Image description
 

দেশে প্রকৌশল শিক্ষার দুই ধারা বিএসসি ও ডিপ্লোমাধারীদের সরকারি চাকরিতে দশম গ্রেডে নিয়োগ নিয়েই এবার মূল দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। যদিও এক পক্ষ তিন দফা এবং অন্য পক্ষ সাত দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে। সর্বশেষ ২০১৩ সালেও দুই পক্ষ আন্দোলনে নেমেছিল।

শুরুতে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও গত বুধবার পুলিশ শাহবাগে বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বেধড়ক মারধর করায় তারা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের মতো কর্মসূচি শুরু করেন। তাদের ডাকে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আজও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ চলার কথা। 

 
 

সমস্যা নিরসনে সরকারের গঠন করে দেওয়া আট সদস্যের কমিটি গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সভা করেছে। বৈঠক থেকে ১৪ সদস্যের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করার কথা জানানো হয়েছে। সব পক্ষকে তাদের বক্তব্য এই গ্রুপের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।   

দুই পক্ষই স্বীকার করছে, বিএসসি ডিগ্রি এবং ডিপ্লোমাধারীদের বিদ্যমান জটিলতা বেশ পুরোনো। এই সমস্যা নিরসনে অতীতের অনেক সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও সমাধান মেলেনি। উল্টো প্রতিবারই এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি আন্দোলনে নেমেছে দুই পক্ষ। তবে দুই পক্ষই এবার জানিয়েছে, তারা ছাড় দেবে না।

মূলত এইচএসসি সম্পন্ন করে বুয়েট, চুয়েট ও কুয়েটের মতো প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। আর এসএসসি বা এইচএসসি পাস করার পর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিভিন্ন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে প্রকৌশল বিষয়ে চার বছর বা তিন বছর ছয় মাস মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স সম্পন্ন করেন ডিপ্লোমাধারীরা।

জটিলতার শুরুটা হয় চাকরির বাজারে গিয়ে। প্রকৌশল পেশায় সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে দশম গ্রেডের উপসহকারী প্রকৌশলী পদে কেবল ডিপ্লোমাধারী শিক্ষার্থীরাই আবেদন করতে পারেন। এরপর চাকরির অভিজ্ঞতা বা যোগ্যতার ভিত্তিতে নবম গ্রেডে পদোন্নতি হয়। এ ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ কোটা বা সুবিধাও পান তারা। এ ছাড়া ডিপ্লোমাধারী শিক্ষার্থীরা বিএসসি সম্পন্ন করে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমেও নবম গ্রেডের চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান।

আর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি শেষ করে বিসিএসের মাধ্যমে নবম গ্রেডে অথবা ১১-১৬তম গ্রেডে চাকরির সুযোগ পেলেও দশম গ্রেডে আবেদনের কোনো সুযোগ পান না বিএসসি ডিগ্রিধারীরা। এই প্রক্রিয়াকে বৈষম্যমূলক উল্লেখ করেই আন্দোলনে নেমেছেন বিএসসি ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রশ্ন, দশম গ্রেডে শুধু ডিপ্লোমাধারীরাই কেন সুযোগ পাবে?

সরকারি বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরগুলোতে বিএসসি ডিগ্রিধারীরা বর্তমানে প্রথম শ্রেণির নবম গ্রেডে সহকারী প্রকৌশলী পদে যোগ দেন। এই গ্রেডে মূল বেতন ২২ হাজার টাকা। আর ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা যোগ দেন দশম গ্রেডে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১৬ হাজার টাকা মূল বেতনে উপসহকারী প্রকৌশলী পদে। 

নবম গ্রেডের পদের তুলনায় স্বভাবতই দশম গ্রেডে পদ বেশি। সে পদে বিএসসি ডিগ্রিধারীরা আবেদন করতে পারেন না। তারা চান, এই পদ উন্মুক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সবার জন্য ওপেন করে দেওয়া হোক। মেধায় যারা টিকবেন, তারা চাকরি পাবেন। 

ডিপ্লোমাধারীদের যুক্তি হলো, যাদের জন্য নবম গ্রেডে প্রথম শ্রেণির পদ উন্মুক্ত রয়েছে, তারা কেন নিচের পদে চাকরিতে ঢুকতে চান। ডিপ্লোমাধারীরা সারাজীবনে মাত্র একটি বা দুটি পদোন্নতি পান। অন্যদিকে, বিএসসিদের পদোন্নতি দ্বিতীয় গ্রেড পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাদের আরও যুক্তি হলো, বিএসসি ডিগ্রিধারী দেশে তিন থেকে চার লাখ। কিন্তু ডিপ্লোমাধারী ২০ লাখ। দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিও তাদের দিয়ে দেওয়া হলে এতগুলো মানুষ তাহলে কোথায় যাবে? 

