Image description

২১ জুন, ২০২৪। সেদিন রাতে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তার চিকিৎসায় জরুরি ভিত্তিতে ইনজেকশন ও অ্যাম্বুলেন্স সহায়তা প্রয়োজন। গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে ফোন করেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক। কিন্তু খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় কোনো ধরনের সহায়তা করতে অপারগতা জানায় হাসপাতালটি।

ওই রাতে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয় তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে।

খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা সহায়তা না দেওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম ইউনাইটেড গ্রুপ। তাদেরই প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড হাসপাতাল।

 
 

এই শিল্পগোষ্ঠীর কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলন দমনের অভিযোগে পাঁচটি হত্যা মামলা হয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারকে বিপুল অর্থসহায়তা করে ইউনাইটেড গ্রুপ।

তাছাড়া ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাড়ি থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে বের করে দেওয়ার ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আব্দুল মুবীন। তিনি সম্পর্কে ইউনাইটেড গ্রুপের প্রধান উপদেষ্টা হাসান মাহমুদ রাজার বেয়াই। মুবীন পরে ইউনাইটেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড পাওয়ারের চেয়ারম্যান হন।

ইউনাইটেড গ্রুপের অনিয়ম-দুর্নীতি, জালিয়াতি, বেআইনি সুযোগ-সুবিধা নেওয়া এবং জেনারেল মুবীনের ভূমিকার কথা উঠে এসেছে বিএনপির নেতাদের বক্তব্যেও। একই সঙ্গে ইউনাইটেড হাসপাতালের চিকিৎসায় অমানবিকতা ও স্বৈরাচারী সরকারকে সহায়তা করার কারণে তাদের বিচারের আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন তারা। ইউনাইটেডের পণ্য ও হাসপাতালে চিকিৎসা বয়কটের কথাও বলেন তারা।

ঢাকাটাইমসের কথা হয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক, ছাত্রদলের সহ-সভাপতি কাজী জিয়াউদ্দিন বাসিতের সঙ্গে।

খালেদা জিয়াকে বাড়িছাড়া করার দিন জেনারেল মুবীনের তৎপরতার প্রত্যক্ষ সাক্ষী বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘ম্যাডামকে (খালেদা জিয়া) যখন বাড়ি থেকে বের করে দিলো, তখন আমি জাহাঙ্গীর গেট থেকে বনানী গেট পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করেছি। মুবীন সাহেব (তৎকালীন সেনাপ্রধান) নিজে এসে জল-কামান দিয়ে আমাদের সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। আমরা স্বচক্ষে সেটা দেখেছি।’

 

খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় অপারগতা: ইউনাইটেড বয়কট ও বিচার চান ক্ষুব্ধ নেতারা

 

এই প্রসঙ্গের চেয়েও আরও বড় হয়ে ওঠে যখন একজন রোগীর জীবন-মরণ নিয়ে কেউ অবহেলা করে। বিএনপির চেয়ারপারসনের এই উপদেষ্টা বলেন, ‘কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে অ্যাম্বুলেন্স, ইনজেকশন, ওষুধ চাইলে কোনো হাসপাতালের তা প্রত্যাখ্যান করা চরম অমানবিকতা ও নিমর্মতার প্রকাশ। রাজনীতি অন্য বিষয়, কিন্তু মানবিক দিক থেকে তারা যে অবহেলার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে এটি ঠিক করেনি।’

এই বিষয়গুলো ইতিহাসে লেখা থাকা উচিত বলে মন্তব্য করে বিএনপিদলীয় সাবেক চিফ হুইপ বলেন, ‘একটা দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, দুইবারের বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসনকে তার অসুস্থতায় ওষুধপত্র ও অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়নি- এটা সবচেয়ে বড় মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে আমি মনে করি। যারা এসব ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ছিল, যারা অগণতান্ত্রিক কাজে সরকারকে সহায়তা করেছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা উচিত।’

খালেদা জিয়ার সঙ্গে ইউনাইটেড গ্রুপের ওই আচরণের পর থেকে আজ পর্যন্ত সেখানে কোনো চিকিৎসাসেবা নেননি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। ভবিষ্যতেও কোনো দিন নেবেন না বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তিনি।

 

খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় অপারগতা: ইউনাইটেড বয়কট ও বিচার চান ক্ষুব্ধ নেতারা

 

ঢাকাটাইমসকে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘আমি যখন জানলাম ম্যাডামকে তারা অ্যাম্বুলেন্স ও ওষুধ সহায়তা করেনি, তখন আমি ওয়াদা করি- আমি মারা গেলেও ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নেব না। আজও সেই ওয়াদা রক্ষা করে চলছি। আমি তো হাসপাতাল ভেঙে বা উঠিয়ে নিতে পারব না। আমি শুধু আমার মতো করে প্রতিবাদ করেছি। আমার প্রতিবাদের ভাষা বুঝতে পারলে কোনো নেতাই ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাবেন না।’

বিগত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইউনাইটেড গ্রুপের অনিয়ম-দুর্নীতির কথাও জানেন বিএনপির রাজনীতির এই লড়াকু নেতা। বলেন, ‘ইউনাইটেড গ্রুপ গত সরকারের আমলে নানাভাবে সুবিধাভোগী। তারা কৌশলে সরকারের পাওয়ার প্লান্ট কিনে নিয়েছে। ওই সরকারের নানা দুর্নীতির সঙ্গেও তারা জড়িত।’

