Image description

Kai Kaus ( কাই কাউস)

(০১)
======================
“... বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বিভিন্ন কারণে আওয়ামী লীগ সরকার এক বিশেষ অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ গ্রহণ করলেও তা বাস্তবায়নে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগের শাসন পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব পুনরায় জোরদার হতে শুরু করে। মূলত: বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মানুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন না করে কোন রাজনৈতিক দল বা সরকারের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন লাভ সম্ভব নয়। এ বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল ও সরকার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য হলেও কোন না কোনভাবে জনগণের ধর্মানুভূতিকে ব্যবহার করার প্রয়াস পেয়েছে।
ইংরেজ শাসনামলেই ভারতবর্ষের শিক্ষিত জনগণ পাশ্চাত্য রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠতে শুরু করে। ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গেও ভারতীয় জনগণের এক অতি ক্ষুদ্রাংশের তখনই পরিচয়। কিন্তু একথা সত্য যে, ইংরেজদের ‘বিভেদ কর ও শাসন কর’ নীতির ফলে বৃটিশ-ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা নয় - সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভিত জোরদার হয়ে উঠে। ইংরেজদের শুভাশীষ নিয়ে যাত্রারম্ভকারী ভারতের দুই বৃহৎ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কংগ্রেস (১৮৮৫) ও মুসলিম লীগ (১৯০৬) এর ঘােষিত লক্ষ্য যাই হােক না কেন কালক্রমে মূলত: এ দু’টি প্রতিষ্ঠানই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শিকার হয়ে পড়ে। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভক্তি এবং ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভবের একটাই অন্যতম প্রধান কারণ। ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পূর্বমুহূর্তে মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাঙালী মুসলমান ও হিন্দু নেতা স্বাধীন সার্বভৌম অখণ্ড বাংলার জন্য প্রচেষ্টা চালালেও প্রস্তাবিত বাংলা রাষ্ট্রে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভয়ে প্রধান প্রধান হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও কংগ্রেস তাতে রাজী হয়নি। (বদরুদ্দীন উমর, সাম্প্রদায়িকতা, ঢাকা, ১৯৬৬, পৃ: ৮৫)
... শৈলেশ বন্দোপাধ্যায় ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতাকে দেখেছেন এভাবে, “ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দে ভারত বিভাজন হয়েছে। বর্তমান ভারত (নেপাল বাদ দিলে) হিন্দুদের একমাত্র বাসভূমি এবং এদেশের জনসংখ্যার এক বৃহত্তম অংশ হল হিন্দু। সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষ হলেও গণতন্ত্রের রীতি অনুসারে ভারতের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা এখানকার নাগরিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এবং এদেশ যাঁদের বাসভূমি সেই হিন্দুদের রীতিনীতি ও ইচ্ছা অনুসারেই চলবে। এই হিন্দু রীতিনীতিটার তাদের দেওয়া নাম (একে পুরাতন নামে প্রত্যাবর্তনও বলা চলতে পারে) ভারতীয়।” (শৈলেশ কুমার বন্দোপাধ্যায়, গান্ধীজি, হিন্দু-ধর্ম এবং এর অন্য ব্যাখ্যাতাগণ, মাসিক চতুরঙ্গ, কলিকাতা, জানুয়ারী, ১৯৯০, পৃ: ৭৫১)
অধিকাংশ পর্যবেক্ষকের মতে, ভারতের রাজনীতিতে ধর্মের প্রাধান্য বর্তমানে স্বাধীনতা পরবর্তীকালের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশী। (Marcus F. Franda, Fundamentalism, Nationalism and Secularism Among the Muslim Indians)
