
বাংলা একাডেমির উন্নয়নে ২০২৩ সালে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। অবকাঠামো উন্নয়নসহ অটোমেশনের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজ হয়েছে মাত্র ১৪ শতাংশ। বাংলা একাডেমি প্রকল্পটির মেয়াদ আরো ছয় মাস বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
প্রকল্পটির কাজে দেরি হওয়ার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে প্রকল্প শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। চলমান প্রকল্পে বিগত সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর অযৌক্তিক হস্তক্ষেপে চার মাসাধিককাল প্রকল্পের কাজ স্থগিত থাকায় অনুমোদিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। এ জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলা একাডেমিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান নাহিদ ইজাহার খান। দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দেন তিনি। বাংলা একাডেমির কর্মকর্তারাও বিষয়টি ভালোভাবে নেননি। পরে আইএমইডির পরিদর্শনের সময় বিষয়টি স্পষ্ট করেন প্রকল্পটির পরিচালক ড. হাসান কবির। তিনি লিখিতভাবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে নাহিদ ইজাহারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করার জন্য ছয় মাস সময় চেয়ে আবেদন করেন।
কিছুদিন আগে এই প্রকল্প পরিচালক অবসরে গেছেন। এখন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রকল্পটি দেখভাল করছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বাংলা একাডেমির গ্রন্থাগার আধুনিকীকরণ : ২০২৩ সালে ‘অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অটোমেশন ও ডিজিটাইজেশন’ শীর্ষক প্রকল্পটি ১৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় অনুমোদন পায়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে প্রকল্পটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা।
কিন্তু আইএমইডির অগ্রগতি প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দুটি অর্থবছর নির্ধারিত ছিল। এই দুই অর্থবছরে ডিপিপির প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বিপরীতে ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অর্থ ব্যয় করা হয়েছে মাত্র দুই কোটি ৭৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটির এ পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ১৩.৯৭ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ১৪.২৫ শতাংশ। সার্বিক অগ্রগতি প্রতিবেদন পর্যালোচনায় অনুমোদিত সময়ে প্রকল্পটির কাজ শেষ করা সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছে আইএমইডি।
ছয় মাস সময় বাড়ানোর যে আবেদন করা হয়েছে, এ সময়ের মধ্যে প্রস্তাবিত কাজগুলো প্রস্তাবিত মেয়াদের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে কি না—আইএমইডির এমন প্রশ্নে বাংলা একাডেমি বলছে, এ সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করা সম্ভব হবে। প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত অঙ্গভিত্তিক অনুমোদিত বাজেটে সম্পাদন করা সম্ভব। বাংলা একাডেমিতে বর্তমানে অন্য কোনো প্রকল্প চলমান নেই।
প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম কালের কণ্ঠকে বলেন, মেয়াদ বৃদ্ধির অনেক কারণ থাকে। প্রকল্পের ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) যে সময় দেওয়া হয়, প্রকল্প শুরু করার আগেই এ সময়ের বড় অংশ পার হয়ে যায়।
নাহিদ ইজাহারের হস্তক্ষেপ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি ঘটেছে আমি দায়িত্ব পাওয়ার অনেক আগে। এ বিষয়ে আমি তেমন কিছু জানি না। প্রকল্পটির সময় বাড়ানোর আবেদন করেছেন প্রকল্প পরিচালক ড. হাসান কবির। তিনিই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। সুতরাং এ বিষয়ের ব্যাখ্যা তিনি ভালো দিতে পারবেন। বাংলা একাডেমির লোকবলকে অতিরিক্ত দায়িত্বে প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করতে দেওয়া হয়েছে। এর জন্য অন্য কোনো আর্থিক বরাদ্দ নেই।’
এ বিষয়ে জানতে ড. হাসান কবিরের মুঠোফোনে কয়েকবার যোগাযোগ করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। গত ১৫ জানুয়ারি প্রকল্পের কাজ সরেজমিনে গিয়ে পরিদর্শন করেন আইএমইডির কর্মকর্তারা। এ সময় বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজমসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রকল্প অফিস পরিদর্শনকালে নির্মাণকাজ তত্ত্বাবধানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত নির্মাণকাজ ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট টাইলস ও সিলিং কার্যক্রম সম্পাদনে টাইলস পছন্দ করার কাজ চলমান। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক ও অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামাদি এবং আসবাব সরবরাহের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
প্রকল্পটি দেরি হওয়ার বাস্তব কিছু কারণ উল্লেখ করে আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রকল্প শুরু করতেই বিলম্ব হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমোদিত সময় ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ সম্পর্কে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আদেশ জারি করা হয় ২০২৩ সালের ৬ এপ্রিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয় ১২ এপ্রিল। প্রকল্প পরিচালকের নিয়োগ আদেশ জারি করা হয় ওই বছরের ১৬ মে। এতে প্রকল্পের অনুমোদিত সময়ের প্রায় পাঁচ মাস চলে যায়।
প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর যৌক্তিকতা বিবেচনায় আইএমইডি বলছে, বর্ধিত সময়ের মধ্যে বাকি কাজ যথাযথভাবে শেষ করে প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) যথাসময়ে আইএমইডিতে পাঠাতে হবে। প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া মেয়াদকাল চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে বলে মনে করে সংস্থাটি।
বাকি কাজ শেষ হতে আর কত সময় লাগতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যেই প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করা সম্ভব হবে। অটোমেশন, ডিজিটাইজেশন—সবই ঠিক সময়ে শেষ হবে বলেও জানান তিনি।
প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলা একাডেমি গ্রন্থাগারে নান্দনিক স্থাপত্য ডিজাইনের ভিত্তিতে অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে অত্যাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন মনোরম পাঠ পরিবেশ তৈরি করা; গ্রন্থাগারে অধ্যয়ন ও গবেষণার সুবিধার্থে ম্যানুয়াল কার্যক্রম অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তিসম্পন্ন করার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেশন করা; পাঠসামগ্রীর দীর্ঘস্থায়ী সংরক্ষণ ও পাঠক-সেবা ডিজিটাল করার লক্ষ্যে গ্রন্থাগারের বই, পত্রিকা ও সাময়িকী ডিজিটাইজেশন করা; ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে গ্রন্থাগারের পাঠ ও পাঠক-সেবা ডিজিটাল করার মাধ্যমে দেশের জ্ঞান, মেধা ও মননসম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখা।
প্রকল্পের মূল কার্যক্রম তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি সরঞ্জাম কেনা, কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক ক্রয়; বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি ক্রয়; অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামাদি ও আসবাব কেনা।