Image description

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র পদে যোগ দেবেন কিনা—এমন আলোচনার মধ্যে দলের সর্বোচ্চ নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে লন্ডনে পৌঁছেছেন প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। বুধবার (২ এপ্রিল) স্থানীয় সময় সকালে তার সেখানে পৌঁছানোর কথা। ইশরাক হোসেনের এই লন্ডনযাত্রার পেছনে ডিএসসিসির মেয়র হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন কিনা, এই প্রশ্নটিই এখন সামনে।

গত বৃহস্পতিবার (২৭ মার্চ) ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ফল বাতিল করে সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে রায় দেন ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ ও নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. নুরুল ইসলাম।

এরপর রাজনৈতিক মহল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রায়ের পক্ষে-বিপক্ষে মত প্রকাশ হলে পরদিন (২৮ মার্চ) শুক্রবার সাংবাদিকদের সামনে ইশরাক হোসেন বলেন, ‘তারা (সমালোচকরা) ফোকাস করছে বিএনপির প্রার্থী মেয়র পদে যাচ্ছেন। আমরা যে একটি আইনি উদাহরণ ও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেলাম সেটার জন্য তাদের আমাদের ধন্যবাদ দেওয়া উচিত ছিল। এটি এ কারণে যে একটা আইনের শাসনের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এটা হলো আমাদের মূল উদ্দেশ্য, মূল লক্ষ্য।’

তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমি কিন্তু হারি নাই। আমাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব সেটা কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠা পাক, সেটাই ছিল আমাদের লক্ষ্য ছিল।’

এরপর জল্পনা শুরু হয় আসলে ইশরাক হোসেন মেয়র পদে দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহী। বিশেষ করে ২০২০ সালের সিটি নির্বাচনকে যেখানে দলের পক্ষ থেকেই অবৈধ নির্বাচন হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে, সেই নির্বাচনের ফল ভোগ করতে তিনি রাজি নন। তবে দলের নীতিনির্ধারকরা চাইছেন, ইশরাক হোসেন ডিএসসিসির মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করুক।

বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের নেতা ও দায়িত্বশীলরা জানান, বেশ কয়েকটি বিষয়কে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে যাচ্ছেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। এ ক্ষেত্রে ইশরাক হোসেনের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে কয়েকটি প্রসঙ্গ যুক্ত। মাঠের জনমত বিভক্ত হলেও এনসিপি সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টার তত্ত্বাবধানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের তথ্য পাওয়ায় কৌশলগত কারণে মেয়র পদে নিযুক্তির পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন শীর্ষ নেতৃত্ব।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার এক বক্তব্যে রায়কে আদালতের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি ও মেয়র পদে যাওয়ার বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত হবে বলে জানালেও এই রায়ের পেছনে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কোনও পক্ষের অবদান আছে কিনা, তাও পরীক্ষা করে দেখছে বিএনপি। আর এই কারণেই সব দিক খোলাখুলি আলাপ করতে তারেক রহমানের শরণাপন্ন হয়েছেন ইশরাক হোসেন।

বুধবার (২ এপ্রিল) বিকালে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন বুধবার সকাল ৭টার ফ্লাইটে ঢাকা থেকে লন্ডন গেছেন। আশা করা যাচ্ছে তিনি বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাতটার পর পৌঁছাবেন।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য একাধিক দায়িত্বশীল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তারেক রহমানের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রথমত, ডিএসসিসি ‘রাজধানী’ হওয়ায়; ঢাকার আদি অঞ্চল; সাদেক হোসেন খোকার সন্তান; পাশাপাশি ইশরাক হোসেন দলের নতুন প্রজন্মের নেতা; এই বিষয়গুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখবে।

‘এছাড়া বর্তমান সরকারপ্রধান ও সরকার—একেবারেই এক, তা নয়। রায় প্রদানে ভিন্ন কোনও উদ্দেশ্য আছে কিনা, এটিও খতিয়ে দেখার পক্ষে নেতৃত্ব’, বলেন একজন দায়িত্বশীল।

আরেকজনের ভাষ্য, ‘সরকারে ছাত্র প্রতিনিধি ও একইসঙ্গে একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য সাতশত প্রার্থীর তালিকা প্রস্তুত করেছেন; তারা লোকাল নির্বাচন আগে চায়; এসব বিষয়ও ইশরাক হোসেনের মেয়র পদে দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে আমলে নেওয়া হচ্ছে।’

‘ফলে, কৌশলগত কারণে মেয়র পদ গ্রহণ বা বর্জন; যাই হোক তা সুষ্ঠু মতামতের ভিত্তিতে দিতে হবে, আবেগতাড়িত হয়ে নয়, এমনই মনে করা হচ্ছে’ বলে মন্তব্য একজন নির্ভরযোগ্য দায়িত্বশীলের।

