
সকল দেশের পণ্যে গড়ে ন্যূনতম ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা জল্পনা-কল্পনা হয়েছে। বুধবার তার অবসান ঘটালেন তিনি। ক্ষমতায় বসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের যে হুমকি দিয়ে আসছিলেন এবার তারই বাস্তব রূপ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যাকে তিনি রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক বলে অভিহিত করেছেন। অন্যান্য দেশ মার্কিন পণ্যের ওপর অন্যায্যভাবে যে শুল্ক আরোপ করে তার ব্যবধান কমাতেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।
এ খবর দিয়ে অনলাইন এনডিটিভি বলছে, ট্রাম্পের এই উচ্চ শুল্ক নীতি সেসব দেশকে বেশি ধাক্কা দেবে যারা যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানির চেয়ে সেখানে অধিক পরিমাণে রপ্তানি করছে। তবে শুল্ক আরোপে ট্রাম্পের এই নীতিকে সমর্থন করছেন না অর্থনীতিবিদরা। মূলত এর মাধ্যমে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাপে ফেলা হচ্ছে। যার মাধ্যমে ভোক্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে এর মাধ্যমে অন্যান্য দেশগুলোকে আলোচনার টেবিলে বসাতে পারবে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরোপ করা শুল্ক কমাতে বাধ্য হবে অন্যান্য দেশ।
ট্রাম্পের শুল্ক নীতি নিয়ে বেশ কয়েকটি জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। এখানে সেগুলো তুলে ধরা হলো।
সরকার কর্তৃক আদায় করা শুল্ক কি সাধারণ রাজস্ব তহবিলে যায়? আর ট্রাম্প কি তদারকি ছাড়াই সেই তহবিল থেকে অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন?
মূলত বিদেশী কোনো পণ্য যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে তখন সেই পণ্যের শুল্ক সংগ্রহ করে দেশটির কাস্টমার অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশন এজেন্সি। গত বছর ফেডারেল সরকারের ব্যয় মেটাতে মার্কিন কোষাগারে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার দেয়া হয়। এই অর্থ ব্যয়ে হস্তক্ষেপের এখতিয়ার রাখে মার্কিন কংগ্রেস। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ নিয়ন্ত্রণ করছে রিপাবলিকানরা। ট্রাম্প শুল্ক আদায়ের মাধ্যমে ট্যাক্স কর্তন কার্যক্রমে সহায়তা করতে চান। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই কর কর্তন ধনী মানুষদের সুবিধা দেবে। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক নিরপেক্ষ একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক হচ্ছে ট্যাক্স ফাউন্ডেশন। তারা দেখেছে ট্রাম্পের কর কর্তনের মেয়াদ বাড়ানোর ফলে ২০২৫ সাল থেকে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত দেশটির ফেডারেল রাজস্ব ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার হ্রাস পাবে। কর কমানোর ক্ষতিপূরণ হিসেবে অধিক শুল্ক আরোপ করে লাভবান হতে চান ট্রাম্প। ট্যাক্স পলিসি সেন্টার নামের আরেকটি থিঙ্ক ট্যাঙ্কও একই কথা বলছে। প্রথম মেয়াদের মতো ট্রাম্প কর কর্তনের মেয়াদ বৃদ্ধি করলে সকল আমেরিকান লাভবান হবে ঠিকই, তবে ধনীরা আরও বেশি সুবিধা পাবে।
শুল্ক নীতির ফলে মূল্য বৃদ্ধিতে কেমন সময় লাগবে?
এ বিষয়টি নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার অংশীদারদের প্রতিক্রিয়ার ওপর। তবে শুল্ক আরোপের এক-দুই মাসের মধ্যে গ্রাহকরা সামগ্রিকভাবে মূল্য বৃদ্ধি দেখতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মেক্সিকান পণ্যের ওপর শুল্ক কার্যকর হলেই পণ্যের মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। কিছু মার্কিন খুচরা ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য আমদানিকারকরা শুল্কে ব্যয়ের একটি অংশ আদায় করতে পারে। আর বিদেশি রপ্তানিকারকরা অতিরিক্ত শুল্ক পূরণের জন্য পণ্যের উৎপাদন মূল্য কমাতে পারে। তবে বেশ কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এই নীতি বুমেরাং হতে পারে। যেমন ইউরোপীয়ান পণ্যে ট্রাম্প যে ২০ শতাংশ শুল্ক দিয়েছেন, তাতে এমনটা হতে পারে। এছাড়া পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে কোম্পানিগুলো শুল্ককে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে পারে। ২০১৮ সালে ট্রাম্প যখন ওয়াশিং মেশিনের ওপর শুল্ক আরোপ করেছিলেন তখন খুচরা বিক্রেতারা এই পণ্যটির সঙ্গে ড্রায়ারেরও দাম বাড়িয়ে দেয়। যদিও ড্রায়ারের ওপর কোনো শুল্ক দেয়া হয়নি। এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে সামনের মাসগুলোতেও কি এমন কিছু ঘটবে। অর্থনীতিবিদরা এ বিষয়টি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। চার দশকের মধ্যে বড় মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনার বিষয়ে সতর্ক করেছেন তারা। এমনটা হলে আমেরিকানদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং তারা পণ্য ক্রয়ের ইচ্ছা ত্যাগ করবে। ফলত ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শুল্ক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার সীমা কতটুক? এক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভূমিকা কী?
সাংবিধানিকভাবেই কংগ্রেসকে শুল্ক নির্ধারণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে কংগ্রেস বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের কাছে এই ক্ষমতাগুলো ছেড়ে রেখেছে। যে কোনো পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউস শুল্ক আরোপ করতে পারে। যদি আমদানি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ হয় তাহলে হোয়াইট হাউস এভাবে শুল্ক দিতে পারে। আগে প্রেসিডেন্টরা সাধারণত জনমতের ভিত্তিতে শুল্ক আরোপ করতেন। আমদানিতে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হচ্ছে কিনা তা নির্ধারণ করতে এমনটা করা হতো। ট্রাম্পও তার প্রথম মেয়াদে এসব পদক্ষেপ অনুসরণ করেছেন। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প ১৯৭৭ সালের এক আইনের ভিত্তিতে জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে অস্থায়ীভাবে শুল্ক আরোপের চেষ্টা করছেন। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রে কানাডা এবং মেক্সিকো থেকে ফেন্টানাইল প্রবেশের অভিযোগে জরুরি অবস্থার কথা তুলে ধরেছেন ট্রাম্প। ফলে তিনি দেশ দুটির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক করেছেন। এক্ষেত্রে কাংগ্রেস প্রেসিডেন্টের জরুরি অবস্থার বিবেচনা বাতিল করতে পারে।
মার্কিন পণ্যের ওপর অন্যান্য দেশ কেমন শুল্ক আরোপ করছে?
সাধারণত অন্যান্য দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কম। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ব্যবসায়িক পণ্যের প্রতিফলনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্ক মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। এক্ষেত্রে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের রয়েছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ। আর চীন এবং ভারতের যথাক্রমে রয়েছে ৩ ও ১২ শতাংশ। অন্যান্য দেশগুলোতেও কৃষকদের সুরক্ষার জন্য বিদেশি পণ্যে অধিক শুল্ক আরোপ করে। যেমন, কৃষিজাত পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য শুল্ক ৪ শতাংশ, যেখানে ইইউ এর ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, জাপানের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ, চীনে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং ভারতে ৬৫ শতাংশ। ডব্লিউটিও’র পরিসংখ্যান মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক আমদানি শুল্কে ট্রাম্পের ঝড় তোলার বিষয়টি বিবেচনা না করেই করা হয়েছে।