একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ, যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সন্ধ্যা হলেই বিভিন্ন এলাকায় ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। থানার আঙ্গিনা, সিআইডি পুলিশের গ্যারেজের পাশেও ককটেল
নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে গতকাল। ভাটারা এলাকায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি স্কুল বাসে অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। এসব ঘটনা রাজধানী জুড়ে নাশকতার সৃষ্টির আলামত হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গতকাল ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় সন্দেহভাজন তিনজনকে আটক করেছে জনতা। আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রাজধানী জুড়ে নাশকতার ছক কষছে। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগামী ১০ই নভেম্বর দেশব্যাপী সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। আর কথিত কর্মসূচি সামনে রেখেই গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীর একাধিক স্পটে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটছে।
আর এসব কাজে দুর্বৃত্তদের অন্যতম হাতিয়ার ‘মোটরসাইকেল’। নম্বরপ্লেট-বিহীন মোটরসাইকেলে হেলমেট পরে এসে দ্রুতই তারা আতঙ্ক ছড়িয়ে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। এতে আসামি পাকড়াও করতে বেগ পেতে হচ্ছে খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও। সিসি ক্যামেরা নেই এমন স্থান ঠিক করেই ককটেল ছুড়ছে তারা। ফ্লাইওভারের উপর থেকে ককটেল ছুড়ে মোটরসাইকেলে নিরাপদে পালিয়ে যাচ্ছে। অনেকটা পরিকল্পনা করেই দুর্বৃত্তরা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। এদের একজন মোটরসাইকেল চালাচ্ছে। আরেকজন পেছন থেকে ককটেল ছুড়ছে। আর দূর থেকে আগে দাঁড়িয়ে ফোনে ভিডিও করছে আরও এক থেকে দুইজন ব্যক্তি। কেউ আবার মোটরসাইকেলের পেছনে বসে এক হাতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে আর অন্য হাত দিয়ে বিস্ফোরণের ভিডিও ধারণ করছে। আর এই নাশকতার ধারণ করা ভিডিও পাঠিয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপসহ নির্দেশদাতাদের কাছে। বিনিময়ে মিলছে অর্থ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে থেকেই ককটেল নিক্ষেপকারীরা ছক কষে, কে কোথায় কোথায় কি করবে। রেকি করে বাস শনাক্তের পরে তারা খবর পৌঁছে দেয় অন্য পক্ষের কাছে। এরপর ওই পক্ষ গিয়ে সেই বাসে আগুন দেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নাশকতার এসব ঘটনার পরিকল্পনা হচ্ছে বিদেশ থেকে। সেখান থেকে অর্থও আসছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা এসব নাশকতার নির্দেশনা দিচ্ছেন। দেশে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা তা বাস্তবায়ন করছে।
সবশেষ গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজধানীর ভাটারায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ‘জলসিঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী পরিবহনের একটি বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। জলসিঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিবহন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামাল হোসেন বলেন, ১০০ ফিট সড়কে আমাদের স্কুলের চারটি বাস পার্কিং করা অবস্থায় ছিল। দুর্বৃত্তরা একটি বাসে আগুন দিয়েছে। আগুনে বাসটি পুড়ে গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাটারা থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই দেবাশিষ রায়। পথচারীরা বলছেন, দুই যুবক একটি মোটরসাইকেলে এসে পেছন দিক থেকে বাসটিতে আগুন দিয়ে দ্রুত চলে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সকলের সামনে বাসটি পুড়ে যায়। ঠিক একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলক্ষেতের গণতন্ত্র ও মুক্তি তোরণের কাছে ২টি, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের সামনে ১টি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বুথের সামনে ২টি, সিনেট ভবন ও ভিসি অফিসের সামনে ১টি এবং ইউল্যাব স্কুলের সামনে ১টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটনানো হয়। সবমিলে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই ৯টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
এই সময়ে টিএসসি এলাকা থেকে রেজাউল করিম, সোহেল রানা ও নাজমুস সাদ নামে তিন যুবককে আটক করে মারধর করে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করে শিক্ষার্থী ও উপস্থিত জনতা। তারা বলেন, এই দুই যুবকই মোটরসাইকেলে চেপে ব্যাগের মধ্যে ককটেল নিয়ে নীলক্ষেত থেকে শুরু করে ভিসি চত্বর, ইউল্যাব স্কুল, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, শাহবাগ মেট্রোস্টেশন, ও টিএসসি’র পাশের ডাচ্- বাংলা ব্যাংকের বুথের সামনে বিস্ফোরণ ঘটায়। যখন তারা ডাচ্-বাংলার সামনে ককটেল মেরে সামনের দিকে আসে তখনই তাদেরকে আটক করা হয়। পরে আরও একজনকে আটক করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নিউ মার্কেট জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মো. নাসিম এ গুলশান। তিনি বলেন, আমরা এই বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। এই ঘটনার পর পরই মালিবাগ সিআইডি হেডকোয়ার্টারের সামনের বীর-উত্তম শামসুল আলম সড়কে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। ওই ঘটনাতেও ব্যবহৃত হয়েছে মোটরসাইকেল। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল আলম। তিনি বলেন, মালিবাগ ফ্লাইওভারের উপর থেকে ককটেলটি নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। সেটি সিআইডি কার্যালয়ের ভেতরে এসবি’র একটি গাড়ির ওপর পড়ে বিস্ফোরিত হয়।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্ত ফ্লাইওভারের উপর থেকে পল্লবী থানার ভেতরে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। ওই সময়ে থানায় কাজে আসা এক এসআরবি সদস্য আহত হন। বিষয়টি নিশ্চিত করে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন বলেন, আতঙ্ক সৃষ্টির লক্ষ্যেই থানা প্রাঙ্গণে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিস্ফোরণের সময়ে থানার গেটের ভেতরে অবস্থানরত এসআরবি-৪-এর এক সদস্যের শরীরে ককটেলের বিস্ফোরিত অংশের ছিটে লাগে। এতে তিনি সামান্য আহত হন। ওই ঘটনার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পল্লবী থানার সামনের ফ্লাইওভারের উপরে হেলমেট মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে থানার ভেতরে ককটেল ছুড়ে মারছে ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সি এক যুবক। আর তার কিছু দূরে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে সেই ককটেল ছোড়ার ভিডিও করছে আরেক যুবক। ওই সময়ে মিরপুর ১ নম্বরের সনি সিনেমা হলের সামনেও একটি গাড়ির উপরে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা।
এর আগে শনিবার দিবাগত গভীর রাতে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেন যাত্রাবাড়ী থানার ডিউটি অফিসার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সালাউদ্দিন। তিনি বলেন, রাত একটা দশ মিনিটের দিকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এলাকায় দুর্বৃত্তরা বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটায়। তবে এতে কোনো হতাহতের সংবাদ পাওয়া যায়নি। এর ঠিক কিছু সময় আগেই ডেমরার বাঁশেরপুল এলাকাতেও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। শনিবার রাত আনুমানিক ১০টা ২০ মিনিটের দিকে বনানীতে সেতু ভবনের গার্ড রুমের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে গার্ড রুমের কাঁচ ভেঙে গেছে। ঘটনাস্থল থেকে আরও একটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করেছে পুলিশ। বনানী থানার ডিউটি অফিসার এসআই জুয়েল বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে সেতু ভবনের সামনে দুর্বৃত্তরা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটায়। আরও একটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করে পরে নিষ্ক্রিয় করা হয়।
এরপরই রাত ১২টা ৫৭ মিনিটে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা সোহাগ পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। পরে ফায়ার সার্ভিসের দু’টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিসের কন্ট্রোল রুমের কর্তব্যরত কর্মকর্তা শাহজাহান হোসাইন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, তেজগাঁও ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দু’টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। এর আগে শনিবার সন্ধ্যায় মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বিহঙ্গ পরিবহন নামে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। শুধু শনিবার রাতেই নয় গত শুক্রবারও রাজধানীর অন্তত ৫টি স্পটে জোড়া ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। একইসঙ্গে বাড়িধারা নতুন বাজার এলাকায় বৈশাখী পরিবহন নামে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয়া হয়। দেশ জুড়ে এমন নাশকতার ছক থাকলেও বর্তমানে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণে ও বাসে আগুন দিয়ে রাজধানীতে অস্থিরতা সৃষ্টি করে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনঠাসা করতে চায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন বলেন, জনমনে আতঙ্ক তৈরির উদ্দেশ্যে একটি গ্রুপ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দিচ্ছে। প্রতিটি ঘটনা পুলিশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ও তদন্ত করছে। এরই মধ্যে এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেপ্তারও করেছে। এই গ্রেপ্তারদের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন-অঙ্গসংগঠনের সদস্যরা রয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলছে, গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্ত রিপোর্টের সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের পুলিশ মোতায়েন করা আছে এবং আমাদের অপারেশনাল কার্যক্রম চলমান। তিনি বলেন, জননিরাপত্তার জন্য এবং যেন মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি না হয়, সেই ব্যাপারে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ডিএমপি’র পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের মোবাইল পার্টি, পিকেট ডিউটি অব্যাহত আছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। তিনি বলেন, আমরা খেয়াল রাখছি যে, নাশকতার উদ্দেশ্যে কোনো জায়গায় ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে কি না। এই যে, কারা নাশকতার উদ্দেশ্যে এই ধরনের দাহ্যপদার্থ সংগ্রহ করছে, সেই বিষয়ে ডিএমপি’র পক্ষ থেকে আমাদের কার্যক্রম চলছে।