শুধু কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নয় — ইহজাগতিক রাজনীতির সমর্থক অখণ্ড ভারতের কমিউনিস্টগণও ধর্মের প্রভাব মুক্ত ছিলেন না। নিম্নোক্ত দু’টি উদ্ধৃতি সম্ভবত: তা প্রমাণে যথেষ্ট সহায়ক হবে।
“বর্তমান শতকের তিরিশের দশকে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন তার শেষ সীমায় উপনীত হওয়ার পর সন্ত্রাসবাদীরা দলে দলে মার্কসবাদে দীক্ষিত হন এবং কমিউনিষ্ট আন্দোলনে যােগদান করেন এবং গণ-আন্দোলন থেকে বেরিয়ে আসা মার্কসবাদীদের থেকে সংখ্যা ও প্রভাবের দিক দিয়ে তারা প্রথম থেকেই প্রাধান্যে আসেন। এই কারণেই মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্ট্যালিন, মাওসেতুং প্রভৃতি পাঠ এবং অনুশীলন সত্ত্বেও ভারতীয় সন্ত্রাসবাদের এবং সেই সাথে ভারতীয় জাতীয়তাদের বিশিষ্ট ঐতিহ্যিক লক্ষণগুলি থেকে তারা সম্পূর্ণভাবে কোনদিনই মুক্ত হতে পারেন নি। এই লক্ষণগুলির মধ্যে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন চিন্তা এবং সাম্প্রদায়িক কাঠামাের মধ্যে চিন্তা এই উভয়ই হলাে প্রধান লক্ষণ হিসেবে উল্লেখযােগ্য।” (বদরুদ্দীন উমর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙ্গালী সমাজ, ঢাকা, ১৯৭৪, পৃ: ৯৭)
সমর সেনের মতে আনন্দ মঠে যে বিষবৃক্ষের বীজ, রামরাজ্যবাদী গান্ধীজীর সমধর্মী আন্দোলনের (পাকিস্তান আন্দোলন) মাধ্যমে তার পরিণতি ঘটে দেশ বিভাগে। ... যে বিভ্রান্ত রাজনীতি বন্দে মাতরম গানের পেছনে, যে মনােভাবের ফলে মাতৃমূর্তির এত প্রচলন, সে রাজনীতি ও মনােভাব এখনাে আমাদের মধ্যে বর্তমান বলে আজকাল রাস্তাঘাট বন্দে মাতরম ধ্বনিতে যখন তখন মুখরিত হয়। কিন্তু এ মাত অবাস্তব। একদিকে ছিলাে সতীদাহ, অন্যদিকে মা নিয়ে আবেগ। আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার, বঙ্কিমচন্দ্রের বিরূপ সমালােচনা নকশালপন্থীরা পর্যন্ত করেন নি। (বদরুদ্দীন উমর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙ্গালী সমাজ, ঢাকা, ১৯৭৪, পৃ: ৯৯)
হিন্দু পুনর্জাগরণবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মুসলিম সমাজেও পুনর্জাগরণ দেখা দেয়। পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা জিন্নাহ ব্যক্তি জীবনে ধর্মভীরু মুসলমান না হলেও অবিভক্ত ভারতের মুসলিম জনগােষ্ঠীর পশ্চাৎপদতা রােধে এবং মুসলিম জাগরণের জন্য তিনি ধর্মকে রাজনৈতিক কৌশলের হাতিয়াররূপে ব্যবহার করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম গণপরিষদে ভাষণ দানকালে জিন্নাহ হিন্দু-মুসলিম পরিচয় ভুলে গিয়ে পাকিস্তানী রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত হবার আহ্বান জানান। (G.W. Chowdhury, Constitutional Developement in Pakistan, London, 1969, p.59) মূলত: গান্ধী ও জিন্নাহ ব্যক্তি জীবনে অসাম্প্রদায়িক হলেও রাজনীতিতে উভয়েই ধর্মকে ব্যবহার করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামকালে যে উদ্দেশ্যেই ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করা হোক না কেন পরবর্তীকালে ভারত-পাকিস্তান উভয় স্বাধীন দেশের রাজনীতিতে ধর্ম কম-বেশী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকে।
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হলে তৎকালীন পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসীন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃবৰ্গ সুকৌশলে পূর্ব বাংলাকে প্রায় উপনিবেশে পরিণত করে ফেলে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবীতে বাংলার জনগণ একের পর এক আন্দোলন গড়ে তােলেন। এসব আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতিতে সংঘটিত হয় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। উদ্ভব ঘটে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের।
রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শােষণমুক্তি ও গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই ছিল বাংলার জনগণের পাকিস্তান সরকার বিরােধী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা আন্দোলন, ন্যাপের ১৪ দফা আন্দোলন, আওয়ামী লীগের ৬ দফা আন্দোলন, ছাত্র সমাজের ১১ দফা আন্দোলনসহ যেসব জনপ্রিয় আন্দোলনসমূহ স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ভিত্তিমূলে কাজ করেছে তার সবকটিতেই বিভিন্নভাবে উপরােক্ত লক্ষ্যসমূহের কথা বলা হয়েছে। এসব আন্দোলন বা দফাভিত্তিক দাবীনামার কোথাও ধর্মনিরপেক্ষতা পদবাচ্যের উল্লেখও ছিল না। (আবদুর রহিম আজাদ ও শাহ আহমদ রেজা, ২১ দফা থেকে ৫ দফা, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ: ৬১-৬৩)
ভাষা আন্দোলনে বামপন্থীদের ভূমিকার গুরুত্ব উল্লেখ করে অনেকে একে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চান। কিন্তু ভাষা আন্দোলন আসলে ডান-বামের আন্দোলন ছিল না। এ ছিল এক মিশ্ৰ শ্ৰেণী ভিত্তি, মিশ্র-ভাবাদর্শ এবং মিশ্র রাজনীতির সম্মিলনে গড়ে ওঠা জাতীয় জাগরণ।(এম. এম. আকাশ, ভাষা আন্দোলন : শ্রেণী ভিত্তি ও রাজনৈতিক প্রবণতা সমূহ, ঢাকা, ১৯৯০, পৃ: ৬১-৬৩) এ ছাড়া তখন বামপন্থীদের যে সাংগঠনিক অবস্থা ছিল তাতে ভাষা আন্দোলনে বিশেষ উল্লেখ্য ভূমিকা পালন তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। (আতিউর রহমান, ভাষা আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত, দৈনিক সংবাদ, একুশে ফেব্রুয়ারী সংখ্যা, ১৯৯০) ১৯৫৪ সালের নির্বাচন উপলক্ষে গঠিত যুক্তফ্রন্টের ঘোষণানুসারে, “কায়েদে আযমের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সংগ্রাম করিয়া ভারতের দশকোর্টি মুসলমান পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। বিরাট ঐতিহ্য সম্পন্ন একটি মহান জাতির ধর্ম ও সংস্কৃতির জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য ছিল। ... মুসলিম লীগের নামে বর্তমান শাসক সম্প্রদায় জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য যে শ্রেষ্ঠতম কৌশল আবিষ্কার করিয়াছে, তাহাতে আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি বিপন্ন হইতে চলিয়াছে। ... আল্লাহ ও ইসলামের নাম করিয়া ইহারা এমন সব কাজ করিয়া থাকে, যাহাতে আল্লাহর অবমাননা এবং ইসলামের অমর্যাদা করা হয়। আমরা ... লীগ শাহীর ধর্মবিরােধী কার্যকলাপের যে পরিচয় দান করিব, তাহাতে দেখা যাইবে যে ইহাদের হাতে শাসন ক্ষমতা থাকিলে পাকিস্তানে ইসলামী হুকুমৎ কোনকালেই কায়েম হইবে না।” (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, প্রথম খন্ড, পৃ: ৩৭৬-৩৭৭)
১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগ মদ, গাজা, বেশ্যাবৃত্তি ইত্যাদি 'হারাম কাজ' বন্ধ এবং নামাজ, রােজা, হজ্ব, জাকাত ইত্যাদি শরীয়ত সংগত কাজে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য সরকারের নিকট তাবলীগ (ধর্ম প্রচার) বিভাগ খোলার দাবী জানায়। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ: ৪২০) ১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় আওয়ামী লীগ মুসলিম জনগণকে কোরআন ও সুন্নাহ বিরােধী কোন আইন পাশ করা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। নির্বাচনে বিজয় লাভের পর আওয়ামী লীগের সংবিধান কমিটি কর্তৃক প্রণীত খসড়া সংবিধানের প্রস্তাবনায় পাকিস্তানের মুসলমানদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনকে কোরআন ও সুন্নাহর আলােকে গড়ে তােলার কথা বলা হয়। