Image description

পাসপোর্ট অধিদফতরে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে অধিদফতরের দুই জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তের তালিকায় রয়েছেন আরও কয়েকজন কর্মকর্তা। গুরুতর অভিযোগের কারণে তাদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা চলমান রয়েছে।

পাসপোর্ট অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল নুরুল আনোয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত তারা শাস্তি পাবে। এখানে দুর্নীতি করে পার পাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। যে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে এটি চলমান থাকবে।’

পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান

অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, পাসপোর্টের ডাটা অ্যান্ড পার্সোনালাইজেশন সেন্টারের পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানকে গত ৯ মার্চ সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

তিনি ২০০৪ সালে ইমিগ্রেশন এবং পাসপোর্ট অধিদফতরের একজন সহকারী পরিচালক হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। তার প্রথম পোস্টিং যশোর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে। চাকরি জীবনে তিনি নোয়াখালী, গোপালগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা, ঢাকার যাত্রাবাড়ী, ঢাকাস্থ হেড অফিস, খুলনা এবং বর্তমানে প্রধান কার্যালয়ের পার্সোনালাইজেশন সেন্টারে পরিচালক হিসেবে কর্মরত। এর মধ্যে তিনি সহকারী পরিচালক ছিলেন ৭ বছর, উপ-পরিচালক ৮ বছর এবং উভয়পদে মোট ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার ৩ মাসের মধ্যে পরিচালক পদে পদোন্নতি পান। এ সময় তিনি সর্বসাকুল্যে যথাক্রমে ৫৫ হাজার, ৬৫ হাজার এবং বর্তমানে ৭৫ হাজার টাকা করে বেতন তুলছেন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে তিনি ঢাকায় ৮টি ফ্ল্যাট,  ৭টি প্লট ও বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক বনে যান।

মাসুম হাসান

দুদকের নথি থেকে জানা যায়, উত্তরার ই-পাসপোর্ট পার্সোনালাইশন কমপ্লেক্স শাখায় উপ-পরিচালক মাসুম হাসানের চাকরির বাইরে দৃশ্যমান কোনও আয় নেই। কিন্তু তিনি ২০১৪ সালে ঢাকার দক্ষিণ বনশ্রীর ব্লক-কে, রোড-১৮, বাড়ি-১৯২, ‘সিনথিয়া ভিউ’র চতুর্থ তলায় ১৯২৩ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাট কিনেছেন। প্রায় ২ কোটি টাকায় এই ফ্ল্যাট কিনলেও মাসুম হাসান এটির দলিল মূল্য দেখিয়েছেন মাত্র ৪১ লাখ ২২ হাজার ৭৫০ টাকা। দেড় কোটি টাকায় ২০১২ সালে উত্তরায় কিনেছেন (দলিল নং-৬৮৫৫/১২) ৪ কাঠার প্লট। রেজিস্ট্রি খরচসহ এটির দলিল মূল্য দেখানো হয়েছে ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আয়কর নথিতে মাসুম স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য দেখিয়েছেন ৭৭ লাখ ৮৪ হাজার ২২০ টাকা। আর চাকরি জীবনে আয় দেখিয়েছেন ১ কোটি ২১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৩৯ টাকা। স্ত্রী সুমি আক্তার গৃহিণী হলেও ট্যাক্স ফাইলে তার পারিবারিক আয় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৪৮ হাজার ৬৩৯ টাকা। তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মূল্য দেখানো হয় ১ কোটি ১০ লাখ ৩৪ হাজার ২২০ টাকা। পাসপোর্ট হেড অফিসের কাছে ৬০ ফুট রাস্তা সংলগ্ন একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে মাসুমের। যার কোনও তথ্য নেই আয়কর নথিতে।

অভিযোগ রয়েছে, মাসুম হাসান দুর্নীতির পাশাপাশি জালিয়াতি করে বারবার পাসপোর্ট পরিবর্তন করেছেন এবং সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেছেন। এসব কারণে গত বছরের ৫ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে অধিদফতর মামলা দায়ের করলে গ্রেফতার হন। এর পরপরই হন বরখাস্ত। তার বিরুদ্ধেও দুদকের মামলা চলমান রয়েছে।

