একসময় ক্রেতাদের পদচারণে মুখর থাকত রাজধানীর অভিজাত শপিং মলগুলো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলত কেনাকাটা।
এখন দোকান খুলে দিনভর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও মিলছে না আশানুরূপ ক্রেতা। কোথাও বেচাবিক্রি না থাকায় কর্মচারী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছেন মালিকরা।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব, দেশে মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অনলাইন কেনাকাটার প্রসারে রাজধানীর শপিং মলগুলোতে ক্রেতাসংকট তীব্র হয়েছে। দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
কেউ ঋণ করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখছেন, কেউ বিকল্প পেশায় যাওয়ার কথা ভাবছেন। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরো অনেক দোকান বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বরের শাহ আলী প্লাজা, ফার্মগেটের গ্রিন সিটি মার্কেট, অর্কিড পয়েন্টসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে কমবেশি একই চিত্র দেখা গেছে। দীর্ঘদিনের ব্যাবসায়িক মন্দা, ক্রেতাসংকট ও আর্থিক লোকসানের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে শান্তিনগর-কাকরাইলের একসময়ের অভিজাত বিপণিবিতান কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি।
গত ১ অক্টোবর থেকে সেখানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ।
গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার রাজধানীর এসব শপিং মল ও মার্কেট ঘুরে এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পোশাক, ক্রোকারিজ, স্যানিটারি পণ্য, ইলেকট্রনিকস ও গৃহসজ্জার সামগ্রীর খুচরা বিক্রি ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ
পর্যন্ত কমেছে। অনেক ব্যবসায়ী পণ্যের ওপর ছাড় দিয়েও আশানুরূপ বিক্রি পাচ্ছেন না।
মিরপুর ১০ নম্বরের শাহ আলী প্লাজার নিচতলায় নাহার অ্যান্ড এক্সক্লুসিভ ফ্যাশন দোকানটিতে মেয়েদের বিভিন্ন ধরনের থ্রি-পিস বিক্রি হয়। বিক্রেতা মো. বাবুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্রেতা আসে, তবে গত বছরের মতো বিক্রি নেই।
গত বছরের নভেম্বর মাসে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হতো। এখন তা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় নেমেছে। কোনো কোনো দিন ১০ হাজার টাকার পণ্যও বিক্রি হয় না।’
একই মার্কেটের ফ্যামিলি কিচেনের মালিক শাহিন খান গ্লাস, চামচ, বাটি, মাল্টিকুকার, কফি মেকার, রাইস কুকার, ফ্রাইপ্যানসহ বিভিন্ন ধরনের রান্নার সামগ্রী বিক্রি করেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘বিক্রির অবস্থা খুবই খারাপ! আগে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা বিক্রি হতো, এখন তা আট থেকে ১০ হাজারে নেমেছে।’
শাহিন খান বলেন, ‘আগে যে পণ্যের দাম ৩০০ টাকা ছিল, এখন তা ৪০০ টাকা। গত তিন মাসে তিনবার দাম বেড়েছে। এটাও ক্রেতা কমার কারণ।’
শাহ আলী প্লাজার ম্যাস টেলিকমের বিক্রয়কর্মী মো. রাজু ইসলাম বলেন, চার-পাঁচ মাস ধরে মোবাইল ফোন সেটের বিক্রি কমেছে। ছয় মাস আগে যে ফোন ২৩ হাজার টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা বিক্রি করতে হচ্ছে ৩৩ হাজার টাকায়। মোবাইল ফোনের চিপ ও র্যামের দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম বেড়েছে। আগে প্রতি মাসে ২৮০ থেকে ৩০০টি ফোন বিক্রি হলেও এখন তা কমে ১৩০ থেকে ১৪০টিতে নেমেছে।
ফার্মগেটের গ্রিন রোডের গ্রিন সিটি মার্কেটেও ক্রেতার উপস্থিতি খুবই কম। স্যানিটারি পণ্যের এই মার্কেটের বেশির ভাগ দোকানে বিক্রেতাদের অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে। দোকান মালিক নাসির উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন অনেক দোকানে কর্মচারীও নেই। বিক্রি না থাকায় তাদের বেতন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আগে প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হতো। এখন তা কমে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় নেমেছে। এমন দিনও যায়, কোনো বিক্রিই হয় না। কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিলসহ নিয়মিত ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
ব্যবসা কমার বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন ভবন নির্মাণ কমে যাওয়ায় এসব পণ্যের চাহিদা ও বিক্রি কমেছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, মানুষের আয় না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয় বেড়েছে। ফলে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি খরচ মেটানোর পর পোশাক, গৃহস্থালি ও শৌখিন পণ্য কেনার সামর্থ্য কমেছে। পাশাপাশি অনলাইন কেনাকাটার প্রসারেও প্রচলিত শপিং মলগুলো ক্রেতা হারাচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল হাসান মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে যে মন্দা চলছে, তা এক দিনে তৈরি হয়নি। ২০১৮ সাল থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ীরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। সময়ের সঙ্গে সেই সংকট বেড়েছে।