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ: ৭৯৩) উক্ত খসড়া সংবিধানের রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারক মূলনীতিতে বলা হয়েছে। যে, (১) কুরআন ও সুন্নাহ বিরােধী আইন পাশ করা হবে না ও (২) কোরআন ও ইসলামীয়াত শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা এবং মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী নৈতিকতার উন্নয়নে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ: ৭৯৪) ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘােষনায়ও ধর্ম নিরপেক্ষতার কোন উল্লেখ নেই। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, তৃতীয় খন্ড, পৃ: ৪) এমনকি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও বাংলাদেশের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতার ঘােষণা দেওয়া হয়নি।(বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, তৃতীয় খন্ড, পৃ: ৭৯১)
১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগের আন্দোলনের কোন পর্যায়ে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান না থাকলেও ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্ৰীয় চার মূলনীতির একটি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এতদসত্ত্বেও শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ সরকারের কার্যক্রম থেকে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, সংবিধানে গৃহীত ধর্মনিরপেক্ষতা কার্যক্ষেত্রে বাস্তবায়নে তারা আন্তরিক ছিলেন না। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র বলে ঘােষণা দেন। ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিব লাহােরে অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলন সংস্থার বৈঠকে যােগদান করেন। ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ইসলামী ফাউণ্ডেশন পুন: প্রতিষ্ঠিত করা হয়। আওয়ামী লীগের অনুসারী ধর্মীয় নেতাদের সংগঠন ‘আওয়ামী উলামা পরিষদ’ কে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার সময়েও কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের একজন মন্ত্রী এক ভাষণে বলেন যে, বাংলাদেশ ইসলামী আদর্শ ও শিক্ষার প্রতি আস্থাশীল এবং সে ইসলামী আদৰ্শ, শান্তি ও বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। (সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, বিচিত্রা, ৩ নভেম্বর, ১৯৮৪)
উপরােক্ত আলােচনার আলােকে একথা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রাক-স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কোন সময়েই আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ বাস্তবায়নে সত্যিকার অর্থে আগ্রহী ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলাের বাংলাদেশ বিরােধিতা ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের প্রত্যক্ষ সাহায্য ও সহানুভূতি লাভের কারণে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ধর্মনিরপেক্ষতা (ইহজাগতিকতা অর্থে নয়) গ্রহণ করলেও এটি বাস্তবায়নে তারা কোন দৃঢ় উদ্যোগ গ্রহণ করে নি। শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবন করে এ বিষয়ে ধীরে ধীরে তাঁদের মূল অবস্থানে ফিরে আসতে থাকেন। জিল্লুর রহমান খানের মতে, “Two things prevented Mujib from making any structural change in Bangladesh political system, or to give it an Islamic slant. First, such a posture would have cast doubt in the minds of Hindus. ... Second, Islamization of the constitution would have strained Bangladesh relations with India. (Islam and Bengali Nationalism, Rafiuddin Ahmed, p. 24)
শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের শাসনাবসানের পর জিয়াউর রহমানের শাসনকালে (১৯৭৮) সংবিধান সংশােধন আদেশ জারী করে বাংলাদেশ সংবিধানের প্রস্তাবনার আগে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং ৮(১) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্ৰীয় মূলনীতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা'র স্থলে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালার উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস প্রতিস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে (article) একটি ধারা (clause) যুক্ত করে ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশসমূহের সঙ্গে ইসলামী সংহতি বর্ধনাৰ্থে সুদৃঢ় সম্পর্ক সৃষ্টি ও বজায় রাখার ইচ্ছা ব্যক্ত করা হয়। ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ কর্তৃক এসব পরিবর্তন সংবিধানের পঞ্চম সংশােধনীরূপে অনুমােদিত হয়। ১৯৮৮ সালে হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ সরকার কর্তৃক সংবিধানের অষ্টম সংশােধনী দ্বারা বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্মরূপে ইসলাম গৃহীত হয়।
এসব সংশােধনী ও সংযােজন দ্বারা বাংলাদেশ সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ অপসারিত হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্ম ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বৃটিশ আমল থেকে অদ্যাবধি এতদাঞ্চলের বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও কমিউনিস্ট রাজনৈতিক কর্মীগণ ধর্মনিরপেক্ষতার পাশে অন্যান্য মহল থেকে তুলনামূলকভাবে বেশী সােচ্চার। আমাদের উপরের আলােচনায় দেখা গেছে যে, এদেশের বাম রাজনীতি সঠিকভাবে সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে উঠতে পারে নি। বদরুদ্দীন উমরের মতে, পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন যখন মস্কো ও পিকিংয়ের দ্বন্দ্বের কারণে বিভক্ত হয় তখন হিন্দু নামধারী কমিউনিস্টদের অধিকাংশ মস্কো লাইন ও মুসলিম নামধারীদের অধিকাংশ পিকিং লাইনের অনুসারী হয়েছিলেন। মস্কো ও পিকিংয়ের মধ্যকার যে তাত্ত্বিক সংগ্রাম তা অনুধাবন করে নয় - মস্কোর সঙ্গে হিন্দু প্রধান ভারতের এবং পিকিংয়ের সঙ্গে মুসলিম প্রধান পাকিস্তান রাষ্ট্রের সুসম্পর্কের কারণেই এরূপ হয়ে ছিল। (বদরুদ্দীন উমর, বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা) এ ছাড়া বামতাত্ত্বিকদের মতে, কোন সমাজে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন না হলে সে সমাজের রাজনীতি থেকে ধর্ম পৃথক হতে পারে না। তাদের মতে, বাংলাদেশে এখনও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়নি।(বদরুদ্দীন উমর, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাষ্ট্রধর্ম)
... পাকিস্তানের ওলামা নেতৃত্বাধীন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলাের অধিকাংশ কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরােধীতা, শাসনতান্ত্রিক অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষ সহায়তাদান ইত্যাদি স্বাধীনতা পরবর্তীকালে গঠিত বাংলাদেশ সরকারকে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ গ্রহণ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণে অনুপ্রাণিত করে। ফলে বাংলাদেশের ওলামাদের ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আইনত নিষিদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পূর্ববাংলার স্বায়ত্বশাসন আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে আলিমদের ভুমিকা যাই হােক না কেন বাংলাদেশের সাধারণ মুসলিম জনগণের ওপর ইসলাম ও আলিমগণের আবেদন সবসময় বিরাজমান ছিল। জনগণের এ ধর্মানুভূতিকে কাজে লাগানোর জন্য স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে ও স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকারকেও চেষ্টিত দেখা যায়। আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য বিবৃতি ও আওয়ামী লীগ সরকারের কার্যক্রমে এ বিষয়ক বহু প্রমাণ পাওয়া যায়।
