জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। তাই পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি যৌক্তিক। তবে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার অঙ্ক কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বেসরকারি খাতের সামগ্রিক বেতন কাঠামো, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, অন্যান্য পেশার আয় এবং শিল্পের বর্তমান সক্ষমতা বিবেচনায় এই দাবি পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ এমবিবিএস পাশ করার পর বেসরকারি হাসপাতালে একজন চিকিৎসকের শুরুর বেতন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। বেসরকারি ব্যাংকে সহকারী কর্মকর্তা পদে বেতন ২৮ থেকে ৩২ হাজার টাকা।
প্রকৌশল ফার্মে নতুন প্রকৌশলীরা ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় চাকরি শুরু করেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেকে স্নাতক পাশ করে চাকরির শুরুতে ২৫ হাজার টাকার কম বেতন পান। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বাস্তবতায় গার্মেন্টে অপারেটরের সহকারী (হেলপার) কত টাকা দিয়ে চাকরি শুরু করবেন তা বিবেচনার দাবি রাখে। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারসহ পেশাজীবীরা অনেক লেখাপড়া শেষ করে চাকরি শুরু করেন। এরপরও শুরুতে তাদের বেতন বেশি থাকে না।
এছাড়া চাহিদা ও সরবরাহের (ডিমান্ড সাপ্লাই) ব্যাপার আছে। গার্মেন্টশ্রমিকের সরবরাহ বেশি। তিনি বলেন, ‘আমি কাউকে ঠকানোর জন্য বলছি না। কিন্তু দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে হবে। দেশের রপ্তানি এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এই মুহূর্তে গার্মেন্ট পণ্যের দাম বাড়ালে ক্রেতারা বাংলাদেশি পণ্য নাও নিতে পারেন। এতে বড় সমস্যায় পড়বে বাংলাদেশ। কারণ পোশাকশিল্প অর্থনীতির হৃদপিণ্ড।’ তিনি আরও বলেন, এই পণ্য ছাড়া আমাদের রপ্তানি করার তেমন কিছু নেই। ফলে সামগ্রিক দিক বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর গার্মেন্টশ্রমিকদের সর্বশেষ বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল। ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। ওই সময়ে ন্যূনতম বেতন ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫শ টাকা করা হয়। বর্তমানেও তা কার্যকর আছে। নিয়ম অনুসারে প্রতি তিন বছর পর নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করার কথা। সেই অনুসারে চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকর হবে। সরকার ঘোষিত মজুরি বোর্ডও ইতোমধ্যে সেই ঘোষণাই দিয়েছে। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রপ্তানিমুখী গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র এক নেতা বলেন, বর্তমানে শ্রমিক অসন্তোষের অন্যতম কারণ হলো সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি। চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে তাদের বেতন ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়; যা চলতি বছরের জুলাই থেকেই কার্যকর হয়েছে। এরপরই বেসরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়। গার্মেন্টস কর্মীরা ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা দাবি করে আন্দোলন শুরু করে।
এমন পরিস্থিতিতে লেখাপড়া শেষ করার পর একজন চাকরিজীবীর শুরুর বেতন কত-তা নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে দৈনিক যুগান্তর। এ বিষয়ে কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল, প্রকৌশল ফার্ম, বেসরকারি ব্যাংক, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিমা কোম্পানি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। জানা গেছে, বেসরকারি খাতে এনআরবিসি ব্যাংকে সহকারী অফিসারের বেতন ২৮ হাজার ৮শ টাকা। একই বেতন পান এবি ব্যাংক এবং সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের সহকারী কর্মকর্তারা। প্রথম শ্রেণির ব্যাংকগুলোতেও শুরুর বেতন ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে। ব্যাংকে চাকরির প্রাথমিক যোগ্যতা স্বীকৃত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাশ। এমবিএ ডিগ্রি থাকলে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