তিনি বলেন, বড় মার্কেটগুলো রাত ৮টায় বন্ধ করার সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সাধারণত বিকেল ৫টার পর, বিশেষ করে অফিস ছুটির পর মার্কেটে ক্রেতার উপস্থিতি বাড়ে। অথচ রাত ৮টায় মার্কেট বন্ধ করতে হলে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকেই দোকান গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হয়। ফলে বিক্রির কার্যকর সময় কমে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনে সকালে দেরিতে দোকান খুলতে রাজি, কিন্তু সন্ধ্যার পর কেনাকাটার জন্য পর্যাপ্ত সময় চান।
নাজমুল হাসান মাহমুদ বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু আয় বাড়েনি। ফলে মানুষ কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছে।
দোকান ব্যবসায়ীদের আর্থিক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে প্রায় ৭০ লাখ দোকান ব্যবসায়ী রয়েছেন। প্রত্যেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে গড়ে তিনজন করে মানুষ নির্ভরশীল হলে প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে জড়িত। অথচ প্রকৃত দোকান ব্যবসায়ীরা সরকারি প্রণোদনা ও সহজ শর্তের ঋণসুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁদের ক্ষুদ্র্র শিল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে ক্ষুুদ্র শিল্পের জন্য নির্ধারিত ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা তাঁরা পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, ২০১৮ সাল থেকে ধারাবাহিক লোকসানে পড়ে অনেক ব্যবসায়ী উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। টুইন টাওয়ার, রাপা প্লাজা, ইয়ার সেন্টার, এলিফ্যান্ট রোডের সুবাস্তু আর্কেড ও ট্রপিক্যালের মতো বড় বিপণিকেন্দ্রের অনেক দোকানে বেচাকেনা নেই বললেই চলে। কোথাও কোথাও কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার সামর্থ্যও হারিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
দোকান ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে কয়েকটি দাবি তুলে ধরে নাজমুল হাসান মাহমুদ বলেন, প্রথমত, দোকান ব্যবসায়ীদের ক্ষুদ্র শিল্পের আওতায় আনতে হবে, যাতে তাঁরা সরকারি প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ঋণ পান। দ্বিতীয়ত, বড় মার্কেট বন্ধের সময় পুনর্বিবেচনা করে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যবসার প্রকৃত মুনাফা ও সক্ষমতা বিবেচনায় কর নির্ধারণ করতে হবে। টার্নওভারের ওপর ১ শতাংশ কর আরোপের ফলে অনেক ক্ষুুদ্র ব্যবসায়ী তাঁদের প্রকৃত মুনাফার চেয়েও বেশি করের চাপে পড়ছেন।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির আরেক অংশের সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যবসায়ীরা বর্তমানে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, সেটি বাস্তব চিত্র। তবে এ অবস্থায় হতাশ না হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
তিনি বলেন, শীত মৌসুমে ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে আগের মতো রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান ও মার্কেট খোলা রাখার অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
ব্যাবসায়িক মন্দা ও ক্রেতাসংকটের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজধানীর শান্তিনগর-কাকরাইলের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া একসময়ের অভিজাত এই বিপণিবিতানে ছিল নামি ব্র্যান্ডের শোরুম, পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও উপহারসামগ্রীর দোকান। তবে দীর্ঘদিনের লোকসান ও আর্থিক সংকটে গত ১ অক্টোবর থেকে এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, ২০ তলা ভবনটির নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। চালুর সময় সেখানে ১৯৮টি দোকান থাকলেও বন্ধ হওয়ার সময় চালু ছিল মাত্র ১৭টি।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি দোকান মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকী বিল্লাহ ওসমানী কালের কণ্ঠকে বলেন, বিপণিকেন্দ্রটি চালু রাখতে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হতো। অথচ গত ছয় মাসে সার্ভিস চার্জ বাবদ মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকার বেশি আদায় করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় সমিতির কর্মকর্তা ও কয়েকজন দোকান মালিক ঋণ নিয়ে ছয় থেকে আট মাস বিপণিকেন্দ্রটি চালু রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।
বাকী বিল্লাহ ওসমানী বলেন, বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন খাতে বকেয়া জমেছে। শুধু বিদ্যুৎ বিলই বকেয়া পড়েছে ৬০ লাখ টাকার বেশি। দীর্ঘদিনের লোকসান ও পরিচালন ব্যয় বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ায় দোকান মালিকদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে।