
প্রতি বছর ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তিনটি জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে প্রাক-বর্ষা জরিপটি বছরের এ সময়ের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা।
প্রতি বছর ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তিনটি জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে প্রাক-বর্ষা জরিপটি বছরের এ সময়ের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এবার সরকার এখনো ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রাক-বর্ষা জরিপ শুরুই করেনি। আবার ২০২৪ সালের বর্ষা-পরবর্তী জরিপের প্রতিবেদন তৈরির কাজও এখনো শেষ হয়নি।
বাংলাদেশে প্রতি বছরই বর্ষার আগে থেকে বাড়তে শুরু করে ডেঙ্গু সংক্রমণ। বৃষ্টিপাত শুরুর পাশাপাশি ভ্যাপসা গরম ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজনন ও বংশবিস্তারের অনুকূলে হওয়ায় সাধারণত এপ্রিল থেকেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। সে হিসাবে এবারো আসন্ন এপ্রিলে ডেঙ্গুর বিস্তৃতি বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে না এখনো।
গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর দেশে সাময়িক সময়ের জন্য স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম থমকে যায়। একই সঙ্গে স্থবিরতা নেমে আসে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমেও। এর মধ্যে শীত মৌসুম চলে আসায় এডিসের বিস্তার প্রতিরোধে নেয়া কার্যক্রম আরো ধীর হয়ে আসে। বর্তমানে শীত শেষে মার্চের মাঝামাঝি থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির দেখা মিলেছে। এ অবস্থায় পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের নিশ্চিতকৃত সংখ্যা ৫৭৫। গত বছরও এপ্রিল থেকেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে দেখা গিয়েছিল। গত বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছিল ১ হাজার ৫৫ জন। এরপর ফেব্রুয়ারি ও মার্চে এ সংখ্যা কমে আসে। এ দুই মাসে ডেঙ্গু রোগী নথিভুক্ত হয় যথাক্রমে ৩৩৯ ও ৩১১ জন। ডেঙ্গু রোগী বাড়তে শুরু করে এপ্রিল থেকে। ওই মাসে রোগী শনাক্ত হয় ৫০৪ জন এবং তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় অক্টোবরে। দেশে অক্টোবর ও নভেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে যথাক্রমে ৩০ হাজার ৮৭৯ ও ২৯ হাজার ৬৫২ জন। এর পর ডিসেম্বরে তা নেমে আসে ৯ হাজার ৭৪৫ জনে।
এডিস মশা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ পরিচালনাকারী দলের সদস্যদের অন্যতম জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. মো. গোলাম ছারোয়ার। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূলত বর্ষার আগে থেকেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। এ বছর সরকারের আরো জোরালো প্রস্তুতি প্রয়োজন। ২০০০ সালে দেশে প্রথম ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়। ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত যে পরিমাণ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে, ২০২২ সালে সে সংখ্যা আমরা দ্বিগুণ হতে দেখেছি। একইভাবে ২০২৩ সালে এ সংখ্যা আগের বছরের দ্বিগুণ হয়েছে। একই বিষয়ে পুনরাবৃত্তি দেখা গেল ২০২৪ সালে। তার মানে প্রতি বছরই ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ হচ্ছে। এর কারণ হলো মশার ঘনত্ব বাড়ছে। এ বছর সরকারের ডেঙ্গু প্রতিরোধে আরো তৎপরতা প্রয়োজন। নয়তো পরিস্থিতি সামাল দেয়া কষ্টকর হবে।’
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ প্রথম শনাক্ত হয় ২০০০ সালে। এর পর প্রায় দুই দশক ধরে ডেঙ্গুর বিস্তার ছিল রাজধানী ঢাকায় সীমাবদ্ধ। কিন্তু ২০১৯ সালে দেশব্যাপী ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। এর পর প্রতি বছরই ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে দেখা গেছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুরু থেকেই সরকারের কার্যক্রম বেশ ত্রুটিপূর্ণ বলে অভিযোগ তুলছিলেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু এ বছর ডেঙ্গু প্রতিরোধে দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম না থাকায় এবার পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হাসান সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ মশা মারার চেয়ে তা লার্ভা থাকা অবস্থায় নির্মূলের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সহজ। কিন্তু সরকার সেদিকেও নজর দিচ্ছে না। ডেঙ্গুর চারটি ধরন রয়েছে। প্রথমবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে তেমন আতঙ্কের কিছু নেই। দ্বিতীয়বারও ভাইরাসের একই ধরনে আক্রান্ত হলেও ভয়ের কিছু নেই। তবে কেউ যদি প্রথমবার একটি ধরন এবং দ্বিতীয়বার ভিন্ন ধরনে আক্রান্ত হন তাহলে মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে। এক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি কমানোর জন্য প্রয়োজন ভাইরাস নিয়ে কাজ করা। আমরা যদি আগে থেকে জানতে পারি এবার ভাইরাসের কোন টাইপের প্রকোপ বেশি বা কোন এলাকায় কোন টাইপ ছড়াচ্ছে, তাহলে ডেঙ্গুতে মৃত্যু প্রতিরোধ করা যাবে। ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যার চেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা কমানোয় সরকারকে বেশি মনোযোগী হতে হবে। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা কমানোর জন্য প্রয়োজন বিস্তর গবেষণা ও তথ্য-উপাত্ত। কিন্তু সরকার সেদিকে মনোযোগ দিচ্ছে না। ডেঙ্গু শুরু হলে মশা মারতে কামান দাগানো শুরু হয়, কাজের কাজ কিছুই হয় না।’
চলতি বছর এরই মধ্যে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৬১ জন। ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৪ জন। আর চলতি মার্চে গতকাল পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ২৬২ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১০ জন ও চলতি মাসে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ফেব্রুয়ারি ছিল মৃত্যুশূন্য।
এ বছর স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি না থাকায় ডেঙ্গু সমস্যা আরো জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মেয়র, কাউন্সিলর, পৌরসভা মেয়র না থাকা সমস্যা না। সমস্যা হলো সরকার এ পদগুলো এখনো পূরণ করেনি। ফলে সরকার এ বডিগুলোর মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কাজটি করতে পারছে না। তাছাড়া ডেঙ্গুর পেছনে অপরিকল্পিত নগরায়ণও বড় দায়ী। অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি, সরকার পরিকল্পিত ঢাকা বা পরিকল্পিত মফস্বল গড়ার পথে হাঁটছে না। তাছাড়া শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দিয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের অন্যান্য বডিকেও কাজে লাগাতে হবে। তরুণ প্রজন্মকেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাঠে নামাতে পারে সরকার। তারা প্রচারণার পাশাপাশি খাল-জলাশয় পরিষ্কার, মশার লার্ভা নষ্ট করার মতো কাজেও যুক্ত হতে পারবে।’
ডেঙ্গু প্রতিরোধে এখনই যদি সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আসছে মৌসুমে দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ডা. লেলিন চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা আগেও দেখেছি, ডেঙ্গু মৌসুম এলে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের স্থানীয় সরকারের মেয়ররা মশা মারা নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়। তবে সেগুলোর কোনো ফলাফল মাঠে দেখা যায় না। গত বছরের শেষ কয়েক মাসে ডেঙ্গু মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। এ বছর যেহেতু সরকারি কোনো তথ্য-উপাত্ত আমাদের হাতে আসেনি, তাই আমরা বিজ্ঞানসম্মত কোনো পূর্বাভাস দিতে পারছি না। তবে এতটুকু বলতে পারি, যেহেতু ডেঙ্গু নিয়ে সরকারের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই, তার মানে এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিপর্যয় নিয়ে আসার জোর আশঙ্কা রয়েছে।’
ডেঙ্গুর বিস্তার ও পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এর উপদ্রবের সময়কালও বেড়েছে। আগে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যেত শুধু বর্ষা মৌসুমে। কিন্তু গত বছর প্রাক-বর্ষা থেকে শীত পর্যন্ত দেখা গেছে ডেঙ্গুর দাপট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি এখন বছরব্যাপীই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারকে আরো বেশি সতর্ক হওয়া দরকার। গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্য অনেক কার্যক্রমের মতো ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমও শিথিল হয়ে পড়তে দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন ডেঙ্গুর মৌসুমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কিন্তু এ নিয়ে সরকারের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় এবার আগের সব রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাওয়ার জোর আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের প্রস্তুতি আছে। আমরা মিটিং করছি। জোনাল পর্যায়ে সতর্কতার বার্তা দিয়েছি। তবে মানুষ তো সচেতন না। ডেঙ্গু হয় পরিষ্কার পানিতে। মানুষ পরিষ্কার পানি জমিয়ে রাখে। মনে করে কিছু হবে না। আপনারা লেখালেখি করে মানুষকে সচেতন করুন। সবাই সচেতন হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমানো সম্ভব।’