Image description

সাত বছরের শিশু আরাধ্য বিশ্বাস; ১৮ বছরের কলেজছাত্রী তাসনিয়া ইসলাম প্রেমা এবং আরাধ্যর মামাতো ভাই দুর্জয় কুমার বিশ্বাস (১৮)—তিনজনই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া এলাকায় ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত তাঁরা। ওই দুর্ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ওই দুর্ঘটনায় আরাধ্য বিশ্বাসের মা সাধনা বিশ্বাস ও বাবা দিলীপ বিশ্বাস মারা গেছেন। একইভাবে ঢাকার মিরপুরের তাসনিয়া ইসলাম প্রেমা হারিয়েছেন তাঁর মা লুৎফুন নাহার সুমি (৩৫), বাবা রফিকুল ইসলাম শামীম (৪৬), দুই বোন আনিশা আক্তার (১৪) ও লিয়ানা (৮), ফুফাতো বোন তানিফা ইয়াসমিন (১৬) এবং দাদা (শামীমের মামা) মুক্তার হোসেনকে (৬০)। আরাধ্যর মতো প্রেমাও এখন একা, বড় একা—হাসপাতালের আইসিইউতে, পৃথিবীতে।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে চমেক হাসপাতালের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, একটি শয্যায় ঘুমিয়ে রয়েছে শিশু আরাধ্য। তার দুই পায়ে প্লাস্টার। পা দুটো টানা দেওয়া। হাতে পুশ করা স্যালাইন। দুর্ঘটনার ব্যথার সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্যানুলার ব্যথাও। পাশে বসে তার দেখভাল করছেন স্বেচ্ছাসেবীরা।

চিকিৎসকেরা বলছেন, এখনো শঙ্কামুক্ত নয় শিশুটি (আরাধ্য)। পরে দুপুরে তাকে নেওয়া হয় আইসিইউতে।

আর আগে থেকেই আইসিইউতে লড়ছেন কলেজছাত্রী তাসনিয়া ইসলাম প্রেমা।

এদিকে ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে আরাধ্যর বিপরীত পাশের একটি শয্যায় চিকিৎসাধীন তার মামাতো ভাই দুর্জয় কুমার বিশ্বাস। তাঁর বাঁ হাত ও ডান পায়ে বড় ধরনের চিড়। মাথায় আঘাত রয়েছে। কুষ্টিয়ার একটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র দুর্জয়।

চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, আরাধ্য ও প্রেমার অবস্থা ভালো নয়। আরাধ্য গত বুধবার কথা বলেছিল, কিন্তু বৃহস্পতিবার কোনো কথা বলেনি। তবে ডাকলে সাড়া দিচ্ছে। আর প্রেমার অবস্থা আগে থেকেই খারাপ ছিল। এখনো অপরিবর্তিত। দুর্জয়ও শঙ্কামুক্ত নন।

এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলীম উদ্দীন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আহতদের মধ্যে আরাধ্য ও প্রেমার অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয়। তাদেরকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে। আরাধ্যর হাড় (পায়ের) ভেঙে গেছে। মাথায়ও আঘাত রয়েছে। আমরা চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি।’

পরিচালক আরও বলেন, একজন স্বাভাবিক মানুষ যেভাবে রেসপন্স করে, আরাধ্য তার চেয়ে অর্ধেক রেসপন্স করছে। তবে ডাকলে সাড়া দিচ্ছে।

চমেক হাসপাতালের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা বলেন, আরাধ্যর দুই পা ভেঙে গেছে। মাথায়ও আঘাত পেয়েছে। আর দুর্জয়ের হাত ও পা ভেঙেছে। সাত দিন পর পরবর্তী অবস্থা জানা যাবে।

দুর্ঘটনার খবর শুনে ঝিনাইদহের শৈলকুপা থেকে আসা আরাধ্যর কাকা অসিত কুমার জানান, গতকাল বেলা দেড়টার দিকে আরাধ্যকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। আরাধ্যর চিকিৎসা আপাতত চট্টগ্রামে চলবে। পরে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্ঘটনা পুরো পরিবারকে তছনছ করে দিয়েছে।

এ দিকে সকালে আইসিইউর সামনে কথা হয় প্রেমার ছোট মামি জেসমিন রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘খুবই খারাপ অবস্থা ভাগনির। ঢাকায় যে নিয়ে যাব, সে অবস্থাও নেই। হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে এখনো সাড়া দেয়নি। চিকিৎসকেরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাঁরা দোয়া করতে বলেছেন। আমাদের চোখের সামনে শুধুই অন্ধকার।’

অন্যদিকে হাসপাতালে আরাধ্যর মামা বিধান মন্ডল বলেন, আরাধ্যর মা-বাবার লাশ নিয়ে যাওয়া এবং আরাধ্যর চিকিৎসার জন্য তাঁকে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে।

গতকাল বুধবার সকালে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়ার জাঙ্গালিয়ায় বাস ও দুটি মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে দুই দম্পতিসহ ১০ জন নিহত হন। ঘটনাস্থলে মারা যান আরাধ্যর মা-বাবা।

নিহত ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত করে দোহাজারী হাইওয়ে থানার ওসি শুভরঞ্জন চাকমা জানান, এর মধ্যে একই পরিবারের ছয় সদস্য রয়েছেন। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

নিহতরা হলেন—ঝিনাইদহের শৈলকুপা এলাকার দিলীপ বিশ্বাস (৪৩) ও তাঁর স্ত্রী সাধনা মন্ডল (৩৭), সাধনার বড় ভাই আশীষ মন্ডল (৫০), ঢাকার মিরপুরের রফিকুল ইসলাম শামীম (৪৬) ও তাঁর স্ত্রী লুৎফুন নাহার সুমি (৩৫), বড় মেয়ে আনিশা আক্তার (১৬), ছোট মেয়ে লিয়ানা (০৮), ভাগনি তানিফা ইয়াসমিন (১৬), মামা মুক্তার হোসেন (৬০) এবং মাইক্রোবাসের চালক ইউসুফ আলী (৫৫)। তাঁদের মধ্যে আশীষ ও আনিশার মৃত্যু হয়েছে চমেক হাসপাতালে।

বুধবার বিকেলে জাঙ্গালিয়ার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম। এ সময় উপদেষ্টা সেখানকার সড়কের অসংগতি চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন।

এরপর বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে চমেক হাসপাতালে আহতদের দেখতে যান উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম ও সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ সময় তাঁরা আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।