Image description

প্রতিদিন ডেঙ্গুতে মানুষের মৃত্যুর খবর শুনে আতঙ্কে দিন কাটছে রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা রেজাউল করীম মাঝির। সাত মাস বয়সী একমাত্র কন্যাসন্তানকে নিয়ে তাঁর দুশ্চিন্তার শেষ নেই।

সন্ধ্যার আগেই ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ করে দেন, যাতে মশা ঢুকতে না পারে।

পুরানা পল্টনের বাসিন্দা তোজাম্মেল হোসেন কামালের আতঙ্কের পেছনে রয়েছে আরো বড় শোক। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তাঁর ছোট ভাই। ভাইয়ের ছেলেকেও থাকতে হয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)।

স্বজনদের চেষ্টায় শিশুটি কিছুটা সুস্থ হলেও বাবাকে হারানোর বেদনা তাকে তাড়া করে ফিরছে।

রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় এমন আতঙ্ক এখন অনেক নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। প্রতিদিন হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা, ঘটছে প্রাণহানিও। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করেছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

তবে নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরছে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জানুয়ারি থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক লাখ ৪৫ হাজার ৯০৬ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে এক লাখ ৩৯ হাজার ৬৭৮ জন। আর এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৪৫৫ জনের। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পাঁচ হাজার ৭৭১ জন।

দক্ষিণে ২৯ ওয়ার্ড অধিক ঝুঁকিপূর্ণ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপে ২৯টি ওয়ার্ডকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত ১২ দিনব্যাপী এ জরিপ পরিচালনা করা হয়। ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটি থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৩০টি করে মোট দুই হাজার ২৫০টি বাড়ি জরিপের আওতায় আনা হয়। ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ৩৬ জন মাঠকর্মী এ কার্যক্রমে অংশ নেন।

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ২৮টি মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৮টি সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। পরিদর্শন করা দুই হাজার ২৫০টি বাড়ির মধ্যে ৩২২টিতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে।

জরিপের ফলাফল প্রকাশ ও পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ মশক নিধন অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে। প্রতি শনিবার নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি শিশুদের ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনা ও শৌচাগার পরিষ্কারের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উত্তরে ১০০ হটস্পট চিহ্নিত

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীদের ঠিকানা বিশ্লেষণ করে ১০০টি হটস্পট চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকার বড় অংশ মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও শ্যামলীতে। এ ছাড়া মহাখালী, বনানী, গুলশান, রামপুরা ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকাও উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

ডিএনসিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হটস্পট চিহ্নিত করে বিশেষ মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ ফিভার ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মিরপুরে এরই মধ্যে একটি ফিভার ক্লিনিক চালু করা হয়েছে।

ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কর্মসূচিও পরিচালনা করা হচ্ছে। মশার ওষুধ ছিটানো থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়নে কর্মীদের নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।’

দুই সিটির কর্মপরিকল্পনা

ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশন বেশ কিছু কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্তকরণ, সমন্বিত মশক নিধন কার্যক্রম, নজরদারি জোরদার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী সকালে লার্ভিসাইডিং ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং সন্ধ্যায় ফগিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বন্ধ খাল, বিল, ড্রেন ও নালা-নর্দমায় মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

ডিএনসিসি এলাকায় প্রায় ছয় হাজার বিঘা কচুরিপানাপূর্ণ জলাশয় পরিষ্কারের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। ‘শনিবারের অঙ্গীকার, নিজ নিজ বাসাবাড়ি করি পরিষ্কার’ স্লোগানে প্রতি শনিবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের ঠিকানা সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট বাড়ি ও আশপাশে কুইক রেসপন্স টিমের (কিউআরটি) মাধ্যমে বিশেষ মশক নিধন কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।

এ ছাড়া সচেতনতামূলক স্টিকার, লিফলেট ও বুকলেট বিতরণ, মাইকিং, গণমাধ্যমে প্রচার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই এবং যথাযথ ব্যবহারের বিষয়টিও তদারকি করা হচ্ছে।