
দেশের বেসরকারি অনেক হাসপাতালে চিকিৎসা খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। আবার যাদের এসব হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে, তারা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে করপোরেট হাসপাতাল গড়ে উঠলেও এগুলো স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান, রোগ নির্ণয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার ও দক্ষতায় পিছিয়ে। তবে তারা বাণিজ্যিকীকরণে এগিয়ে। এতে একদিকে ব্যক্তি খাতে চিকিৎসার খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে সামর্থ্যবান রোগীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমসিএ) সভাপতি এম এ মুবিন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের করপোরেট হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার মান, প্রযুক্তি ও আস্থা আরো বাড়াতে হবে। তাহলেই চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার এই প্রবণতা বদলাতে পারে। এ ছাড়া করপোরেট হাসপাতালগুলো ঢাকাকেন্দ্রিক না করে জেলা ও বিভাগীয় শহরে যদি গড়ে তোলা যায়, তাহলে এই বিদেশমুখিতা অনেকটা কমে যাবে।
এম এ মুবিন খান বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রোগের জন্য অভিজ্ঞ স্পেশালিস্টের অভাব রয়েছে; যেমন—ক্যান্সার, লিভার ট্রান্সপ্লান্ট, কিডনি, নিউরোসার্জারি ইত্যাদিতে। জটিল অপারেশন ও রোগের ক্ষেত্রে বিদেশি চিকিৎসকরা বেশি অভিজ্ঞ ও ট্রেইনড হওয়ায় তাঁদের ওপর আস্থা বেশি।’
স্বাস্থ্যসেবায় বৈশ্বিক মানদণ্ডের স্বীকৃতি রয়েছে, দেশে এমন হাসপাতাল মাত্র দুটি। একটি ঢাকার বসুন্ধরায় অবস্থিত এভারকেয়ার, অন্যটি গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতাল। হাসপাতাল দুটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি জয়েন্ট কমিশন ইন্টারন্যাশনাল (জেসিআই) অর্জন করেছে।
জেসিআই স্বীকৃতিকে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবার স্বর্ণমান হিসেবে ধরা হয়। যেসব হাসপাতাল রোগীদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে, স্বীকৃতিটি তাদেরই দেওয়া হয়। মর্যাদাটি অর্জন করতে হাসপাতালকে হাজারেরও বেশি কঠোর মান বজায় রাখতে হয়। এর বাইরে দেশে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের অ্যাক্রেডিটেশন রয়েছে মাত্র ৯টির। এই তালিকায় রয়েছে ইউনাইটেড হাসপাতাল, ল্যাবএইড লিমিটেড, এপিক হেলথকেয়ার, প্রাভা হেলথ বিডি লিমিটেড, খাজা ইউনুস আলী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সিরাজগঞ্জ, ডিএমএফআর মলিক্যুলার ল্যাব অ্যান্ড ডায়াগনস্টিকস বিডি লিমিটেড, ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড ইমেজিং সেন্টার, পার্কভিউ ডায়াগনস্টিক সেন্টার চট্টগ্রাম ও নোভাস ক্লিনিক্যাল রিসার্চ সার্ভিসেস লিমিটেড।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারির তুলনায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার পরিসর বড়। সারা দেশে সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৬৪০ (ইউনিয়ন পর্যায় বাদে), আর অনুমোদিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে পাঁচ হাজার ৩০টি, রোগ নির্ণয় কেন্দ্র বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার ১০ হাজারের বেশি এবং ব্লাড ব্যাংক ১৯২টি।
চিকিৎসা নেওয়া রোগীরা যা বলছেন : সম্প্রতি ঢাকার একটি করপোরেট হাসপাতালে চিকিৎসা নেন ভোলার এক রোগী। নাম প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এখানকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ফি ও রোগ নির্ণয়ের খরচ ভারতের প্রায় দ্বিগুণ। আমার কাছ থেকে চিকিৎসকের ফি নেওয়া হয়েছে দুই হাজার টাকার বেশি। এমআরআই ও এক্স-রে খরচ ১৫ হাজার টাকার বেশি। অথচ ভারতে চিকিৎসকের ফি এক হাজার ৪০০ টাকা এবং একই পরীক্ষার ফি নিয়েছে ১০ হাজার টাকা।
