসেলার রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে বলেন, “এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির। সম্প্রতি ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গাজা সংকটের কারণে রোহিঙ্গাদের বিষয়টি মানুষ ভুলে যাচ্ছে। এ সংকট আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। কারণ মিয়ানমার তাদের দায়িত্ব নিচ্ছে না।”
দলের সদস্য আরকাদিউজ মুলারজিক বলেন, “মুসলিম বিশ্ব ও ভারত রোহিঙ্গাদের পিঠ দেখিয়েছে। রোহিঙ্গা শিবিরে সবচেয়ে বেশি মানবিক অনুদান আসে ইউরোপের দেশগুলো থেকে। আগে যুক্তরাষ্ট্র বেশি সহযোগিতা দিত। মুসলিম দেশগুলোর পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের প্রতি প্রতিশ্রুতি খুবই নগণ্য। এটি আশ্চর্যজনক এবং গ্রহণযোগ্য নয়।”
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্যাটারিনা ভিয়েরা বলেন, “এটি পরিষ্কার– দেশটি এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি একটি সুযোগ সত্যিকারের অগ্রগতির। সামনে হয়তো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের ভেতরে গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সবাই নির্বাচনটি স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দেখতে চায়। এ বিষয়গুলো শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে আসেনি। এসেছে নাগরিক সমাজ, ছাত্র ও যুব আন্দোলনের পক্ষ থেকেও। তারা নিজেদের মধ্যে সংলাপের মধ্যে রয়েছে। যদিও অনুতাপের বিষয়– ধর্মীয়, লিঙ্গ ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু এবং নারীদের এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ নেই। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সমাজ গঠনে এখানে উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে সংস্কারে উৎসাহ, যারা সংস্কারে কাজ করছেন তাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ ও গণতান্ত্রিক কাঠামোয় গঠনমূলক সহযোগিতা করে ইইউ ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় বাংলাদেশ সামনে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেবে বলে মনে করি।
উল্লেখ্য, গত ১৬ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার উপকমিটির পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশ সফর করে। এ সময় তারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, বেসরকারি সংস্থা, নাগরিক সমাজ, সংগঠন, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং মাঠ পর্যায়ে কর্মরত বহুপক্ষীয় সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরও পরিদর্শন করেন তারা।
শীর্ষনিউজ