এ বিষয়ে মির্জা আব্বাসের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য অনেকটা ইঙ্গিতবহ। গত রবিবার (৩০ মার্চ) ইশরাক হোসেন মির্জা আব্বাসের বাসায় গেলে সেখানে তিনি বলেন, ‘প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকা আমার বন্ধু ছিল। ইশরাক আমার সন্তানের মতো। আমি বিশ্বাস করি, ইশরাকের নেতৃত্বে ঢাকা সিটি করপোরেশন ঘুরে দাঁড়াবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নগরবাসীর দীর্ঘদিনের নাগরিক সমস্যা, যানজট, ড্রেনেজ, স্যুয়ারেজ, অবৈধ দখলমুক্ত করে নাগরিক জীবনে সব সুবিধা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ ভোট কারচুপি করে ইশরাকের জয় ছিনিয়ে নেয়। আদালতের মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়েছে।’

মেয়র পদে নিজের অবস্থান কী, জানতে গত কয়েক দিনে একাধিকবার ইশরাক হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলা ট্রিবিউন। যদিও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বুধবার (২ এপ্রিল) বিকালে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আদালতের রায়ের পর ইশরাক হোসেন কী বলেছেন, সেটা তিনিই বলতে পারবেন। আমি মনে করি তিনি প্রার্থী হিসেবে মামলা করেছেন, সিদ্ধান্তও তিনি এককভাবে নেবেন। মামলা তো দল করেনি। সেক্ষেত্রে তিনি এককভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন পদ গ্রহণ করবেন কিনা।’

একইসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘ইশরাক হোসেন দলের প্রার্থী হিসেবে সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।’

প্রকৌশলী ইশরাকের একাধিক ঘনিষ্ঠজন এই প্রতিবেদককে জানান, সিটি মেয়র হিসেবে ইশরাক হোসেন আইনি রায় পেলেও মূলত এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি দলের ওপরই আস্থা রাখছেন। ব্যক্তিগতভাবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা থেকে তিনি নিবৃত্ত থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্তই তিনি গ্রহণ করবেন বলে মনে করেন ঘনিষ্ঠরা।

পদ গ্রহণে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা

২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর বিএনপি বলেছিল কোনও ভোটই হয়নি। যদিও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১ অক্টোবর ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেনকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে আদালতের রায়ের পর বিএনপি সেই বিষয়টিতে কোনও মন্তব্য করেনি। শাহাদাত হোসেন নগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক।

বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছে, সারা দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র, ৬০টি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সারা দেশের সব উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, নারী ভাইস চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়রদের অপসারণ করে চট্টগ্রামে ও ডিএসসিসিতে বিএনপির প্রার্থীদের আদালতের রায়ের মাধ্যমে জেতানোর বিষয়টি স্পষ্ট নয়।

সূত্র জানায়, প্রথমত সরকারের ভেতরে এই বিষয়ে কী এজেন্ডা, তা বিএনপির নেতৃত্ব স্পষ্ট হয়ে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি। যেখানে সারা দেশে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা বহিষ্কারের শিকার, সেখানে বিএনপির দুই জনকে জেতানোর পেছনে আসলে কী, তা আগে স্পষ্ট হতে হবে। কোনও বিশেষ কারণ ছাড়া চট্টগ্রামে শাহাদাত হোসেন মেয়র পদ গ্রহণ করায় রাজনৈতিক মহলে নেতিবাচক অবস্থা তৈরি হয়েছে বলেও মনে করে সূত্রটি।

ঢাকার একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ইশরাক হোসেন ব্যক্তিগতভাবে না চাইলেও নানা পক্ষের চাপ রয়েছে পদ গ্রহণের। কিন্তু এক্ষেত্রে লক্ষণীয়, মেয়র পদ গ্রহণ না করলে দীর্ঘমেয়াদে এর ইতিবাচক ফল আসবে। উপরন্তু যদি আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করে মেয়র পদ নেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে সাময়িকভাবে লাভ হতে পারে। কারণ, বিগত আওয়ামী লীগের সরকারের সময়েও বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, আদালতকে ব্যবহার করে সরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।

‘এটা ভীষণ সাংঘাতিক, বিপদের ঘনঘটা’ বলছিলেন সরকারের একটি কমিশনের প্রভাবশালী একজন সদস্য। নাম ও পরিচয়ে উদ্ধৃত না হয়ে বুধবার সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য যে সবাই-ই খুশি করার জন্য, আনুগত্য প্রকাশের জন্য কাজ করে থাকি। ওই দুটো নির্বাচন যেখানে বাতিল করার যৌক্তিকতা বেশি সেখানে মেয়র পদে আসীন করার বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক।’

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘এখানে কোনও ক্ষতির কিছু নেই। প্রথমত আদালতের রায় এসেছে, বিএনপি সব সময় আইনের ওপর শ্রদ্ধাশীল। ইশরাক হোসেন মেয়র পদে যাবেন কিনা, সেটা দলীয় সিদ্ধান্ত। এখানে ওই নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে, চুরি হয়েছে এবং ওই নির্বাচনের পরই আদালতে মামলা হয়েছে। ওই ধারাবাহিকতায় মামলায় রায়ে প্রমাণিত হয়েছে ওটা জালিয়াতি ছিল। জোর করে হস্তক্ষেপ করে নির্বাচন হয়েছিল। এখন মেয়র পদে জয়েন করবে কিনা, সেটা দল সিদ্ধান্ত নেবে।’

প্রসঙ্গত, ২০২০ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে প্রার্থিতা করেন তাবিথ আউয়াল। নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে ওই নির্বাচন নিয়েও মামলা রয়েছে।