পাকিস্তানের বিভিন্ন সরকারের ন্যায় আওয়ামী লীগ সরকারও ঘােষণা করে যে, বাংলাদেশের সংবিধান ও কোন আইন কোরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী হবে না। ১৯৭২ সালে বন্ধ করে দেওয়া ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই পূন: প্রতিষ্ঠিত হয়। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী রাজনীতির সমর্থক ওলামা সংগঠন ‘আওয়ামী উলামা পরিষদ’কে বৈধভাবে কাজ চালাতে দেওয়া হয়। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার সময়েও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সমর্থক ওলামা ও রাজনৈতিক কর্মীগণ বিভিন্ন নামে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তােলা, এসব সংগঠনের মাধ্যমে দেশব্যাপী 'মিলাদুন্নবী’, ‘সিরাত মাহফিল’ ইত্যাদির আয়ােজন করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অনুসারী ওলামা ও রাজনৈতিক কর্মীগণ সংগঠিত হতে থাকে।
আওয়ামী লীগ সরকারের দ্রুত জনপ্রিয়তা হ্রাসের অন্যান্য কারণগুলাের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্ৰীয় আদর্শ ও ভারতের প্রতি দূর্বলনীতি গ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার যে উদ্দেশ্যেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্ৰীয় আদর্শরূপে গ্রহণ করুক না কেন বাংলাদেশের ব্যাপক ধর্মনিষ্ঠ (সাম্প্রদায়িক নয়) জনগণের নিকট তা সমাদৃত হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) নিহত হলে তাঁর দীর্ঘদিনের সহচর খােন্দকার মােশতাক আহমদ ক্ষমতাসীন হন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জেনারেল জিয়াউর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জেনারেল জিয়া বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় আবেগ অনুধাবনে সক্ষম হন। তাঁর শাসনামলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। সংবিধান, রাষ্ট্ৰীয়নীতি ও সরকারের কার্যক্রমে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধৰ্মানুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা ও মর্যাদা জ্ঞাপক নানা কার্যক্রম গৃহীত হয়। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি ও ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনের ফলাফল একথা প্রমাণে সহায়ক হয় যে, জিয়ার ধর্মানুসারী সিদ্ধান্তসমূহ ও অন্যান্য কার্যক্রম জনমনে ব্যাপক আবেদন সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছিল।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হলে বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং জিয়া প্রদর্শিত পথে দেশ চালাতে সচেষ্ট হন। ১৯৮২ সালে আর একটি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে প্রেসিডেন্ট এরশাদ জিয়ার নীতি অনুসরণ করেছেন বলে অনেকে মনে করে থাকেন। ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকার সংবিধানের অষ্টম সংশােধনী এনে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ধর্মরূপে ঘােষণা করেন। মূলত: ঐতিহ্যবাহী আলিমদেরকে সন্তুষ্ট করে নয়া ঐতিহ্যবাহী আলিমদেরকে তথা ধৰ্মীয় পুনর্জাগরন বা পুনরুত্থানবাদী রাজনীতিকে প্রতিহত করতে জিয়া ও এরশাদ একই নীতি অনুসরণ করেছেন বলে মনে হয়। জিয়া আমলে তৎকালীন বিমান বাহিনী প্রধান এম. এ. জি, তােয়াব বিভিন্ন নয়া ঐতিহ্যবাদী (মৌলবাদী বলেও পরিচিত) ধর্মীয় গ্রুপের সহায়তায় বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘােষণার চেষ্টা করছেন বলে গুজব রটলে তােয়াবকে অপসারণ করে দেশত্যাগে বাধ্য করেন। এরশাদ ঐতিহ্যবাহী ওলামাদেরকে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করলেও নয়া ঐতিহ্যবাদীদেরকে প্রতিহত করতে চান।
