রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো দিন দিন আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। দুর্বৃত্তরা সুযোগ বুঝে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগ করে গা-ঢাকা দিচ্ছে। ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়ে তদন্ত শুরু করে। কিন্তু দুর্বৃত্তরা অধরাই থাকছে। কারণ তারা নানা কৌশলে নাশকতার ঘটনা ঘটাচ্ছে। তারা এমন স্থান ও স্পট বেছে নিচ্ছে যাতে ধরা না পড়ে। মোটরসাইকেল ব্যবহার করে দ্রুতই ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়ছে। এ ছাড়া এসব ঘটনার বিষয়ে আগাম তথ্যও নেই পুলিশের কাছে।
চলতি বছরের আগস্টে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিলসহ বিভিন্ন তৎপরতা শুরু করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র বলছে, এরপর থেকেই ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। সেপ্টেম্বরে এমন অনেক ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া প্রায় অর্ধশতাধিক স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ করা হয়। ওই সময় নাশকতার আশঙ্কায় সারা দেশে পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়। তখন কিছু দুর্বৃত্ত গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মাঝখানে কিছুদিন বিরতি দিয়ে শ্রমিক আন্দোলনকে সামনে রেখে ফের ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা শুরু হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে রোববার রাত পর্যন্ত বেশ কয়েকটি বাসে আগুন ও একাধিক স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় শহর জুড়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কিন্তু পুলিশ এসব ঘটনায় কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহল নাশকতা এড়াতে সারা দেশের পুলিশ সদস্যদের সতর্ক করেছে। একইসঙ্গে নাশকতাকারীরা যাতে জনগণের ক্ষতির কারণ না হয় সেদিকে নজর দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগকে এসব নাশকতার সঙ্গে কারা জড়িত, ইন্ধনদাতা, অর্থদাতা ও বাস্তবায়নকারীকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেয়া হয়েছে এমন এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা জানান, যারা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে তারা খুব কৌশলী। যেখানে সিসি ক্যামেরা নাই, পুলিশের উপস্থিতি নাই এসব এলাকাকে বেছে নিচ্ছে। পূর্ব পরিকল্পিতভাবে মোটরসাইকেলে এসে নিমিষেই নাশকতা করে আবার পালিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীরাও টের পাচ্ছেন না। ঘটনা ঘটার পর বিষয়গুলো সামনে আসছে। তাই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, নাশকতা ও নাশকতাকারীদের সম্পর্কে আগাম কোনো গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছে না পুলিশ। নাশকতার সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার কথা পুলিশ জানালেও তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে পারছে না। বিশেষ করে যে সকল নেতাকর্মী নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করছে, অর্থের জোগান, নির্দেশ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে তাদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নাই। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আগাম গোয়েন্দা তথ্য না থাকার কারণে নাশকতাকারী একের পর এক ঘটনা ঘটাচ্ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন গতকাল বলেছেন, একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দিয়ে জনমনে আতঙ্ক তৈরির উদ্দেশ্যে একটি গ্রুপ কাজগুলো করছে। প্রতিটি ঘটনা পুলিশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ও তদন্ত করছে। এরই মধ্যে এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেপ্তারও করেছে। এই গ্রেপ্তারদের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন-অঙ্গসংগঠনের সদস্যরা রয়েছে। তিনি বলেন, এই সমস্ত কার্যক্রম দেখে যেটি বোঝা যায় যে, একটি গ্রুপ নাশকতার উদ্দেশ্যে এবং জনমনে আতঙ্ক তৈরির উদ্দেশ্যে কাজগুলো করছে। বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলছে, গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্ত রিপোর্টের সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের পুলিশ মোতায়েন করা আছে এবং আমাদের অপারেশনাল কার্যক্রম চলমান।
তিনি আরও বলেন, জননিরাপত্তার জন্য এবং যেন মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি না হয়, সেই ব্যাপারে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ডিএমপি’র পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের মোবাইল পার্টি, পিকেট ডিউটি অব্যাহত আছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত। ককটেল তৈরির উপাদানগুলো কোথায় বানানো হচ্ছে, কারা করছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এর আগেও কিন্তু ডিবি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করেছে এবং বিস্ফোরক পদার্থ উদ্ধার করেছে। সুতরাং সব বিষয়ে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। যেকোনো পদার্থ বিভিন্ন কারণে ব্যবহৃত হতে পারে। আমরা খেয়াল রাখছি যে, নাশকতার উদ্দেশ্যে কোনো জায়গায় ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে কি না। সে ব্যাপারে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। আমরা এগুলো মনিটরিং করছি। এখন যেহেতু সিসিটিভি ফুটেজে সবকিছু পর্যালোচনা করা যায়, আমরা সিসিটিভি ফুটেজও পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করছি। এই যে, কারা নাশকতার উদ্দেশ্যে এই ধরনের দাহ্যপদার্থ সংগ্রহ করছে, সেই বিষয়ে ডিএমপি’র পক্ষ থেকে আমাদের কার্যক্রম চলছে।