ডাক্তারদের বেতন নিয়ে কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কথা বলেছে যুগান্তর। সেখানে এমবিবিএস পাশ করার পর বেসরকারি হাসপাতালে একজন চিকিৎসকের শুরুর বেতন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। প্রকৌশল ফার্মে নতুন প্রকৌশলীরা ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে চাকরি শুরু করেন। এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ১৬ থেকে ২৩ হাজার টাকা। কলেজ শিক্ষকদের বেতন ২২ থেকে ৩৩ হাজার টাকা। বিমা কোম্পানিতে চাকরির শুরুতে বেতন মেলে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। অর্থাৎ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যাংকার ও শিক্ষকদের মতো পেশায় অনেক কর্মীই চাকরির শুরুতে ৩০ হাজার টাকার কম বেতন পান। এসব পেশায় প্রবেশের জন্য উচ্চশিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন হয়।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি। সেখানে উল্লেখ করা হয়; অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক পাশ করে চাকরির শুরুতে ২৫ হাজার টাকার কম বেতন পান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, বেতনভুক্ত কর্মীদের গড় মাসিক আয় ১৫ হাজার ৫৫৪ টাকা। শহরে গড় আয় ১৭ হাজার ৭০৮ টাকা এবং গ্রামে ১৪ হাজার ১৩১ টাকা। জানতে চাইলে সম্মিলিত গার্মেন্টশ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ব্যাংকার কত টাকা বেতন পায়, তা আমাদের দেখার দরকার নেই। আমরা সেটি নিয়ে ভাবছি না। আমাদের শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা দরকার, এজন্যই তা চেয়েছি। এটাই আমাদের দাবি। শেষ পর্যন্ত ন্যূনতম বেতন কত টাকা নির্ধারণ হলে মেনে নেবেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা ৩০ হাজার টাকাই চাচ্ছি। এরপর সরকার কী করে সেজন্য অপেক্ষা করছি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শারীরিক পরিশ্রম এবং কর্মপরিবেশের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বেতন বাড়াতে হবে। অপরদিকে দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্প। এ খাতে ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান। কিন্তু শিল্পটি এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে ধীরগতি, জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপে দেশের অর্থনীতি। বৈশ্বিক বাজারেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। পোশাকের চাহিদা, ক্রেতাদের মূল্যচাপ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সামলে টিকে থাকতে হচ্ছে পোশাকশিল্পকে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা মাসিক ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরি দাবি করছেন। ফলে দেশের অর্থনীতি, জাতীয় মজুরি কাঠামো এবং শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থও বিবেচনায় নিতে হবে।
৬২টি খাত নিয়ে কাজ করে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন। সরকার গঠিত মজুরি বোর্ডে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন এই সংগঠন। সংগঠনটির সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, শ্রমিক নেতাদের এমন কোনো বেতন দাবি করা উচিত নয়, যাতে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে ভুল বার্তা যায়। পাশের দেশ ভারত, পাকিস্তানের পোশাক শ্রমিকরা কত বেতন পায় এবং বাংলাদেশে অন্যান্য খাত যেমন-পরিবহণ, হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের শ্রমিকরা কত বেতন পান, সেটি পর্যালোচনা করে মজুরি প্রস্তাব দেওয়া উচিত। পাশাপাশি এটাও পর্যালোচনা করা উচিত, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গার্মেন্টশিল্পের সেই বেতন দেয়ার সক্ষমতা আছে কিনা। কেননা, বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা ও মূল্য দুটোই কমছে। তাই শুধু মনগড়া বেতনের প্রস্তাব দিলে সামাজিক অস্থিরতা শুরু হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিএমইএ আরেকজন নেতা বলেন, পোশাকশিল্পের মজুরি কাঠামো নিয়ে আলোচনা হলে সবাই শ্রমিকদের বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা মনে করেন। প্রকৃতপক্ষে শুরুর লেভেলের শ্রমিক, যার কোনো শিক্ষাগত যোগত্য বা দক্ষতা নেই, তাকে এই বেতন দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর সঙ্গে ওভারটাইম যোগ করলে মাসিক বেতন ১৫-১৬ হাজার টাকা দাঁড়ায়। কয়েক মাস পর হেলপার মেশিন অপারেটর হলে, তার ওভারটাইমসহ বেতন দাঁড়ায় ২২-২৩ হাজার টাকায়; যা পার্শ্ববর্তী প্রতিযোগী দেশগুলোর প্রায় সমান। তিনি আরও বলেন, গার্মেন্টশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক এতে সন্দেহ নেই। তবে অন্য শ্রম খাতের তুলনায় গার্মেন্টশ্রমিকরা কম বেতন পান কিনা, তাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
২০২৩ সালের মজুরি কাঠামো অনুযায়ী, ৪র্থ গ্রেডের একজন শ্রমিকের (হেলপার, থ্রেড কাটার, লাইন অ্যাসিসটেন্ট) সর্বসাকুল্যে বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এ বছর যা ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে। ওই কাঠামো অনুসারে ৩য় গ্রেডের (জুনিয়র অপারেটর, অভিজ্ঞ হেলপার, ফোল্ডার, প্যাকার, ট্যাগিংম্যান, সুইং সহকারী) ১৩ হাজার ৫৫০ টাকা, দ্বিতীয় গ্রেডের (সেলাই, কাটিং, ফিনিশিং, কোয়ালিটি কন্ট্রোল অপারেটর; সিনিয়র হেলপার (বিশেষায়িত কাজের), সিনিয়র কলার জয়েন্টার, সিনিয়র কাফ মেকার) ১৪ হাজার ২৭৩ টাকা এবং প্রথম গ্রেডের (সেলাই, কাটিং, আয়রনিং, ফিনিশিংয়ের সিনিয়র অপারেটর; প্যাটার্ন মেকার; স্যাম্পল মেকার; স্ক্রিন প্রিন্টার; সিনিয়র ডাইং অপারেটর) শ্রমিকের মজুরি ১৫ হাজার ৩৫ টাকা।