
আগামী নির্বাচনে কমপক্ষে ২৭টি আসনে বিএনপির সমর্থন পেতে চায় ৯টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট। এ জন্য নির্দিষ্ট আসনে তৎপরতা চালাচ্ছেন জোটের সংশ্লিষ্ট দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা।
কোনও কোনও আসনে বিএনপির গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছেন বলে দাবি তাদের। যদিও এ বিষয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, নির্বাচনের তারিখ হওয়ার আগে আসন চাওয়া ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার শামিল।
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি’র চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামন ফরহাদ। এই জোটের মাত্র একটি দল মুসলিম লীগ-বিএমএল ছাড়া বাকি ৮টির দলেরই নিবন্ধন নেই। অধিকাংশ দলই ব্র্যাকেটবন্দি। তারপরও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন। বিএনপিও তাদের সঙ্গে নিয়মিত লিয়াঁজো রক্ষা করেছে। ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এই জোটের সঙ্গে ঐক্য ধরে রেখেছে দলটি। আগামী নির্বাচনে এসব দলের প্রতি বিএনপি কতটা উদারতা দেখাবে, এটি খোলাসা হতে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে বলে জানান জোটের নেতারা।
ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) সূত্র জানায়, তারা বিএনপির কাছে কমপক্ষে ৫টি আসনে চাইবে। এর মধ্যে দলটির চেয়ারম্যান ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নড়াইল-২ (লোহাগড়া) আসনটির বিষয়ে তারা আশাবাদী। ইতোমধ্যে বিএনপিও তাকে গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছে।
অবশ্য এ ব্যাপারে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি ড. ফরহাদ। তবে বিএনপি তাকেসহ সমমনা জোটকে মূল্যায়ন করবে বলে তার প্রত্যাশা।
সর্বশেষ ২০১৮ সালে নড়াইল-লোহাগড়া আসন থেকে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন তিনি। তবে জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মোর্ত্তজার কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।
জাতীয় গণতান্ত্রিক দলের (জাগপা) একাংশের সভাপতি খন্দকার লুৎফুর রহমান জানান, তিনি বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনে গণসংযোগ চালাচ্ছেন। বিএনপি তাকে সমর্থন দেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এর বাইরেও দিনাজপুরের দুটি আসন চাইবেন বলে উল্লেখ করেন।
পূর্ব-পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর মোনায়েম খানের নাতনি ও জোটের শরিক মুসলিম লীগ বিএমএল-এর চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নাসিম খান বলেন, আগামী নির্বাচনে ৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায় তার দল। এর মধ্যে তিনি নিজে ঢাকা-১৭ (গুলশান-বনানী) ও কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসন থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এছাড়া রিজওয়ান মোর্তজা (বরিশাল-৬), আমিরুল ইসলাম বকুল সিলেট-১ (সদর) ও সুনামগঞ্জ-৫, সাকিব খান ঢাকা-১১ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর) আসনে রয়েছেন মো. আজিজুল রহমান।
বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের একাংশের সভাপতি ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, বিএনপির সমমনা জোটের কাছে ৬টি আসন চাইবে তার দল। এর মধ্যে ঢাকা-১ (দোহার-নবাবগঞ্জ) অথবা মানিকগঞ্জ-১ (শিবালয়, ঘিওর-দৌলতপুর) আসনে তিনি নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের ইফতার মাহফিল
নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে অ্যাডভোকেট ধীরেন সাহা, লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) সুরাইফুল ইসলাম মাহফুজ, চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) কনক বড়ুয়া এবং রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী) তানোর আসনে তৎপর রয়েছেন কমরেড এরশাদ।
এটিএম গোলাম মাওলা চৌধুরীর গণদল ৩ ও ক্বারি আবু তাহেরের এনডিপি ৩টি আসনে জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেতে চায়। যদিও তারা নির্দিষ্ট আসনের কথা জানাননি। আর বাকি তিনটি দলের মধ্যে এমএন শাওন সাদেকীর বাংলাদেশ ন্যাপ, খোকন চন্দ্র দাস ডিএল ও এসএম শাহাদাতের বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টি কয়েকটি আসনে গণসংযোগ করলেও এসব দলের নেতারা প্রার্থিতার বিষয়টি জানাতে পারেননি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ২৩ মার্চ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে সমমনা জোট আমাদের সঙ্গে সক্রিয় ভূমিকায় ছিল। আগামীতেও আমরা সবাইকে নিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন করতে চাই।
আর জোটের মুখপাত্র ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গত ৩ এপ্রিল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিএনপি এখনই আসন ভাগাভাগির কথা ভাবছে না। নির্বাচন যখন আসবে, তখনকার পরিস্থিতিই বলে দিবে কাকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে। এর আগে আসন চাওয়া ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার শামিল বলে তিনি মনে করেন।
২০২২ সালের ৯ ডিসেম্বর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটকে অকার্যকর করা হয়।
গুলশানে এই জোটের সর্বশেষ বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, শরিকরা চাইলে আলাদা জোট গঠন বা একক যেভাবেই হোক যুগপৎ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে পারে। ওই সময় কয়েকটি দল নিয়ে দুটি জোট গঠন হয়। একটি ১২ দলীয় জোট এবং আরেকটি জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট।
২০ দলীয় জোট ভাঙার কয়েক দিন পর একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট। শুরুতেই এর সঙ্গে ছিল ১১টি রাজনৈতিক দল।
জোটের দলগুলো হলো- ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক লীগ, বাংলাদেশ ন্যাপ, বিকল্প ধারা (নুরুল আমিন), সাম্যবাদী দল, ইসলামী ঐক্যজোট, ন্যাপ ভাসানী, গণদল পিপলস লীগ ও বাংলাদেশ সংখ্যালঘু জনতা পার্টি।
যাত্রার শুরুতেই কয়েক মাস বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে ছিল এই জোট। বিজয়নগর, প্রেসক্লাব ও পল্টনকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে একই ব্যানারে। এখন জোটে দল রয়েছে ৯টি।
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের দলগুলো হলো- ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা (খন্দকার লুৎফর রহমান), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (ব্যারিস্টার নাসিম খান), বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টি (এসএম শাহাদাত), বাংলাদেশ ন্যাপ (শাওন সাদিকী), এনডিপি (ক্বারি মো. আবু তাহের), ডেমোক্রেটিক লীগ (খোকন চন্দ্র দাস), বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের (সৈয়দ নুরুল ইসলাম ও গণদল (এটিএম গোলাম মাওলা চৌধুরী)।
বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন পথচলা জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট নেতারা জানান, বিগত দিনের মতো এখনও তাদের ঐক্য অটুট রয়েছে। ৫ আগস্টের পর সর্বশেষ ১ ফেব্রুয়ারি গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে তাদের সঙ্গে নজরুল ইসলাম খানের বৈঠক হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় আগামীতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাসহ যেকোনও আন্দোলনে তারা অতীতের মতো বিএনপির পাশে থাকবেন। সেখানে বিএনপিও জানিয়েছে তারা ক্ষমতায় গেলে শরিকদের মূল্যায়ন করবে। এছাড়াও গত ২৩ মার্চ ঢাকার একটি অভিজাত রেস্টুরেন্ট এই জোটের ইফতার মাহফিলে লন্ডন থেকে স্কাইপে যুক্ত হন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।