
জুলাই আন্দোলনে আহত যোদ্ধাদের জন্য বিশেষায়িত দুটি ওয়ার্ডের প্রায় সব শয্যা ফাঁকা। দুই ওয়ার্ড মিলিয়ে ভর্তি ৯৫ জনের মধ্যে শয্যায় আছেন ২০ জনের কম। গতকাল বুধবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (নিটোর) বা পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়।
ওয়ার্ডে থাকা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, চিকিৎসাধীন জুলাই যোদ্ধাদের বেশির ভাগই পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে বাড়িতে গেছেন। শিগগিরই আবার চলে আসবেন। রয়েছেন শুধু গুরুতর আহতরা। তাঁদের একজন শামীম আহমেদ। পেশায় তৈরি পোশাক কারখানার কর্মী।
শামীম জানান, গত ৫ আগস্ট গাজীপুরের মাওনা এলাকায় পায়ে গুলি লাগে তাঁর। সম্প্রতি অস্ত্রোপচার করে তাঁর পায়ের তিন ইঞ্চি হাড় কেটে ফেলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এত খারাপ সময় কোনো দিন যায় নাই। বাবা-মা আর বাচ্চারা বাড়িতে। সবাই কান্নাকাটি করছে। স্ত্রী কিছু রান্না করে নিয়ে এসেছে।’
আরেক যোদ্ধা মো. লিটন পেশায় গাড়িচালক। ৫ আগস্ট রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের বন্দুকের আঘাতে পা ভেঙে যায়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিচ্ছেন এই হাসপাতালে। দুই দফা অস্ত্রোপচার হয়েছে। আর কত দিন থাকতে হবে তিনি জানেন না। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন মা, বউ-বাচ্চা দেখতে এসেছে। তাই কিছুটা ভালো লাগছে। কিন্তু সন্ধ্যায় তারা ফিরে গেলে তখন কী করে থাকব?’
পাশের শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছেন মো. হাসিব মোল্লা। সদ্য অনার্স শেষ করা শিক্ষার্থী হাসিব জানান, চার ভাই ও মা-বাবাকে নিয়ে তাঁদের সংসার। ভাইদের মধ্যে তিনি মেজো। প্রতিবছর খুব ঘটা করে ঈদ উদযাপন করা হলেও এবার দিন শুরু হয়েছে মায়ের কান্না শুনে।
তিনি বলেন, ‘কী করব বলেন, আমার হাত এখনো ঠিক হয়নি। এই অবস্থায় হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়া কঠিন। পরিবার ছেড়ে হাসপাতালে খারাপ লাগছে ঠিকই, কিন্তু হাসপাতালে নার্স, চিকিৎসকরাও কেয়ার করছেন। বিশেষ খাবার দিচ্ছেন, আবার ইউনিটপ্রধান এসে সবার সঙ্গে দেখা করে গেছেন। এভাবেই কেটেছে ঈদের দিন।’
জানা যায়, হাসপাতালের পাশাপাশি ঈদের দিন দুপুরে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জুলাই যোদ্ধাদের খাবার দিয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকেও। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৫০ জন জুলাই যোদ্ধার মধ্যে ঈদের সময়ে ৩০ জনের মতো হাসপাতালে ভর্তি আছেন। অন্যরা ফিরে আসার শর্তে নিজে দায়িত্ব নিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে গেছেন।
এই ওয়ার্ডের নার্স তন্বী জানান, অনেকেই বাড়ি চলে গেছেন। যাঁরা আছেন, তাঁদের জন্য প্রতিবছরের ঈদের দিনের মতো এবারও ভালো আয়োজন ছিল। ঈদের ছুটিতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে না।
৪৪% রোগী সড়ক দুর্ঘটনার শিকার : পঙ্গু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতাল চিকিৎসা নিতে আসা প্রায় রোগী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এসেছে। জরুরি বিভাগে রোগী ও স্বজনদের প্রচণ্ড চাপ। এক্স-রে কক্ষের সামনে রোগীর লম্বা লাইন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য মতে, ঈদের আগের দিন, ঈদের দিন ও পরদিন—এই তিন দিনে ৮১০ জন রোগী জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ৩৬০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত, যা মোট রোগীর ৪৪ শতাংশ। এর মধ্যে ৩১ শতাংশ বাস, অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার দুর্ঘটনার। ১২.৯৬ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত।
এ ছাড়া ওপর থেকে পড়ে গিয়ে আহত ২৮২ জন, যা মোট রোগীর ৩৮.৮ শতাংশ। বিভিন্নভাবে আঘাত পেয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছে ১১৮ জন বা ১৪.৫৬ শতাংশ। মারামারি করে আহত ৫৩ জন বা ৬.৫৪ শতাংশ। বিভিন্ন যন্ত্র থেকে আহত ২৩ জন বা ২.৮ শতাংশ, ভারী জিনিস ওঠাতে গিয়ে কাঁধে আঘাত পেয়ে আহত চারজন বা ০.৪৯ শতাংশ।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা ২৩ বছরের রিমন হোসেন বলেন, নারায়ণগঞ্জের ভুলতা এলাকায় অটোরিকশায় করে যাচ্ছিলাম। প্রাইভেট কারের ধাক্কায় অটোরিকশা উল্টে গুরুতর আহত হই। এক পায়ের হাড় ভেঙেছে, শরীরের কয়েক জায়গায় গভীর ক্ষত।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আবুল কেনান বলেন, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে রোগীর চাপ অনেক বেড়েছে। আর প্রতিবছরই ঈদের সময়ে দুর্ঘটনা বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। কারণ এই সময়ে রাস্তা ফাঁকা থাকে। ফলে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চালানো হয়। এতে দুর্ঘটনা ঘটে।