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই দশম গ্রেডে তাদের চাকরি সুযোগ হারাতে চান না। এই প্রশ্নে অনড় অবস্থান নিয়েছেন তারা। 

কর্মসূচি
দশম গ্রেডে চাকরিসহ তিন দফা দাবিতে দেশের সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। তারা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করেন। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে।   

পুরোনো দ্বন্দ্বে নতুন উত্তাপ 
বিএসসি ডিগ্রিধারী ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে যোগ্যতা, পদোন্নতি ও পদবি ব্যবহারের বিষয়ে দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। ২০১৩ সালেও এ নিয়ে উভয় পক্ষ আন্দোলনে নেমেছিল, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। প্রায় এক যুগ পর আবারও নতুন করে মাঠে নামলেন শিক্ষার্থীরা।

বিএসসি শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দশম গ্রেড কেবল ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সংরক্ষিত হওয়ায় তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। নবম গ্রেডেও কোটা থাকায় চাকরির বাজারে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।
ডিপ্লোমাধারীদের যুক্তি, দেশে প্রায় ২০ লাখ ডিপ্লোমাধারী; কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। তাই দশম গ্রেড তাদের জন্য রাখা হয়েছে। পদোন্নতির কোটা কমিয়ে আনা হলেও সুযোগ বাড়ানো হয়নি।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিএম সাদিকুল ইসলাম বলেন, যোগ্য হলে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের দশম গ্রেডের পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধা কোথায়? আর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম বলেন, চাকরি কেবল মেধার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। পদোন্নতিও পরীক্ষার মাধ্যমে দেওয়া হোক। কোটা পদ্ধতি প্রকৌশল খাতকে অদক্ষ করছে।

আর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সংগঠনের আইডিইবির আহ্বায়ক মো. কবির হোসেন সমকালকে বলেন, বিএসসি ডিগ্রিধারীরা অযাচিত আন্দোলন করছেন। কারণ, এটি মীমাংসিত বিষয়। ১৯৭৮ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপনে উপসহকারী প্রকৌশলী পদ সৃষ্টি এবং ৩৩ শতাংশ পদোন্নতি বৈধভাবে নির্ধারিত। ৪৭ বছর ধরে সরকারি সব দপ্তর এই নিয়মই অনুসরণ করে আসছে।

এবার পুরোনো দ্বন্দ্বে নতুন উত্তাপ ছড়ায় গত ২৫ আগস্ট। সেদিন রংপুরের নেসকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৩-এর সহকারী প্রকৌশলী মো. রোকনুজ্জামানের সঙ্গে তাঁর দপ্তরের ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা রোকনুজ্জামানের বিরুদ্ধে নেসকোর মতো কেপিআই এলাকায় মব সৃষ্টির অভিযোগ আনেন। 

বিএসসি প্রকৌশলীরা রোকনুজ্জামানকে লাঞ্ছিত করা, তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলে থানায় জিডি করেন। এর পরই গত মঙ্গলবার রাজধানীতে বুয়েট শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসেন। এই কর্মসূচিতে বুয়েটের পাশাপাশি যোগ দেন আরও কয়েকটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও।

ছাড় দেবে না কোনো পক্ষ 
ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের সভাপতি প্রকৌশলী মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম সমকালকে বলেন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। তিন দফা দাবি সরকারকে অবিলম্বে পূরণ করতে হবে।

অন্যদিকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র শিক্ষক পেশাজীবী পরিষদের সদস্য সচিব মো. ইমাম উদ্দিন বলেন, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পদোন্নতির সুযোগ কম। পঁচিশ বছর চাকরি করে তারা একটি অথবা দুটি পদোন্নতি পান বলেই সরকার তাদের জন্য সুযোগ করে দিয়েছে।