১৯৭৭ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হলে পাকিস্তান আমলের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশ পুনর্গঠিত হতে থাকে। ১৯৮৪ সালের একটি রিপোর্টে বাংলাদেশে এ জাতীয় রাজনৈতিক দলের সংখ্যা অর্ধশতাধিক বলে উল্লেখ করা হয়॥”
— প্রফেসর ড. হাসান মোহাম্মদ / বাংলাদেশ : ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতি ॥ [ গ্রন্থমেলা - ফেব্রুয়ারি, ২০০৩ । পৃ: ১৩-১৭ / ৬৪-৬৬ ]

 


 (০২)
 
“... বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের কথা ঘােষিত হয়েছিল। যে আওয়ামী লীগের সরকার এই ঘােষণা করেছিল, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পটভূমিতে অবস্থিত আন্দোলনসমূহের পর্যায়ে সেই আওয়ামী লীগের ঘােষণাপত্র, কর্মসূচি ও প্রচারে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল না। আওয়ামী লীগের নেতারা প্রকাশ্যভাবেই সমাজতন্ত্রের বিরােধিতা করতেন। ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় মােসাফিরের ‘রাজনৈতিক মঞ্চে' ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পরেও সমাজতন্ত্রের সমর্থকদের “লাল মিয়া” “ছােট লাল মিয়া" ইত্যাদি বলে ব্যঙ্গ করা হত এবং “সমাজতান্ত্রিক আদর্শে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের কোনাে স্থান নাই” “সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের নামগন্ধও নাই” “ফ্যাসিবাদী আর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনাে পার্থক্য নাই” ইত্যাদি বলে সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রচার চালানাে হয়েছে। অপরদিকে আওয়ামী মুসলিম লীগ আওয়ামী লীগে রূপান্তরিত হয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে ও অসাম্প্রদায়িকতা উদারনীতির পক্ষে সরব হলেও ধর্মনিরপেক্ষতা পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানের চিন্তাধারা কখনও অগ্রসর হয়নি। অথচ অন্যান্য কয়েকটি দলের প্রচারের ফলে, এবং রাশিয়া ও চীন থেকে ইংরেজি ও বাঙলা ভাষায় রচিত সমাজতান্ত্রিক সাহিত্যের প্রচুর পুস্তকাদি দেশে প্রচারিত হওয়ার ফলে, জনসাধারণের মধ্যে সমাজতন্ত্রের প্রতি তীব্র আগ্রহ ও আকর্ষণ জেগেছিল। আর সেই সঙ্গে শিক্ষিত সমাজের একাংশে-বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ধর্মভাবমুক্ত জীবনদৃষ্টির প্রসার ঘটেছিল। এই অবস্থা লক্ষ করেই সুবিধাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে, আওয়ামী লীগ যাতে বিশ্বাস করত না — সেই সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা প্রবাসী আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্ৰীয় আদর্শ হিসেবে ঘােষণা করেছিল। স্মর্তব্য যে, এই ঘােষণা প্রথমে তারা করেছিল মুজিবনগর থেকে। এতে জনসাধারণ এক বিরাট প্রতারণার শিকার হয়।
 
আমাদের সে পর্বের প্রবন্ধ গ্রন্থাদির দিকে যদি তাকানাে যায়, তাহলে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে কিছু পুস্তক-পুস্তিকার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়; কিন্তু এইসব মতবাদের পক্ষে কিংবা এইসব মতবাদের স্বরূপ ব্যাখ্যামূলক রচনার সংখ্যা ধর্তব্যের বাইরে। অথচ প্রগতিশীল লেখকদের থেকে কাল এসব বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট কমিটমেন্ট কিংবা স্পষ্ট মতামত দাবি করেছিল। গণজাগরণের দিকে তাকিয়ে লেখকদের এই নীরবতা ও পশ্চাৎপদতায় বিস্মিত হতে হয়। একথা বললে বােধ হয় ভুল বলা হবে না যে, সমাজের বিবেক বলে কথিত এবং মহতের কাতারে দাঁড়ানাে লেখকদের এই আত্মনির্বাসন ও নীরবতাই দেশের জনসাধারণকে বহুলাংশে ঠেলে দিয়েছে প্রতারণার শিকার