তার বক্তব্যের সূত্র ধরে ঢাকাটাইমস জানতে পেরেছে, আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানির (এপিএসসিএল) জমির দাম কম দেখিয়ে ২০ ভাগ শেয়ার কবজা করে ইউনাইটেড গ্রুপ। সরকার যথাসময়ে প্রকল্পে বিনিয়োগ না করার অজুহাতে একতরফা কোম্পানির শেয়ার আত্মসাৎ করে ৯১ শতাংশে নিয়ে যায় ইউনাইটেড।

বিগত শেখ হাসিনা সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ইউনাইটেডসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে হয়রানি করেছে বলে মন্তব্য করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি কাজী জিয়াউদ্দিন বাসিত।

ঢাকাটাইমসকে বাসিত বলেন, ‘ফ্যাসিজমের সময় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল। তারা ইউনাইটেডসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে হয়রানি করেছে। ইউনাইটেড হাসপাতালের ঘটনার সময় আমি কারাগারে ছিলাম। বাইরে আসার পর থেকে আমি চেষ্টা করেছি ইউনাইটেডের পণ্য বয়কটের। তাদের নির্মম আচরণের জন্য তারা ফ্যাসিস্টদের মতো ধ্বংস হয়ে যাবে।’

 

খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় অপারগতা: ইউনাইটেড বয়কট ও বিচার চান ক্ষুব্ধ নেতারা

 

ইউনাইটেডের সহযোগিতা না পেয়ে খালেদা জিয়াকে এভারকেয়ারে ভর্তি করার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তার চিকিৎসক জাহিদ হোসেন বলেছিলেন, ‘ইনজেকশন ও অ্যাম্বুলেন্স সহায়তার জন্য বারবার ফোন করা হয় ইউনাইটেড হাসপাতালে। কিন্তু কোনো সাড়া মেলে না তাদের। শুরু থেকেই তারা বিষয়টি এড়িয়ে যায়।’

এ ঘটনায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী তখন বলেছিলেন, ‘তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় সহযোগিতা না দিয়ে ইউনাইটেড হাসপাতাল অমানবিক আচরণ করেছে। দেশের জনগণ যদি হাসপাতালের ইট খুলে নিয়ে যায়, তাদের করার কিছু থাকবে না।’

ইউনাইটেড গ্রুপের অনিয়ম-দুর্নীতি, জালিয়াতি, আইন লঙ্ঘন, বেআইনি সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন সময় ঢাকাটাইমসে বেশ কয়েকটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির আয়কর ফাঁকি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর গোয়েন্দা বিভাগের অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকার কর ফাঁকি দিয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী এই শিল্পগ্রুপটি। এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে গ্রুপের কয়েকজন পরিচালক কর ফাঁকি দিয়েছেন ৪০ কোটি টাকা।

আইন অনুযায়ী গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরকারকে দেওয়ার কথা, তা না করে বেশি দামে বেসরকারি খাতে বিক্রি করছে মাফিয়া হয়ে ওঠা ইউনাইটেড। গত ২ নভেম্বর ‘নিয়মবহির্ভূত সুবিধা নিয়ে ও আইন ভেঙে মুনাফা লুটছে ইউনাইটেড পাওয়ার’ শিরোনামে ঢাকাটাইমসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, তারা প্রতি ঘনমিটারে গ্যাস কিনছে ১৬.৭৫ টাকা দরে, কিন্তু একই গ্যাস অন্যান্য বিদ্যুৎ কোম্পানির কিনতে হয় ৩০.৭৫ টাকায়।

এই ইউনাটেড গ্রুপের বিরুদ্ধে আইনের ব্যত্যয় ও অনিয়ম করে বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ নানা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালানোর অভিযোগের পাশাপাশি শিল্পগ্রুপের কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও অভিযোগের অন্ত নেই। কিন্তু তারা সব সময় থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকির ছাড়াও ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের তদন্তে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এরই মধ্যে প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে।

গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ইউনাইটেড গ্রুপের কর্ণধার হাসান মাহমুদ রাজা, চেয়ারম্যান ও এমডি মঈনউদ্দিন হাসান রশিদ ও গ্রুপের কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) আফজালের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে হত্যা মামলা হয়। আন্দোলনের সময় ঢাকার প্রগতি সরণিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত বাহাদুর হোসেন মনিরের বাবা আবু জাফরের করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এই তিনজনও আসামি। তাদের বিরুদ্ধে আরও চারটি মামলা হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ সরকারকে অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

এই গ্রুপের প্রধান কার্যালয় ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিরুদ্ধে ভবন নির্মাণে অনিমের অভিযাগও রয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ইউনাইটেড গ্রুপের এসব স্থাপনা গড়ে তোলায় অনুমোদন নেই রাজউকের। এ নিয়ে রাজউক থেকে বিভিন্ন সময় নকশা ও নথি চেয়ে একাধিকবার চিঠি দিলেও তা সরবরাহে গড়িমসি করে ইউনাইটেড।

গত ৩ নভেম্বর মাদানি এভিনিউয়ে অনুমোদন ছাড়া ইউনাইটেড গ্রুপের প্রধান কার্যালয় গড়ে তোলায় ভবনটি কেন ভেঙে ফেলা হবে না তা জানতে চিঠি দেয় রাজউক। এরপর টনক নড়ে ইউনাইটেডের। তারা দৌড়ঝাঁপ শুরু করে রাজউকে।

এই গ্রুপের ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধেও নানা সময়ে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ উঠেছে রোগীর স্বজনদের তরফে। সুন্নতে খতনা করাতে গিয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালে মারা যায় শিশু আয়ান। শিশুটির বাবা শামিম আহমেদ ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈন উদ্দিন হাসান রশিদ এবং সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনাইটেড মেডিকেল হাসপাতালের চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ রাজাসহ আটজনের বিরুদ্ধে ডিবিতে অভিযোগ করেন।

(ঢাকাটাইমস