Image description
 
আমার বাবা কাউন্সিলর ছিলেন, জামায়াতের হয়ে জনপ্রতিনিধি। ছোটবেলা থেকে একমাত্র সন্তান হিসেবে তাঁর জীবন দেখেছি, বিজিএফ কার্ড বিলি থেকে শুরু করে নানা কাজে তাঁর সাথে জড়িয়েছি। রাজনীতিতে ঢুকছি কি না, সেটা বোঝার আগেই আমি ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলাম। বাবার সাথে যেতে যেতেই শিবিরের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ি। তখন আওয়ামী বিরোধী আন্দোলনের সময়। ২০১৩ সালে হেফাজত আর জামায়াত-শিবিরের মামলায় জেলে গেলাম। প্রথম বর্ষেই ১৫-২০টা মামলা ছিল আমার নামে। আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়, পিটিয়ে হাত ভেঙে দেওয়া হয়, কারা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে।
কিন্তু দ্বিতীয়-তৃতীয় বর্ষে এসে ভেতরে একটা প্রশ্ন জেগে উঠল। আমার মনে হলো, জামায়াতের রাজনীতি বাংলাদেশের জন্য, এই অঞ্চলের মানুষের জন্য ইতিবাচক নয়। আওয়ামী লীগ আর জামায়াত, দুটোকেই আমার কাছে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন রাজনীতি মনে হতো। একটা ফ্যাসিস্ট ধাঁচের, আরেকটা আদর্শের খোলসে আটকা। আমি যাদের নেতা হিসেবে দেখতাম, শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, মোস্তফা কামাল পাশা, মাহাথির, জিয়াউর রহমান, তাঁরা মুসলিম ন্যাশনালিজমের মানুষ। আমি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে মুসলিম পরিচয়কে স্বীকার করি, ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করি না। কিন্তু সেটা ইসলামিজম নয়।
আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে জেলখানা। আড়াই মাস ছিলাম। এক ঘরে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ডানপন্থী, বামপন্থী, আলেম, গাঁজাখোর, সবাই একসাথে থাকে। আমার পরিবার আমাকে বাইরে একজন গাঁজাখোরের সাথে মিশতে দিত না, কিন্তু জেলে পাশাপাশি শুয়েছি, ক্যারম-লুডু খেলেছি, গল্প করেছি। সেখানে কেউ আর খুনি বা ডাকাত পরিচয়ে বিচার্য থাকে না। বুঝলাম, নিজের চারপাশের বাইরে একটা বিশাল পৃথিবী আছে, আর রাজনীতি আসলে চারপাশের ব্যাপার নয়, সবার জন্য কোনটা ভালো, সেটাই রাজনীতি। নারায়ণগঞ্জ জেলের লাইব্রেরিতে প্রচুর বই পড়েছি। হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারা আর নারায়ণগঞ্জের কুখ্যাত সন্ত্রাসীরাও তখন সেখানে ছিলেন, এখনো তাঁদের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক।
আদর্শিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা আমি দেখেছি সুপ্রিমেসিতে। ইসলামপন্থীরা ভাবে, আমি বেটার মুসলিম। বামপন্থীরা ভাবে, আমি বেটার হিউম্যান বিং, আমি বিপ্লবী। আর এই "আমি তোমার চেয়ে ভালো" ভাবনা থেকেই স্ট্যালিনের মতো মানুষ লাখ লাখ মানুষ মেরে ফেলতে পারে, কারণ সে অন্যদের অশিক্ষিত বা নিচু মনে করে। আমি নামাজ পড়ি কি না, সেটা আল্লাহর কাছে আমার জবাবদিহি। এটা দিয়ে অন্যকে জাজ করা যায় না। কিন্তু চর্চা যখন আদর্শিক রূপ নেয়, তখনই জাজমেন্ট শুরু হয়, আর সেটা সমাজের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।
