Image description

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। অপ্রিয় হলেও সত্য যে ৯২ ভাগ মুসলমানের এই দেশের মানুষ দীর্ঘ দেড় যুগ কেতাবি ‘ঈদে উৎসব’ করলেও ‘প্রকৃত আনন্দ’ করতে পারেনি। হিন্দুত্ববাদী ভারতের নাচের পুতুল শেখ হাসিনা জগগ¦ল পাথরের মতো জাতির ঘাড়ে চেয়ে ‘ঈদ আনন্দকে কোটারি’ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। জুলুম-নির্যাতনের শিকার বিপন্ন মানুষ ঈদ উৎসবও মনের মতো পালন করতে পারতো না। বহু বছর পর এবার রাষ্ট্রীয়ভাবে ঈদের দিন রাজধানী ঢাকায় আনন্দ মিছিলের আয়োজন করা হয়। সব মত পথ ও বয়সের নারী-পুরুষ, শিশুরা এই মিছিলে সামিল হয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তবে ‘এক মণ দুধে এক ফোঁটা চনা’ দিলে যেমন সে দুধ আর খাওয়ার উপযুক্ত থাকে না তেমনি অবস্থা। পুত্তলিকার মতো পাপেট, গাধার পিঠে বসে থাকা লোককথার চরিত্র নাসিরুদ্দিন হোজ্জার প্রতিকৃতি মিছিলে নেয়ায় বিতর্ক উঠেছে। ঈদুল ফিতরের উৎসবের সঙ্গে কি কোনো পুত্তলিকা যায়? সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে বিতর্কের ঝড় বইছে। সাধরণ মানুষ এটা নিয়ে যত না বিতর্ক করছেন, তার চেয়েও বেশি ‘জাত গেল জাত গেল’ শোরগোল তুলছেন ভারতের কিছু গণমাধ্যম, হাসিনার পোষ্য মিডিয়া ও কনটেইন ক্রিয়েটাররা। হাসিনার উচ্ছিষ্টভোগী হাজার হাজার কনটেইন ক্রিয়েটাক ও ইউটিউবারদের নামানো হয়েছে। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের দোষত্রুটি খুঁজে বের করার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। কোথাও ভুলের তিল পেলে তাকে তাল বানিয়ে ড. ইউনূস ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাবে। হাসিনার কেনা ওই ব্যক্তিরা নাসিরউদ্দিন হোজ্জাকে একটি দলের প্রধান নেতার প্রতিকৃতি হিসেবে প্রচার চালাচ্ছেন। অবশ্য সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেছেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশের সাংস্কৃতিক যাত্রা ঠিক পথে হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য ঈদ আনন্দ মিছিল। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তাড়াহুাড়া করায় এটা হয়েছে। এ ভুল থেকে শিক্ষা নিব এবং পরবর্তীতে এ ধরনের আয়োজন অবশ্যই বেটার হবে।

১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয় থেকে এই বাংলায় মুসলিম শাসনের শুরু। ওই সময় দিল্লীতে তখন মোহম্মদ ঘোরী রাজবংশীয় শাসন বলবৎ ছিল। তারও আগ থেকেই নামাজ, রোজা, ঈদ উৎসব পালন শুরু হয় বাংলায়। ১৭৫৭ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলাহর পরাজয় উপনিবেশিক শাসন শুরু পর্যন্ত মুসলিমরাই উপমহাদেশ শাসন করায় উৎসবগুলো বিশেষ ভাবে পালিত হতো। পরবর্তীতে ধর্মীয় উৎসবগুলো স্বাভাবিক ভাবে পালিত হলেও বিগত হাসিনা রেজিমে কোনো উৎসবেই সাধারণ মানুষের অংশ গ্রহণ ছিল না। ঈদ উৎসবকে অনেকটা চাপা রেখে পহেলা বৈশাখের উৎসবের নামে হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি চর্চা করা হয়। গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালানোর পর মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতা পায়। এবার মুক্ত পরিবেশে ঈদ উৎসব পালিত হয়। দিবসটিতে আমজনতার বাড়তি আনন্দ দিতে চারশ বছর আগের বাংলার সুলতানি-মুঘল আমলের ঐতিহ্যের আলোকে ঈদ উৎসবে আনন্দ মিছিলের আয়োজন করা হয় রাষ্ট্রীয় ভাবে। ঈদের দিন সকালে ঢাকার শেরে বাংলা নগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠে ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। জামাত শেষে সেখান থেকেই শুরু হয় বর্ণাঢ্য ঈদ আনন্দ মিছিল। আগারগাঁওয়ের প্রধান সড়ক দিয়ে খামারবাড়ি মোড় হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে মিছিলটি শেষ হয়। মিছিলে অংশ নিতে এসে নারী-পুরুষের অনেকেই বলেন, এই ধরনের আয়োজন তাদের অনেকেই এর আগে দেখেননি। এতে তারা দারুণ খুশি। যে কারণে এই আয়োজনে শামিল হয়ে অনেকেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেও দেখা যায়।