এক-দেড় মাসের মধ্যে শীর্ষ এই দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত এবং দুদকের মামলা চলমান কিংবা অনুসন্ধানে থাকায় এমন কর্মকর্তারা রয়েছেন আতঙ্কে।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন, খুব দ্রুত পরিচালক পর্যায়ের আরও দুই কর্মকর্তা বরখাস্ত হতে যাচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধেও দুদকে মামলা চলমান রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তারাও ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। সে সময়ও তারা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে তখন মামলাও দায়ের করা হয়।

পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন

অধিদফতরের সূত্র জানায়, পাসপোর্টের ঢাকা বিভাগীয় অফিসের পরিচালক থাকাকালীন আব্দুল্লাহ আল মামুন যেন অপ্রতিরোধ্য ছিলেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আস্থাভাজন ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে নিয়মনীতি, সিনিয়র-জুনিয়র এমনকি কার সঙ্গে কী ব্যবহার করতে হবে— সব কিছুই তুচ্ছ ছিল তার কাছে। সরকারি এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এতটাই প্রতাপশালী যে, মহাপরিচালকের সামনে দাঁড়িয়ে তার (ডিজি) কোনও আদেশ না মানার ঘোষণা দেন, অতিরিক্ত মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দেন। তার ভয়ে শুধু তার অফিস নয়, প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তারা পর্যন্ত অতিষ্ঠ থাকতেন। অথচ এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের চলমান মামলায় ইতোমধ্যে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৫ ধরনের গুরুতর অভিযোগ তদন্ত প্রমাণিত হয়েছে। অধিদফতর থেকে তাকে চাকরিচ্যুতির আবেদন করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। 

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে অবৈধ পাসপোর্ট করে দেওয়ার অভিযোগে দুদকের দায়ের করা মামলারও আসামি আব্দুল্লাহ আল মামুন। যেকোনও মুহূর্তে তিনি বরখাস্ত হতে পারেন বলে নিশ্চিত করেছেন মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা।

অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুনের বক্তব্য জানতে বিভিন্নভাবে যোগোযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

পরিচালক সাইদুল ইসলাম

অধিদফতরে তিনিও ছিলেন অপ্রতিরোধ্য কর্মকর্তা। অভিযোগ, প্রকাশ্যই ঘুষ নিতেন তিনি।

দুদকের তদন্ত নথি থেকে জানা যায়, সাইদুল ইসলাম ময়মনসিংহ অফিসে কর্মরত থাকাকালে কোনও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ব্ল্যাঙ্ক পাসপোর্ট ও ভুয়া এনওসি’র মাধ‌্যমে অর্ডিনারি ফি’তে জরুরি পাসপোর্ট ইস্যু করে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। অবৈধভাবে অর্জিত অর্থে অল্প দিনের মধ‌্যে নিজ এলাকা পাবনার সাঁথিয়ায় ১০ বিঘার ওপর পুকুর ক্রয়, কাশিয়ানি বাজারে ভবনসহ ১০ শতাংশ জায়গা ক্রয়, ২০ বিঘার ওপর ফার্ম, নরসিংদীতে ২৯ ও ৬৫ শতাংশ জায়গার ওপর কারখানা, উত্তরায় প্লট ও ফ্ল্যাট, বছিলা বেড়িবাঁধের পাশে চন্দ্রিমা হাউজিংয়ে ৫ কাঠার প্লট, শ্যাওড়াপাড়ায় ১৭ কাঠা জমি, মোহাম্মাদপুরের ইকবাল রোডে ২ হাজার ২০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, ধানমন্ডিতে দুটি ফ্ল্যাটের মালিক হন। নামে-বেনামে এসব সম্পদ করেন তিনি।

পরিচালক সাইদুলের বিরুদ্ধেও দুদকের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। যেকোনও মুহূর্তে তাকেও বরখাস্ত করা হতে পারে বলে দাবি করেছেন অধিদফতরের একজন দায়িত্বশীল।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাইদুল ইসলামের সঙ্গেও যোগাযোগ করে তার কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলে ১০ জনের বেশি বরখাস্তের তালিকায় রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে রয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।