তাই ২০১৬-১৭ সালে আমি শিবির থেকে পদত্যাগ করি, অভ্যুত্থানের অনেক আগে। ওদের খোলাখুলি বলেছি, আপনাদের রাজনীতি আমি বাংলাদেশের জন্য ভালো মনে করি না, আমি আদর্শিক রাজনীতি ওন করি না, আমি ডেমোক্রেটিক রাজনীতি করি। তখন বিএনপির কর্মসূচিতে যেতাম, তবে সেটা "মন্দের ভালো" হিসেবে, আমার জন্য সেরা অপশন হিসেবে নয়। আমার মনে হয়েছিল, একটা নতুন কিছুই দরকার। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশে গিয়ে অবরুদ্ধ হয়েছিলাম, কেউ আমাকে ডাকেনি, বিবেকের তাড়নায় গিয়েছিলাম।
জুলাইয়ের পর নাগরিক কমিটি আর এনসিপিতে এসে আমি সেই "নতুন কিছু"-র পক্ষে দাঁড়িয়েছি। আমার সামনে সুযোগ ছিল সাবেক শিবিরদের জড়ো করে সহজে একটা ফোর্স দাঁড় করানোর, কিন্তু আমি তা করিনি। আজ জামায়াত-শিবির করার সুযোগ নেই বলে অন্য পরিচয়ে থাকব, আবার কাল সুযোগ এলে ফিরে যাব, এমন রাজনীতি আমি চাইনি। আমি এলাকায় নিজের লোক তৈরি করেছি, যারা এনসিপির জন্যই এসেছে। আর অতীত নিয়ে আমার কোনো রিগ্রেট নেই, হীনমন্যতাও নেই। জীবনে সবকিছুই কাজে লাগে।
প্রশ্ন: অনেকে বলে এনসিপি আসলে সাবেক শিবিরদেরই দল। আপনার মতামত কী?
উত্তর: সাবেক শিবির যেমন আছে, সাবেক বাম ও সাবেক ছাত্রদলও আছে। আমাদের প্রজন্মের রাজনীতি-সচেতনদের মধ্যে শিবিরের রিক্রুটমেন্ট বেশি ছিল। ছাত্রদলের এত রিক্রুটমেন্ট ছিল না, ছাত্রলীগের রিক্রুটমেন্ট ছিল পেশিনির্ভর, আর শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের মধ্যে সংগঠন হিসেবে কাজ ছিল শিবিরের বেশি। কেউ বুঝে-না-বুঝে শিবিরে গেছে, পরে কেউ ছেড়েছে, কেউ ছাড়েনি। মির্জা ফখরুল সাহেব ইউনিয়ন থেকে এসে ৪০ বছর বিএনপি করছেন, এটাও একই রকম ব্যাপার। তাই এনসিপি স্বাভাবিকভাবে শিবিরের দল, আমি তা মনে করি না। আমি কয়েক বছর শিবির করার পর পদত্যাগ করেছি, অভ্যুত্থানের অনেক আগে, ২০১৬-১৭ সালে। তাদের খোলাখুলি বলেছি, আপনাদের আদর্শিক রাজনীতি আমি ওন করি না, আমি ডেমোক্রেটিক রাজনীতি করি। এর জন্য আমার কোনো আক্ষেপ বা হীনমন্যতা নেই, জীবনের সবকিছুই কাজে লাগে।
প্রশ্ন: সাবেক শিবিরদের নিয়ে নতুন দল গড়ার ব্যাপারে আপনার অবস্থান কী ছিল?
উত্তর: আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ভেবেছিলেন সাবেক শিবির বা সাবেক ছাত্রলীগ, যারা কোনো অপকর্ম করেনি বা ৫ আগস্টের আগে পদত্যাগ করেছে, তাদের আনতে হবে। আমি মনে করেছি এরা আমাদের মূল ফোর্স নয়; মূল ফোর্স তারা, যারা পরিবর্তনের নিয়তে অভ্যুত্থানে নেমেছিল। আমি যদি আজ জামায়াত-শিবির করার সুযোগ না পেয়ে অন্য পরিচয়ে থাকি আর কাল সুযোগ এলে সেখানে ফিরে যাই, সেটা তো আমি চাইনি।
প্রশ্ন: মনোনয়ন পাওয়ার পর একজন তরুণ প্রার্থী হিসেবে আপনি কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?
উত্তর: অভ্যুত্থানের নেতা তো আমি নই; আমরা সবাই অংশ নিয়েছি, কিন্তু নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, মাহফুজরা পরিচিত মুখ। আমি তেমন কোনো মুখ ছিলাম না, তাই আমার সংগ্রাম ভিন্ন। অভ্যুত্থানের পর আমি এমনি এমনি জনপ্রিয়তা পাইনি, সব অর্জন করতে হয়েছে। একই সাথে নতুন সংগঠন গড়ার কষ্ট, আবার নারায়ণগঞ্জে নির্বাচনের প্রস্তুতি। আমি সকালে নারায়ণগঞ্জে সময় দিতাম, এরপর ঢাকায় অফিসে আসতাম (শুরুতে নাগরিক কমিটির অফিস ছিল বাটা সিগনালে, পরে বাংলা মোটরে), রাতে যত দেরিই হোক নারায়ণগঞ্জে ফিরতাম। যেখানে আগে এমপি ছিলেন শামীম ওসমান, ৫ লাখের বেশি ভোটারের সেই আসনে ২০-২৫ বছর ধরে পরিচিত প্রার্থীদের সাথে দেড় বছরে পরিচিত হওয়া, ক্ষমতার সেক্টরে ঢোকা, এসবই কঠিন ছিল।
প্রশ্ন: এলাকায় আপনি কীভাবে সংগঠন গড়লেন?
উত্তর: আমি কারও কাছে "আমাকে দশজন লোক দাও" বলে যাইনি, না জামায়াতের কাছে, না বিএনপির। খুঁজেছি এলাকার প্রভাবশালী পরিবারগুলো, আর সেই পরিবারের কোন ছেলে নতুন রাজনীতি চায়। যেমন একটি শক্তিশালী বিএনপি পরিবারের এক ইঞ্জিনিয়ার ছেলের বাসায় গিয়েছি, যে বিএনপির চাঁদাবাজির রাজনীতি করছিল না। তাকে বলেছি, আপনি যদি নতুন রাজনীতি চান, একসাথে করি; না পারলে আবার ওই রাজনীতিতে ফিরে যেতে পারেন। এভাবে নিজের লোক অর্গানিকভাবে তৈরি করেছি, যারা এনসিপির জন্যই এসেছে। এটাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি, কারণ আমাকে কারও কাছে ব্ল্যাকমেইল হতে হয় না। নারায়ণগঞ্জে দলের স্বার্থে জামায়াতবিরোধী অবস্থান নিলেও আমার কর্মীসংকট হবে না।
প্রশ্ন: জোটের মধ্যে কোনো প্রতিরোধ ফেস করেছেন? একজন তরুণ রাজনীতিবিদকে কেন মনোনয়ন দেবে?
উত্তর: হ্যাঁ, এটা বড় ইস্যু ছিল। আমি পরিচিত মুখ নই। জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, তাই তাঁকে ছাড়ার কোনো কারণ ছিল না। শিবিরের সাবেক সভাপতিরা দুই আসনে ছাড়েননি, নাহিদ ইসলামের আসনে আর আমার আসনে। নাহিদকে কেন ছাড় দেবে, এর কোনো লজিক নেই। তারপরও আমি কাজ দিয়ে চেষ্টা করেছি। নির্বাচনের ১৫ দিন আগ পর্যন্ত মামুনুল হক সাহেবের দলের প্রার্থী বসেননি, তিনি খুবই শক্তিশালী ছিলেন। পরে আমার দল অবস্থান নেয়, কারণ পার্টি মনে করেছে আমি যেভাবে তৃণমূলে কাজ করেছি, এমন মানুষদের অ্যাকোমোডেট করা উচিত। এজন্য আমি দলের প্রতি কৃতজ্ঞ।
 
[সোর্সঃ ডেল্টা লেন্সের সাথে আল আমিনের পোডকাস্টের অনুলিখন।