Image description
 

দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটাতে যে শক্তিগুলো এক হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠের সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল তাদের মধ্যে বিভাজনের স্পষ্ট। তারা তাদের অভিন্ন শত্রু ফ্যাসিস্টদের ভুলে গিয়ে পরস্পর একে অন্যকে আক্রমণ করে এক অন্যরকম স্বর্গ সুখ অনুভব করছেন। তাদের অনেকের ভাব এমন যে, এক দল অন্যদলকে যেকোনো দিক থেকে ডাউন করতে পারলে তারাই ক্ষমতায় চলে আসবেন সামনে।

রাজনীতির মূলনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে নৈতিক অবস্থান, ২৪ কে কীভাবে দেখে এই সকল বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নীতিগত পার্থক্য ছিল বহু আগে থেকেই। তাই জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলনের পর যখন ক্ষমতার পাশাপাশি আওয়ামী প্যানোপটিকনেরও পতন ঘটে, তখন থেকে অনলাইন মাধ্যমে দৃশ্যপট পুরো পাল্টে গেছে।

আমরা দেখছি জব্বারের বলী খেলার মতো গায়ে তেল মেখে, পরনে লাল লেংটি বেঁধে মাঠে নেমেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কুস্তিগীররা। তারা একে অন্যের প্রতি আক্রমণ পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন করে ট্যাগ সন্ত্রাসকে একান্ত অবলম্বন মনে করছে। 

ইসলামী ছাত্রশিবিরের কুস্তিগির যারা অনলাইনের বলী খেলায় গায়ে তেল মেখে লাল লেংটি পরে নেমেছেন বিরোধী সবার প্রতি তাদের আহ্বান ‘শাহবাগী গোসল কর’ কিংবা টেম্পু স্ট্যান্ড থেকে আজ কত টাকা পাইছেন আংকেল?

ওদিকে একইভাবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যারা গায়ে তেল মেখে লাল লেংটি পরে মাঠে সক্রিয় তারাও বিরোধী সবাইকে শিবির ট্যাগ দিয়ে বলছে আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল পার্টি কিংবা গুপ্ত সংগঠন। তাদের নামও দেওয়া হয়েছে ‘আলবটর’। ওদিকে একে অন্যের পেছনে লেগে থাকায় তাদের অভিন্ন শত্রু আওয়ামী লীগ, যুবলীগ কিংবা ছাত্রলীগ নিয়ে তাদের কারো মুখেই রা’ নেই।

জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় শিক্ষার্থীরাও তাদের কুসুম কুসুম ক্ষমতাকে আরও দীর্ঘায়িত করতে চাইলো। তারাও বেশ ঢাক-ঢোল পিটিয়ে একটি রাজনৈতিক দল খুলে ফেলল। শিক্ষার্থী অবস্থায় তারা যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে স্বপন মামার দোকানের সামনে পরস্পর ক্যাচাল করতে থাকে। নতুন দল গঠনের মধ্য দিয়ে স্বপন মামার চায়ের দোকানের সেই ক্যাচালের জাতীয়করণ করল তারা। 

হঠাৎ করে ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তারা সুযোগ পেলে নিজেরাই একে অন্যকে চিমটি কাটতে শুরু করেছে। ওদিকে সকাল-বিকাল পালা করে বিএনপি কিংবা জামাতের পেছনে কাঠি না করলে তাদের অনেকের ভাত হজম হয় না।  সমালোচনার ক্ষেত্রে তারা পুরোটা সময় ব্যয় করছে বিএনপি এবং জামাতের পেছনে।  

ওদিকে মিছিল মিটিং করতে গিয়ে চিৎকার দেওয়ার সময় তারা যে রাজনৈতিক দলকে তাদের সব থেকে বড় শত্রু হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে চায়, তাদের অপকর্মের ফিরিস্তি দেওয়ার ব্যাপারে তারাও রহস্যজনকভাবে নীরব। এক্ষেত্রেও পরস্পর বিপরীতমুখী কাদা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে নিয়মিত।

তবে কি প্রাপ্য সামান্য ক্ষমতা ধরে রেখে অবস্থান শক্তিশালী করা কিংবা দ্রুত ক্ষমতায় আসার ধারাবাহিক নানা প্রচেষ্টা এই সংকটের জন্য দায়ী?  অনেকে ভাবছে আরও কিছুদিন ক্ষমতায় থেকে যেতে পারলে  আওয়ামী লীগের লুটের অর্ধকড়ি তাদের জন্য গনিমতের মাল হিসেবে ব্যবহার সহজ হবে। আরো বেশি গাড়ি ঘোড়া নিয়ে বড় বড় শোডাউন দেওয়া যাবে। অনেকে মনে করতেছে নির্বাচন পিছায় গেলে আওয়ামী গনিমতের মাল কিংস পার্টি লুটপাট করে শেষ করে ফেলবে।  