হওয়ার পথে। সমাজতন্ত্র আদৌ কাম্য কি-না, কাম্য হলে বাংলাদেশের বিশেষ অবস্থায় সমাজতন্ত্রের রূপ কি হতে পারে, কাম্য না-হলে সমাজতন্ত্র ঠেকানাের উপায় কি, আমাদের সমাজের ঐতিহাসিক প্রবণতা কোন্ দিকে, সমাজের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মৌলিক বিরোধ কি কি, বাংলাদেশে ধর্মের বিবর্তনের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটা কেমন, এদেশে মানুষের ধর্মজিজ্ঞাসা ও জীবনজিজ্ঞাসার বৈশিষ্ট্য কি, নতুন জীবনাদর্শের জন্য তীব্রতর সামাজিক উৎকণ্ঠা কেন জেগেছে, এই উৎকণ্ঠা মেটানাের উপায় কি, ধর্ম ছাড়া রাষ্ট্র ও জীবন চলবে কেমন করে, রাষ্ট্র সমাজ ও জীবনের অবলম্বন হিসেবে ধর্মের কোনাে বিকল্প সম্ভব কি-না এবং সম্ভব হলে তা কি - ইত্যাদি অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব কাল মহৎ প্রতিভার কাছে কামনা করেছিল। কিন্তু এই জিজ্ঞাসু, উদ্বেল, উৎকণ্ঠিত, রক্তাক্ত, বেপরােয়া কালে আমাদের প্রবন্ধ লেখকেরা মহৎ প্রতিভা তাে অনেক দূরের কথা মেধার দিক দিয়েও নিজেদের এতই দরিদ্র প্রমাণ করেছেন যে, সৎ সাহস নিয়ে তাঁরা এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হননি।
 
গণতন্ত্রের আদর্শ অনেক কাল ধরেই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু শিক্ষার মাধ্যম অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইংরেজি। আর বাঙলায় এসব বিষয়ে যেসব পাঠ্যপুস্তক প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলােতে অধিকাংশ লেখকের অর্ধ-শিক্ষার ছাপ এত স্পষ্ট যে, প্রকৃতপক্ষে সেগুলাে দ্বারা আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারে নতুন কিছু সংযােজিত হয়নি। নিতান্ত স্বল্প সংখ্যক উল্লেখযােগ্য গ্রন্থের অনুবাদে আন্তরিকতার পরিচয় আছে। কিন্তু সর্বক্ষেত্রেই মতামত বিভিন্ন কালের পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের। আমাদের দেশের বিশেষ পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রের সম্ভাবনা কতখানি কিংবা এদেশে গণতন্ত্রের রূপ কি হতে পারে সে সম্পর্কে কোনাে লেখক বাংলা ভাষায় কোনাে পুস্তক রচনা করেছেন, কিংবা কোনাে পুস্তিকা বা গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই।
 
জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের অনুসরণে আমাদের জাতীয় জীবনের পক্ষে অপ্রাসঙ্গিক কিছু নিকৃষ্ট রচনার সাক্ষাৎ পাওয়া যেতে পারে — তবে সেগুলাের অধিকাংশই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরবর্তী কালের রচনা। আজকের দিনে যে-কোনাে দেশের জাতীয় আন্দোলনে জাতির সামাজিক ইতিহাস কেবল জাতির গর্ব ও গৌরবের দিকগুলােই জাতির সামনে হাজির করে না, জাতির বর্তমান দুর্দশার ঐতিহাসিক কারণগুলােও হাজির করে, এবং সে দুর্দশার হাত থেকে অব্যাহতি লাভের ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার চিত্রও প্রকাশ করে। ইতিহাসের ক্ষেত্রে এই কালে দু-চারটি উল্লেখযােগ্য গ্রন্থ, কিছু দায় সারা রচনা এবং সরকারি অর্থের লালসায় রচিত কিছু বিকৃত ঐতিহাসিক রচনার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। দেশের বৃহত্তর শিক্ষিত লোকদের হাতে দেওয়ার উপযােগী বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য পুস্তক-পুস্তিকা কিংবা প্ৰবন্ধ কেউ রচনা করেননি। তাছাড়া জাতির ও সমাজের অতীত ও বর্তমানের একটি সমগ্র ইতিহাস আজও রচিত হয়নি। অথচ বাংলাদেশের রাষ্ট্ৰীয় আদর্শ হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের ঘােষণার সঙ্গে সঙ্গেই চতুর্স্তম্ভের জয়ধ্বনি দেওয়ার মত লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীর অভাব ঘটেনি নতুন রাষ্ট্রে॥”
— আবুল কাসেম ফজলুল হক / সাহিত্য ও সংস্কৃতি ॥ [ হাফেজিয়া লাইব্রেরী - এপ্রিল, ২০০২ । পৃ: ২২৮-২২৯ ]