আনন্দ মিছিলের অগ্রভাগে দুই সারিতে দেখা যায় আটটি সুসজ্জিত ঘোড়া। এছাড়াও ছিল ১৫টি ঘোড়ার গাড়ি আর মোগল ও সুলতানি আমলের ইতিহাস সংবলিত ১০টি পাপেট শো। বড় বড় পাপেট হিসেবে দেখা গেছে আলাদীন, আলী বাবা-চল্লিশ চোর, আরব্য রজনীর পরিচিত বিখ্যাত চরিত্র আর নাসিরুদ্দিন হোজ্জার মতো চরিত্র। মূলত নাসিরুদ্দিন হোজ্জা জনপ্রিয় দার্শনিক এবং বিজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কেউ কেউ তাকে মোল্লা নাসিরুদ্দিন নামেও চিনতেন। এই পাপেট শো আনন্দ মিছিলে আসা মানুষের মধ্যে বাড়তি আনন্দ যোগ করে, বিশেষ করে এ নিয়ে শিশুদের উচ্ছ্বাস ছিল ছিলো সবচেয়ে বেশি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ আবার গাধার পিঠে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার বসে থাকার সাথে ঈদের সংস্কৃতির মিল কোথায় তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। মূলত, পাপেটটিতে বিজ্ঞ দার্শনিক নাসিরুদ্দিন হোজ্জাকে উপস্থাপন করা হলেও, ফেসবুক পোস্টে অনেককে মন্তব্য করেছেন, ‘এটি দেখতে অনেকটা একটি দলের আমিরের মতো। এ নিয়ে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেছেন, চাঁদরাত থেকেই শিল্পকলা একাডেমিতে ঈদ উৎসব চলছে। এমন সময় ফোন করেন স্থানীয় সরকার ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভুঁইয়া। তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এই মিছিলে শরীক হওয়ার প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এবারে যে শিল্পকলা একাডেমিতে প্রথমবারের মতো চাঁদরাতের উৎসব হলো, বা ঢাকা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ঈদ মিছিল হলো, এই সবই অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংস্কৃতিক নীতির প্রকাশ। তাড়াহুড়া করায় এমনটা হয়েছে। তবে অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশের সাংস্কৃতিক যাত্রা ঠিক পথে হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা সিটির (উত্তর) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যেও নাসিরুদ্দিন হোজ্জা চরিত্র এসেছে। এটা একটি মেটাফোরিক কারেক্টর। বাচ্চারা এসব পছন্দ করে। যে কারণে এটাকে আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। পুরো এই আয়োজনটিকে ঢাকাবাসী ইতিবাচকে নিয়েছে। এটাকে ক্রিটিকালি না দেখে ইতিবাচক হিসেবেই নিয়েছে বেশিরভাগ মানুষ’। ঢাকা সিটির (উত্তর) প্রশাসকের দাবি সত্য হলে এ নিয়ে বিতর্ক উঠলো কেন? নাকি অন্তর্বর্তী সরাকরের ভাল কাজকে বিতর্কিত করতেই প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা হাসিনার অলিগার্করা বিতর্ক তুলতে পরিকল্পিতভাবে এমনটা করেছেন?

পাপেটের মূল শিল্পী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সহকারী প্রফেসর জাহিদুল হক দাবি করেছেন, ‘নাসিরুদ্দিন হোজ্জার পাপেট ক্যারেক্টরটি বানানোর জন্য ছবিটি নেয়া হয়েছিল একটি আরবি বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে। প্রচ্ছদের সাথেই নির্মিত ওই পাপেটটির চেহারার অনেক মিল রয়েছে। গায়ের কালো কোট, লাল জুতা, সাদা পাগড়ি সব ওটার সাথেই যায়। তবে, ইসলামী ধারার দলটির আমিরের সাথে কিছু মিল পাওয়া গেলেও সেটি যে ইচ্ছাকৃতভাবে ওনাকে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে, বিষয়টি একদমই এমন না।’ প্রশ্ন হচ্ছে কোনো জাতীয় নেতার আদলে পাপেট তৈরি করা কী দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়? সামনে পহেলা বৈশাখ। হিন্দুত্ববাদী শেখ হাসিনা প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ উৎযাপনে মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে যে দেবদেবি-ময়ুর, বাঘ, ঘোড়া, ময়না টিয়াসহ পুত্তলিকা নিয়ে মিছিল করেন; সেখানে থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ঈদের মতো পহেলা বৈশাখে আনন্দ মিছিলের নামে পুত্তলিকা মিছিল দেশের মানুষ মেনে নেবে না। ঈদের আনন্দ মিছিলের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পহেলা বৈশাখের মিছিলে ’৯২ মুসলমানের দেশের শিল্প-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য যাতে ফুটিয়ে তোলা যায় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা আমলা নামের হাসিনার অলিগার্করা অন্তর্বর্তী সরকারকে বিতর্কে ফেলতে ফের অপকা- ঘটাতে পারে। অতএব সাবধান!