আইডিইবির যুগ্ম আহ্বায়ক মীর্জা মিজানুর রহমান বলেন, আমি নিজেই রেলওয়েতে ৩৪ বছর চাকরি করে মাত্র একটি পদোন্নতি পেয়েছি। এবার বুঝুন আমাদের বেদনা কী।

সচিবালয়ে বৈঠক 
সরকারের গঠন করে দেওয়া আট সদস্যের কমিটির সভাপতি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সভায় সভাপতিত্ব করেন। বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে শুরু হওয়া সভায় তিনজন উপদেষ্টা, প্রকৌশলীদের সংগঠনের দুজন প্রতিনিধিসহ মোট ছয়জন উপস্থিত ছিলেন। দুজন সদস্য উপস্থিত হতে পারেননি। 

১ নম্বর নতুন ভবনে অনুষ্ঠিত এই সভা শেষে কমিটির সদস্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের বলেন, কমিটি কেমন করে কাজ করবে তা ঠিক করা হয়েছে। যে সমস্যাগুলো এসেছে, সেগুলো বহু দিনের পুরোনো সমস্যা। তাই সমাধানের জন্য সবার সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। এর জন্য ১৪ সদস্যের ওয়ার্কিং গ্রুপ করা হয়েছে। যে সংস্থাগুলো ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ করে, তাদের প্রধানরাও ওয়ার্কিং গ্রুপে থাকবেন। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের চারজন প্রতিনিধিও থাকবেন। জনপ্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে সেখানে।

উপদেষ্টা বলেন, এ কমিটি ডিপ্লোমা ও বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের বক্তব্য আগে শুনবে। প্রকৌশল খাতে যারা প্রণিধানযোগ্য, যারা বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালো জানেন, তাদের বক্তব্য এই কমিটি শুনবে।
পরিবেশ ও বন উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের অনুরোধ থাকবে– আন্দোলন যারা করছেন তারা যেন জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করেন। তারা তাদের বক্তব্য লিখিত আকারে ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রধান গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবকে জানিয়ে দেবেন। যারা আন্দোলন করছেন, তাদের একটি প্রতিনিধি দল যে কোনো সময় আমাদের সঙ্গে বসতে পারে। ওয়ার্কিং গ্রুপের সঙ্গেও বসতে পারে। 

ওয়ার্কিং গ্রুপ কবে কাজ শুরু করবে– জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, কাজ শুরু হয়ে গেছে। প্রথম সভা হবে আগামী রোববার। তবে তারা (আন্দোলনকারী) যখনই মনে করবেন আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে আমরা সুপারিশ জমা দেব।’

উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘আমরা তিনটি গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা করব– যারা আন্দোলন করছেন, তাদের অভিভাবক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা। কাজের ক্ষেত্রে কী হচ্ছে, কেন সমস্যাটা হচ্ছে– তা বোঝার জন্য  পিডব্লিউডি, এলজিইডি, পিডিবি–তাদের সঙ্গে বসব।’ তিনি বলেন, এক দিকে তিন দফা দাবি আছে; আরেক দিকে সাত দফা। ফলে আমাদের আগে শুনতে হবে, জানতে হবে, বুঝতে হবে। তার পরই করতে হবে।’

সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা বলেন, দুপক্ষের মধ্যে একটা সেতু গড়তে হবে। এমন একটা সমাধান যাতে করতে পারি, দুই পক্ষই লাভবান হয়।

সভায় শিল্প মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান উপস্থিত ছিলেন। বিদেশে থাকায় আরেক সদস্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার সভায় উপস্থিত থাকতে পারেননি।

এ ছাড়া ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের সভাপতি প্রকৌশলী মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের সভাপতি প্রকৌশলী মো. কবির হোসেনও‌ সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভায় ছিলেন কমিটির সদস্য সচিব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা) কাজী মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক। অসুস্থ থাকায় বোর্ড অব অ্যাক্রেডিটেশন ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন, বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী তানভির মঞ্জুর সভায় আসতে পারেননি।