
‘আমি যে বাসায় কাজ করতে গিয়েছিলাম। তারা প্রায়ই আমাকে মারত। বেতন চাইলেও মারত। বলত, কিসের বেতন? তোকে টাকা দিয়ে আনছি। এখন আবার কিসের বেতন?’ গতকাল বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠের কাছে মোবাইল ফোনে এভাবেই নির্যাতনের কথা বলছিলেন ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বাসিন্দা রুনু বেগম।
রুনু বেগম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কাজের উদ্দেশ্যে ৫০ হাজার টাকা খরচ করে গৃহকর্মী ভিসায় সৌদি আরব যান। কিন্তু সেখানে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে সেপ্টেম্বর মাসেই দেশে ফেরত আসতে হয় তাঁকে। ফেরত আসার সময় কোনো অর্থ নিয়ে আসতে পারেননি। উল্টো অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসেন।
কালের কণ্ঠকে রুনু বলেন, ‘ঠিকমতো খাবার দিত না। প্রচুর নির্যাতন করত। একদিন নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারাই। তখন ওরা আমাকে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়। পরে লোকজন আমাকে উদ্ধার করে দূতাবাসে দিয়ে আসে। সেখানে দুই মাস থাকার পর দূতাবাস থেকে দেশে পাঠিয়ে দেয়।’
শুধু রুনু বেগম নয়, বিদেশে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে গিয়ে একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আরো অনেকে। সারা শরীরে নির্যাতনের চিহ্নসহ সর্বস্ব হারিয়ে ফিরেছেন তাঁরা।
আত্মহত্যার ঘটনাও কম নয়। লাশ হয়ে ফিরেছেন কেউ কেউ। মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার বাসিন্দা আসমা বেগম ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরব পাড়ি দেন। কিন্তু আট মাসের মধ্যে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন তিনি। কালের কণ্ঠকে আসমা বেগম বলেন, ‘ঠিকমতো খাবার দিত না। প্রচুর পরিমাণে কষ্ট করতে হতো। চুরির অভিযোগ এনে মারধর করত। কান্নাকাটি করলেও থামত না। মারতেই থাকত। পরে আর না পেরে পালিয়ে গিয়েছিলাম। সৌদি পুলিশ উদ্ধার করে কিছুদিন জেলে রাখে। এরপর দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে পাঠিয়ে দেয়। বেতনও ঠিকমতো পাইনি। পুরো খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।’
রুনু বেগম ও আসমা বেগমের মতো ভালো উপার্জনের আশায় বছরে ৫০ হাজারেরও বেশি নারীকর্মী বিদেশে পাড়ি দিয়ে থাকেন। এমনকি কয়েক বছর লাখেরও বেশি নারীকর্মী বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। বাংলাদেশ জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ১৯৯১ সাল থেকে বিদেশে নারী কর্মী পাঠায় বাংলাদেশ। সে সময় থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৪৯ জন নারী কর্মী বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। এর মধ্যে আট লাখ ৮৬ হাজার ১৫২ জন সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পাড়ি জমিয়েছেন। এই দেশগুলোতে মূলত গৃহকর্মী ভিসায় নারীকর্মীদের নেওয়া হয়। আর এই ভিসায় যাওয়া নারীকর্মীদের অতিরিক্ত কাজের চাপ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। নির্যাতনের শিকার হয়ে নারীকর্মীরা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন। তবে এই রকম নির্যাতনের শিকার হয়ে কতজন নারীকর্মী ফিরে এসেছেন তার কোনো হিসাব বাংলাদেশ সরকারের কাছে নেই।
অভিবাসনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শোভন কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা ও শারীরিক-মানসিকভাবে নির্যাতন শুধু নারীকর্মীদের ফেরত আসতে বাধ্য করছে না, এর পাশাপাশি বিদেশে নারীকর্মী যাওয়াও কমে গেছে। এ জন্য ভুক্তভোগী নারীকর্মীদের আত্মহত্যা, খুনের শিকার হওয়া, অদক্ষতা এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অনিচ্ছাও দায়ী।
অভিবাসনসংশ্লিষ্টদের নারীকর্মী কমে যাওয়ার অভিযোগ ও বিএমইটির তথ্য দুটোরই মিল পাওয়া গেছে। বিএমইটির তথ্যও বলছে, দুই বছর ধরে নারীকর্মী কমে যাওয়ার রেকর্ড তৈরি হচ্ছে।
১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২ লাখ ৪৩ হাজার ১৮৮ জন নারী বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল ও ২০২২ সালে লাখেরও বেশি নারীকর্মী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। সে তুলনায় ২০২৩ ও ২০২৪ সালে যথাক্রমে ৭৬ হাজার ১০৮ জন ও ৬১ হাজার ১৫৮ জন নারী কর্মী গেছেন।
শধু শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতন নয়, দক্ষতার ঘাটতির কারণেও নারীকর্মী কমছে বলে জানান তৃণমূল অভিবাসীদের সংগঠন অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘নারীকর্মী কমার পেছনে প্রথম কারণ হচ্ছে, আমরা আরব দেশগুলোতে শুধু গৃহকর্মী হিসেবে নারীকর্মী পাঠাই। এই গৃহকর্মীদের যে দক্ষতার কথা বলি, সেই দক্ষতার জায়গা থেকে তাদের দক্ষতা অন্য দেশের কর্মীদের চেয়ে কম। ফলে এখন আরব দেশগুলো নতুন দেশ হিসেবে আফ্রিকার কিছু দেশ থেকে গৃহকর্মী নিচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের নারীকর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হলে গৃহকর্মী সেক্টরের বাইরে নারীদের নিয়ে আসতে হবে। অন্যান্য যে সেক্টর রয়েছে সে সেক্টরগুলোতে কিভাবে নারীকর্মী যেতে পারে তার কৌশল খুঁজে বের করে নারীদের সেই সেক্টরের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। এটাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।’
চলতি বছর গেছে ১০ হাজার ৩৬১ জন
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজার ৩৬১ জন নারী শ্রমিক বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবে গেছে সাত হাজার ৯৮০ জন। আর জর্ডান গেছে এক হাজার ৫০৬ জন। বাকি ৮৭৫ জন নারীকর্মীর মধ্যে কাতারে ৪০১ জন, কুয়েতে ১৭৫ জন, যুক্তরাজ্যে ৬০ জন, সংযুক্ত আরব-আমিরাতে ৪৮ জন, হংকংয়ে ৪০ জন, জাপানে ৩৬ জন, সিঙ্গাপুরে ১৬ জন, ইতালিতে ১৩ জন, সাইপ্রাসে ১২ জন, লিবিয়াতে ১২ জন, দক্ষিণ কোরিয়ায় চারজন ও ব্রুনাইয়ে দুজন। এ ছাড়া অন্যান্য দেশে ৫৬ জন নারীকর্মী গেছে।