এর মাঝখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা ধীরে ধীরে সংগিন হচ্ছে এ বিষয়ে কারো কোনো দৃষ্টি নেই। রাজনৈতিকভাবে নানাবিধের সিদ্ধান্ত নিয়ে হাততালি পাওয়া যেতে পারে সহজেই। আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি নিয়ে টুকটাক লেখাপড়া থাকায় আমার ধারণা ইউনুস স্যারের চীন সফরে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘ দিনের হিসেবে খুব একটা ভালো ফল বয়ে আনতে নাও পারে। 

তবে আপাতদৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্তগুলো দেখে মনে হচ্ছে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রনায়ক এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। অবশ্য ক্ষমতায় থাকার জন্য সবার নানা ধরনের প্রতিবেশী তোষণনীতি গণমানুষের এরকম চিন্তার নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। 

বিশেষ করে আরাকান এবং সেভেন সিস্টার্স নিয়ে জনতুষ্টিবাদী অপ্রয়োজনীয় হম্বিতম্বি পরবর্তী দিনগুলোতে পরাশক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণের কারণ হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রয়োজনীয় নানাবিধ সংস্কার সম্পন্ন করলে বাংলাদেশের মানুষ এমনিতেই অধ্যাপক ইউনুসকে তাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান দেবে। 

এখানে আগ বাড়িয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো পরবর্তীকালে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কে তা যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। যেকোনো সিদ্ধান্ত দেখে অবিবেচকের মত হাততালি দেওয়ার আগে বিবেচনাপ্রসূত উপায়ে আমাদের ভাবতে হবে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর ব্যাটলফিল্ডে পরিণত হলে বাংলাদেশের কেউ কোথাও ভালো থাকবে না। 

একবার ভেবে দেখেন কোথাও দুইটা শক্তিশালী ষাঁড়ের মারামারি হলে তাদের পায়ের নিচের ঘাসের কি অবস্থা হয়? বিভিন্ন ধরনের সংস্কার এবং নির্বাচন ইস্যুতে বাংলাদেশপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়ি এবং কুস্তি ধীরে ধীরে দেশটাকে ওই ষাঁড়ের পায়ের নিচের ঘাসের অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে। যত বেশি বিশ্লেষণ করা হোক এই ঘটনা আদতে কারো জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না।

তাই বাংলাদেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের উচিত পরস্পর কাঁদা ছোড়াছড়ি বন্ধ করা। অমুক সংস্কার করতে চায়, তমুক করতে চায় না- দেয় না এগুলো পুরোপুরি লোক দেখানো কথাবার্তা যার বাস্তবে কোনো ভিত্তি নেই। এর পাশাপাশি অনেকগুলো অপকর্ম সংগঠিত যেগুলো বাংলাদেশের মানুষ কখনো আশা করেনি।

সংস্কার করা না করা এটা কোনো রাজনৈতিক দল এমন কি ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেরও এখতিয়ার নয়। সংস্কার প্রশ্নে একটা গণভোট হওয়া জরুরি। একটি কমিশন তাদের খেয়াল খুশি মতো কোনো নিয়ম কানুন রাজনৈতিক দলগুলোর উপর চাপিয়ে দিলে প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের সেই সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য এটাও মনে করাও এক ধরনের ফ্যাসিস্ট আচরণ।

বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল এককভাবে দেশের পুরো জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। সরকার গঠন করে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট প্রাপ্ত দল। এক্ষেত্রে সংসদের সিদ্ধান্ত তারা নিতেই পারে। তবে সংবিধান দেশের প্রতিটি নাগরিকের, তাই সংবিধান নিয়ে কোনো কথা বলতে গেলে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মত নিতে হবে

জনগণের ঘাড়ের উপরে ঘোড়ার জিনের মতো কিছু একটা চাপিয়ে দিয়ে সেটাকে সংস্কার বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করার সুযোগ নাই।  ওদিকে কোনো রাজনৈতিক দল যারা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসবে, কিংবা বর্তমানে ছায়া সরকার হিসেবে ক্ষমতায় আছে কিংবা পর্দার অন্তরালে থেকে সরকার পরিচালনার কুশীলব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে এই অধিকারে গণভোট বাদে সংবিধান কাটাছেঁড়া না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।