সম্প্রতি আরেকটি হাসপাতালে স্বামীর হার্টে রিং পরানোর অভিজ্ঞতার কথা জানান বেসরকারি টিভির এক সংবাদ উপস্থাপিকা। তিনি বলেন, ‘ওই হাসপাতালে আমি শুধু ডাক্তারের জন্য ছিলাম। এটি মিসম্যানেজমেন্টে ভরা। কমিউনিকেশনে অপারদর্শী। কারো মুখে এতটুকু ভরসার হাসি নেই, যা দেখলে সব ভয় কেটে যায়। শুধু সুন্দর হাসতে পারে বলেই সম্ভবত আমরা বিদেশি হাসপাতালগুলোতে যাই। ওদের হাসি দেখলেই শরীর অর্ধেক ভালো হয়ে যায়।’
মানের কারণে অনেকে বাড়তি খরচ করছেন : রোগীদের এমন অভিযোগের বিষয়ে এম এ মুবিন খান অবশ্য ভিন্ন মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, অনেকের ধারণা যে বাংলাদেশে জটিল চিকিৎসা বেশি ব্যয়বহুল, যা আসলে বিদেশে অধিক ব্যয়বহুল। তবে মানের কারণে অনেকে সেই বাড়তি খরচ করতে রাজি থাকেন। এ ছাড়া বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া সামাজিক মর্যাদা হিসেবে বিবেচিত হয় অনেকের কাছে। অনেক সময় পরিবারের কেউ বিদেশে থাকলে তাঁর পরামর্শে সেখানে চিকিৎসা নিতে যান।
তিনি বলেন, ‘বিদেশে উন্নতমানের চিকিৎসা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি মানুষকে আকর্ষণ করে। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা মনে করেন, বিদেশে চিকিৎসা করালে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য সেবা পাবেন। বাংলাদেশে কিছু হাসপাতাল উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও সবখানে এর প্রাপ্যতা নেই।’
এম এ মুবিন খান বলেন, ‘বিদেশের হাসপাতালগুলোতে রোবটিক সার্জারি, জিনোম সিকোয়েন্সিং ইত্যাদির মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বেশি। বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে পোস্ট-অপারেটিভ ফলোআপ সেবার মান ততটা উন্নত নয়। অথচ বিদেশি হাসপাতালগুলোতে সেবার শৃঙ্খলা এবং রোগীর প্রতি যত্নশীলতা বেশি। এ ছাড়া অনেকের বিদেশে মেডিক্যাল ইনস্যুরেন্স থাকে, যা বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া সহজ করে দেয়।’
রোগী টানতে ঢাকায় দপ্তর : বিদেশমুখো রোগীদের চাপ বেশি থাকায় ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের কয়েকটি হাসপাতাল তাদের দপ্তর খুলেছে ঢাকায়, যারা মূলত কমিশনের বিনিময়ে রোগীদের বিদেশে পাঠিয়ে থাকে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বিদেশি অনেক চিকিৎসক সেবা দিচ্ছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী দেশসহ একাধিক দেশের একটি শক্তিশালী মার্কেটিং নেটওয়ার্ক এখানে সক্রিয় রয়েছে। এরা একদিকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য উৎসাহিত করছে, অন্যদিকে বাইরের দেশ থেকে চিকিৎসক আনছে; যদিও তারা তেমন ভালো মানের চিকিৎসা দিতে পারছে না। বরং তাদের পক্ষে ব্যাপক প্রচার-প্রপাগান্ডার মাধ্যমে মানুষকে ভুল তথ্য দেওয়া হচ্ছে।’
বিদেশি এসব হাসপাতাল অতিরিক্ত মুনাফার আশায় রোগীদের সঙ্গে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে থাকে বলে অভিযোগ এই চিকিৎসকের। ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘ভারতে চিকিৎসা করালে বাংলাদেশের সব পরীক্ষা যে ভুল বা ভুয়া, সেটা প্রথমেই বলে। আরো বলে, এটা কী চিকিৎসা দিয়েছে? এটা তো কোনো চিকিৎসা না! এমন নেতিবাচক মন্তব্য করে দেশের চিকিৎসার প্রতি আস্থা নড়বড়ে করে দেয়। দেশে ফেরার পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মিলিয়ে দেখা যায়, যে ওষুধটি বাংলাদেশের ডাক্তার দিয়েছিলেন, সেই ধরনের ওষুধই কিন্তু ভারত থেকে দেওয়া হয়েছে।’